শিরিন সুলতানা কেয়া: সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। বছর ঘুরে আবারো আসছে এই উৎসব। তাই রাজশাহীতে চলছে উৎসবের প্রস’তি। বিশেষ করে উৎসবের আমেজ বইতে শুর্ব করেছে রাজশাহীর পাল বাড়িগুলাতে। মৃৎশিল্পীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন প্রতিমা তৈরিতে।
বিভিন্ন জায়গা থেকে আসছে প্রতিমা তৈরির অর্ডার। আর মন্দির কমিটির চাহিদা অনুযায়ী প্রতিমা শিল্পীরা তাদের রং-তুলি দিয়ে বানাচ্ছেন প্রতিমা। মনের মাধুরি মিশিয়ে তারা চেষ্টা করছেন প্রতিমাগুলোর সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে। প্রতিমাগুলোর দিকে তাকিয়ে যেন দর্শনার্থীরা চোখ ফেরাতে না পারেন এই চিন্তায় মাথায় রেখেই প্রতিমা শিল্পীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
দুর্গোৎসব উপলৰে এখন রাজশাহী ধর্মসভা, বোস্টম সভা মন্দির, ঘোড়ামারা ক্রিকেট ক্লিনিক মাঠ ও হড়গ্রাম পালপাড়াগুলোতে প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে মৃৎশিল্পীদের। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই অর্ডারের প্রতিমা হস্তান্তরে তারা দিনরাত এক করে কাজ করছেন।
প্রতিবারের মতো এবারো ব্যস্ত সময় পার করছেন নগরীর আলুপট্টি এলাকার মৃৎশিল্পী কার্তিক চন্দ্র পাল। ছয়জন কর্মী নিয়ে তিনি দিন-রাতের বেশির ভাগ সময়ই প্রতিমা তৈরিতে সময় পার করছেন। নরম কাদা-মাটি দিয়ে শৈল্পিক ছোঁয়ায় কিভাবে দশভুজা দুর্গাকে আরো জীবন্ত করা যায় সেই চেষ্টাই করছেন তারা। তবে প্রতিমা তৈরির কাজ এতো সহজ নয় তা জানালেন কার্তিক পাল নিজেই।
তিনি বলেন, একটি প্রতিমা তৈরি করতে ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। মন্দির কমিটি প্রতিমা যেভাবে চায় তাদের সেভাবেই বানাতে হয়। প্রতিমা তৈরির মাটি রাজশাহীর বানেশ্বর, সারদা, তানোর থেকে আনতে হয়। এরপর সেই মাটি ভিজিয়ে রাখতে হয়। এরপর মাটির মধ্যে আউড়, পাট, ধানের গুড়া মশিয়ে প্রতিমা তৈরির প্রাথমিক কাজ করতে হয়।
তারপর আলাদা করে হাত, পা, মাথা বানিয়ে নিয়ে প্রতিমার শরীরের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়। এরপর নদী থেকে পলি মাটি এনে সেটি পাটের সাথে মিশিয়ে প্রতিমাতে দিতে হয়। এরপর পৱাস্টার করে রং দিতে হয়। রং শুকিয়ে গেলে প্রতিমার সাজসজ্জা করা হয়। প্রতিটি কাজ সুন্দর করে দৰতার সাথে করতে হয়। তাছাড়া প্রতিমা তৈরি সুন্দর হবে না বলেই জানালেন কার্তিক।
তিনি বলেন, প্রতিমা প্রতি ৩০ হাজার থেকে শুর্ব করে ৬০ হাজার পর্যন্ত টাকা নিয়ে থাকেন তিনি। এবারো তাই করেছেন। গত দুই মাসে তিনি ২৭টি প্রতিমা তৈরি করেছেন। এখনো ৭টির কাজ করছেন। তিনি ২৪ বছর থেকে একাই প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। তবে ৯ বছর তার ওস্তাদের সাথে থেকে কাজ শিখেছেন এবং সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। এখন পুজার আগের ২-৩ মাস কাজের চাহিদা থাকে। তখন তিনি খুব ব্যাস্ত থাকলেও বছরের অন্য সময় বেশি ভিড় থাকে না। এর ফলে তিনি খেলনা তৈরি করেন। সম্পৃক্ত থাকেন হস্তশিল্পের সাথেও।
কার্তিক পাল বলেন, প্রতিমা তৈরিতে আগে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা লাগতো। তবে এখন খরচ বেড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা হয়েছে। প্রতিমা তৈরির মাটি বিভিন্ন জায়গা থেকে কিনে আনতে হয়। মাটির থেকে পরিবহন খরচই বেশি। এক ট্রাক মাটি আনতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দরকার হয়। আর প্রতিমা সাজাতে চুল সাধারণত ভারত থেকে আনতে হয়। চুলের দাম সাধারণত ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি। এছাড়াও প্রতিমার সাজসজ্জা করতে ১ হাজার থেকে ২ হাজার পর্যন্ত টাকা ব্যয় হয়।
কার্তিকের বাড়িতে মোট ৬ জন সহকারী প্রতিমা শিল্পী কাজ করেন। এদের একজন বিকাশ চন্দ্র পাল। তিনি জানান, বছরের অন্য সময় তিনি অন্য কাজ করেন। তবে পূজার আগের সময়ই এসে তিনি প্রতিমা তৈরির কাজ করেন। এবার কাজ প্রায় মাঝামাঝি পর্যায়ে আছে। কাজ শেষ হলেই প্রতিমা মন্ডপের জন্য পাঠানো হবে।
হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদের রাজশাহী মহানগরের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল কুমার ঘোষ বলেন, আগামী ৪ অক্টোবর ষষ্ঠি পুজোর মধ্যে দিয়ে শুর্ব হবে শারদীয় দুর্গ্যেৎসব। এরপর ৫ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ৬ অক্টোবর মহাঅষ্টমী, ৭ অক্টোবর মহানবমী ও ৮ অক্টোবর দশমীর মধ্যে দিয়ে উৎসব শেষ হবে। এবার রাজশাহী মহানগরীতে ৭৬টি ম-পে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। আর রাজশাহী জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় ৪ শতাধিক ম-পে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিবারের মতো এবারো যেন শান্তিপূর্ণভাবে পূজা সম্পন্ন হয় তার জন্য তারা সমস্ত ব্যবস’া গ্রহণ করবেন বলেও জানান ঐক্য পরিষদের এই নেতা।