স্টাফ রিপোর্টার: রাসত্মার পাশে এখনও আছে জেলা প্রশাসনের সাইনবোর্ড। সেটি বলছে, রাসত্মাটি দিয়ে বালু পরিবহন নিষিদ্ধ। কিন্তু তাতে কী? রাসত্মার পাশে থাকা সাইনবোর্ডকে পাশ কাটিয়ে বালু আনতে নামছে একের পর এক ট্রাক। বড় বড় ট্রাকের যাতায়াতে বারোটা বাজছে রাসত্মাটির।
রাজশাহী মহানগরীর তালাইমারী মোড় থেকে রাসত্মাটি শুরম্ন হয়ে নেমে গেছে পদ্মা নদীর দিকে। তালাইমারী মোড় থেকে বড়জোর ৪০০ মিটার নিচে নদীর ধারে এই বালুঘাট গতকাল রোববার থেকে চালু করা হয়েছে। অথচ মাস দেড়েক আগে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত এই বালুঘাট বন্ধ করেছিল।
তালাইমারী মোড়ের দোকানীরা বলছেন, বালুভর্তি ট্রাক চলাচলের কারণে আবার ধুলোবালি উড়তে শুরম্ন করেছে। এলাকায় তাদের টেকা মুশকিল হয়ে পড়েছে। এছাড়া বেপরোয়া বালুর ট্রাকের কারণে ছোট এই রাসত্মাটির ভেতরে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। তাই বালুঘাটটি তারা বন্ধের জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছেন।
বালুঘাটটি খুলেছেন রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল আলম বেন্টু। তিনি ‘মেসার্স আমিন ট্রেডার্স’ নামের একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিক। তার প্রতিষ্ঠান রাজশাহীর চরখিদিরপুর ও চরশ্যামপুর মৌজার একটি বালুমহাল ইজারা নিয়েছে।
কিন্তু শুরম্ন থেকেই তিনি তালাইমারী এলাকা থেকে বালু তুলে আসছিলেন। শুধু তাই নয়, ব্যবহার করছিলেন কাজলা মৌজার রাসত্মাও। এ নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট হয়। এরপর উচ্চ আদালত ইজারাবহির্ভুত এলাকা থেকে বালু তোলা হলে তা বন্ধের জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন।
এর পরিপ্রেড়্গিতে গত ২৪ জুলাই জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। ভ্রাম্যমাণ আদালত ইজারাবহির্ভুত এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন এবং কাজলা মৌজা ব্যবহার করে তা পরিবহনের চিত্র দেখতে পান। তাই বালুঘাট থেকে আটজন চালককে গ্রেপ্তার করে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেন। একইসঙ্গে বালুঘাটটি বন্ধ ঘোষণা করে একটি সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেন।
সেই সাইনবোর্ড এখনও আছে। তাতে লেখা আছে, ‘মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের রিট পিটিশন নং- ৬৫২১/২০১৯ এর আদেশ মোতাবেক কাজলা মৌজা/কাজলা ঘাট ব্যবহার করে সকল ধরনের বালু উত্তোলন/পরিবহন নিষিদ্ধ করা হলো। এ আদেশ অমান্যকারীদের বিরম্নদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আদেশক্রমে জেলা প্রশাসক, রাজশাহী।’ কিন্তু এখন আবার বালুঘাট চালু করা হয়েছে।
এলাকাবাসী জানান, গেল কয়েকদিন ধরেই বালুঘাটটি চালু করার প্রস্তুতি চলছিল। এলাকায় কে আসছেন তা পর্যবেড়্গণে রাখতে বসানো হয়েছে বেশকিছু ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা। তারপর গতকাল প্রায় শতাধিক লোকজন গিয়ে বালুঘাটটি চালু করেন। দুপুরে চলে ভুড়িভোজও। এলাকাবাসী ভয়ে এই বালুঘাট চালুর প্রতিবাদ করার সাহস পাননি।
স্থানীয়রা আরও জানান, এখন নদীতে পানি চলে আসায় ট্রাক নামছে না। ড্রেজারে করে পদ্মার ভেতর থেকে বালু তুলে এনে রাখা হচ্ছে নদীর পাড়ে। সেখান থেকে বড় বড় ট্রাক বালু নিয়ে যাচ্ছে। তালাইমারী মোড়ের এক দোকানী বলেন, বালুঘাটটি বন্ধ করায় এতোদিন শানিত্মতে ছিলাম। গতকাল থেকে আবার শুরম্ন হয়েছে বালুর ট্রাকের বিড়ম্বনা। আমরা এই ঘাট বন্ধের দাবি জানাই।
বালুঘাটটি বন্ধের জন্য উচ্চ আদালতে রিট করেছিলেন আনোয়ার হোসেন নামে আরেকজন বালু ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, সর্বশেষ গত ২০ আগস্ট এ ব্যাপারে উচ্চ আদালতে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বলা হয়েছে, আজিজুল আলম বেন্টু ইজারাবহির্ভুত এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করায় বালু উত্তোলনের ২, ৯, ১৮ এবং ২১ ধারা লঙ্ঘন করেছেন। কিন্তু ইজারার চুক্তি ভঙ্গন করলেও আজিজুল আলম বেন্টুর বিরম্নদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কেন তা করা হয়নি সেটা জানতে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলকে মৌখিকভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন আদালত। তারপরেও আবার একই স্থানে বালুঘাট খোলাটা গায়ের জোরেই হয়েছে। আনোয়ার হোসেন আরও বলেন, এখন আজিজুল আলম বেন্টু ইজারাবহির্ভুত এলাকা থেকে বালু উত্তোলন এবং পরিবহন করছেন কি না সেটা দেখার জন্য আমি প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করছি।
এ বিষয়ে কথা বলতে জেলা প্রশাসক হামিদুল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও পাওয়া যায়নি। তাই এ ব্যাপারে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফোন ধরেননি মেসার্স আমিন ট্রেডার্সের স্বত্তাধিকারী আজিজুল আলম বেন্টুও। তবে এই বালুঘাট চালু প্রসঙ্গে তিনি একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালকে বলেছেন, ইজারা অনুযায়ী চরখিদিরপুর ও চরশ্যামপুর মৌজার পদ্মার মধ্যচর থেকে বালু উত্তোলন করে নিয়ে আসা হবে। এরপর সে বালুগুলো পদ্মাপাড়ে তার ইজারা নেয়া জায়গায় মজুদ করে সেখান থেকে ট্রাকযোগে পরিবাহন করা হবে।
তবে যে রাসত্মা দিয়ে বালু পরিবহন করা হচ্ছে সেটির ব্যাপারেই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। সেই সাইনবোর্ড এখনও আছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের ওই অভিযানের পর দিন আজিজুল আলম বেন্টু সংবাদ সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। সেখানে তিনি জেলা প্রশাসকের বিরম্নদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেছিলেন, অবৈধভাবে তার বালুঘাট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। যদিও সেদিন জেলা প্রশাসক বলেছিলেন, অবৈধভাবে বালু তোলার কারণেই বালুঘাটটি বন্ধ করা হয়েছে। আর কয়েকদিন আগে বালুঘাটে সিসি ক্যামেরা বসানোর খবর শুনে জেলা প্রশাসক বলেছেন, হাজারটি সিসি ক্যামেরা বসালেও ওই এলাকা দিয়ে বালু তোলার কোনো সুযোগ নেই।