স্টাফ রিপোর্টার: শহরের চেয়ে গ্রামে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে। ফলে নারীরা অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার কারণে তাদের সামাজিক ও পারিবারিক গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে ও অর্থনৈতিক-ভাবে পরিবারের ওপর তাদের নির্ভরশীলতা কমেছে। তবে পুরম্নষের চেয়ে মজুরি কম দেয়ায় কর্মজীবী নারীদের মাঝে অসনেত্মাষ দেখা দিয়েছে।
সংশিস্নষ্ট সূত্র জানায়, আজ থেকে ১৫ বছর আগেও যেখানে শহরে কর্মজীবী নারীর অংশগ্রহণ বেশি ছিল, এখন তা পুরোপুরি উলটে গেছে। শহরের মেয়েদের পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছেন গ্রামের মেয়েরা। গ্রামে নারীর অংশগ্রহন বেশি দেখা যাচ্ছে কৃষিতে।
বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলে, শহরের চেয়ে গ্রামে নারী কর্মজীবীর সংখ্যা বেশি। নিজ পরিবারে ও ফসল উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে নারীর শ্রম পুরম্নষের তুলনায় বেশি। শ্রমশক্তি জরিপ ২০১০ অনুযায়ী, শহর ও গ্রাম মিলিয়ে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ছিল ৩৬ শতাংশ, ২০০৫ সালে যা ছিল ২৯ শতাংশ। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) বলছে, ১৯৯৫-৯৬ সালে শ্রমে নারীর অবস্থান ছিল শহরে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ, গ্রামে ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০০৩ সাল পর্যনত্ম শহরে এ হার বেশি ছিল।
সামগ্রিকভাবেই কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ আগের তুলনায় বেড়েছে। বিশেষ করে গ্রামের নারীদের কাজের ক্ষেত্র বেড়ে গেছে। আগে যেটা শুধুই পুরম্নষের কাজ বলে বিবেচিত হতো, সেসব কাজেও নারীরা পুরম্নষের পাশাপাশি সমানতালে অংশ নিচ্ছেন। কয়েক বছর যাবৎ নারী শুধু গার্মেন্টস সেক্টর নয়, কৃষিখাত, সূচিশিল্প, পশুপালন, মৎস্যচাষ ও চিংড়ি রপ্তানির কাজেও তাদের সম্পৃক্ততা বাড়িয়েছেন।
গ্রামে জনশক্তিতে যুক্ত নারীদের ৬০ শতাংশই শ্রম দিচ্ছেন কৃষিতে। আর শহরে গার্মেন্টসে। পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ ছিল ৬৪ শতাংশ, এখন তা কমে ৬০ দশমিক ৮ শতাংশ। ব্যুরো আরো জানায়, সবশেষে ২০১৫ -২০১৭ সালে গ্রামে নারীর কাজের হার বেড়েছে। গ্রামে ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ নারী শ্রমজীবী হিসেবে রয়েছেন। শহরে কমে হয়েছে ৩১ শতাংশ।
বাংলাদেশ উন্নয়ন সংস্থা জানায়, ৯০ শতাংশের বেশি ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহণকারী হচ্ছেন নারী। ঋণের টাকায় নারীরা ফসল উৎপাদন, পশুর খামার ও হাঁস-মুরগি পালন করছেন। খামারে যুক্ত আছেন ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। ফসল উৎপাদনে ৪২ দশমিক ৩ শতাংশ। খুলনায় রপ্তানিমুখী চিংড়ি খাতেও নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ বাড়ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৫-১৬ সালের পরিসংখ্যানে জানা যায়, বিভাগীয় পর্যায়ে রাজশাহী, খুলনা ও রংপুরের শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। রংপুরে এ হার ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে নারী নেত্রীরা বলছেন, গ্রামে কাজে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি অবশ্যই ইতিবাচক। তা নারীর ক্ষমতায়নে প্রভাব ফেলবে। নারীর অনানুষ্ঠানিক কাজের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করা দরকার। কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গ সংবেদনশীল পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। এসব কিছুর চাইতে সবচেয়ে বেশি জরম্নরি কর্মক্ষেত্রে, পথে-ঘাটে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। নারীরা ঘরের গ-ি পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসছেন ঠিক, তবে এটাও ঠিক পথ চলতি কর্মজীবী মেয়েদের পথে-ঘাট থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের মাত্রাও বেড়েছে। এই নিরাপত্তা দিতে হবে রাষ্ট্রকে। তাছাড়া পুরম্নষের সাথে নারীর যে মজুরী বৈষম্য রয়েছে, তা দুর করতে হবে।
পবা উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের মৃত তালেবর রহমানের স্ত্রী রাহেদা বেগম ও মৃত ইসরাইলের স্ত্রী মিলি বেগম কৃষি শ্রমিক। তারা পরিবারে স্বচ্ছলতা আনতে কৃষিতে শ্রম দেন। তাদের দাবী তারা পুরম্নষের সমান কাজ করলেও তাদেরকে মজুরী দেয়া হয় পুরম্নষের অর্ধেক। পুরম্নষ শ্রমিককে দৈনিক ৩শ’ থেকে ৪শ’ টাকা মজুরী দেয়া হলেও তাদেরকে দেয়া হয় ১৫০ থেকে ২শ’ টাকা। নারী শ্রমিকরা এই মজুরী বৈষম্য নিরসনে সংশিস্নষ্ট প্রশাসনের হসত্মড়্গেপ কামনা করেন।
রাজশাহী জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি কল্পনা রায় বলেন, গ্রামে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে এটা যেমন খুশির বিষয়, তেমনি শহরে অংশগ্রহণ কমাটা কোনো ভালো লক্ষণ নয়। মেয়েরা সমসত্ম ধরনের ট্যাবু ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসছেন। উদ্যোক্তা হিসেবে আসছেন, অবদান রাখছেন কৃষি, পশুপালন, মৎস্য চাষের মতো কাজেও। গ্রাম ছেড়ে ছেলেরা শহরমুখী কিংবা বিদেশে চলে যাচ্ছেন। কর্মক্ষেত্রে ছেলেদের সেই শূন্যস্থানটা পূরণ করছেন মেয়েরা। কাজের ক্ষেত্রে নারীদের মান বাড়াতে আমাদের প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা দিতে হবে। অপরদিকে, শহরের মেয়েদের পিছিয়ে পড়ার সবচেয়ে বড়ো কারণ এই কর্মপরিবেশ। এছাড়া কর্মড়্গেত্রে নারী-পুরম্নষের মজুরি বৈষম্য কমাতে হবে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, দেশে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে মেয়েদের কাজের ক্ষেত্র বাড়ছে। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজের চাহিদা কমছে। তাই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মীদের ভিড় বাড়ছে। প্রতিষ্ঠানিক খাতেও শিক্ষা ও গার্মেন্টস খাতে কম বেতনের কর্মীর কাজের চাহিদা বাড়ছে। শহরেও প্রাতিষ্ঠাানিক ক্ষেত্রে যে নারীরা অংশ নিচ্ছেন বিশেষত গার্মেন্ট খাত, সেখানেও মূল শক্তি গ্রাম থেকে আসা নারীরাই। গ্রামাঞ্চলে এনজিওর বিসত্মৃতির ফলে মেয়েদের বাইরে বের হয়ে আসার বাধাটা কেটে গেছে। ফলে গ্রামের নারীরা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত যমন কৃষি, পশুপালন, মৎস্য চাষ প্রভৃতি ক্ষেত্রে কাজে যুক্ত হচ্ছেন। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে তা হচ্ছে না। খুব দক্ষ না হলে নারীর কাজের ক্ষেত্র প্রাতিষ্ঠানিক খাতে সংকুচিত।