এফএনএস: সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় ও সময় নানা কৌশলে বাড়ানো হয়। মূলত সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের লোভের কারণেই দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্প বাস্তবায়নে এমন অবস’া বিরাজ করছে। এতে একদিকে যেমন অর্থের অপচয় বাড়ছে, অন্যদিকে প্রকল্পের কাঙিৰত সুফল পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। এমন অবস’ার অবসানে কঠোর অবস’ানে যাচ্ছে পরিকল্পনা কমিশন। ওই লৰ্যে সম্প্রতি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় শুধুমাত্র বাস্তব প্রয়োজন ছাড়া প্রকল্প সংশোধন প্রস্তাব বিবেচনা না করতে মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং পরিকল্পনা কমিশনের সেক্টরগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সংশিৱষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
সংশিৱষ্ট সূত্র মতে, প্রাথমিকভাবে ছোট কলেবরে প্রকল্প গ্রহণ করে অনুমোদনের পর বাস্তবায়ন পর্যায়ে প্রকল্পের কলেবর বৃদ্ধি করে প্রকল্প সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়। তাতে চলমান প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ হয় না। বরং তাতে প্রকল্পের কাজের বাস্তবায়ন অগ্রগতি যেমন বাধাগ্রস্ত হয়, তেমনি যথাসময়ে প্রকল্পের সুবিধা হতেও জনগণ বঞ্চিত হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি সামগ্রিকভাবে এডিপি বাস্তবায়ন অগ্রগতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বরং গৃহীত প্রকল্প অনুমোদিত মেয়াদে সম্পন্ন করে নতুন কার্যক্রম নিয়ে নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা অধিকতর যুক্তযুক্ত। সেজন্য প্রকল্পের শুর্বতেই সতর্ক হওয়া জর্বরি।
সূত্র জানায়, সরকারি মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো এডিপি তৈরিতে নির্দেশনা মানছে না। চলতি অর্থবছরের (২০১৯-২০) এডিপিতে ৫৮টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছিল। অথচ ওসব প্রকল্প ২০১৮-১৯ অর্থবছরের মধ্যেই সমাপ্ত করার কথা ছিল। সেজন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দসহ বারবার তাগাদাও দেয়া হয়েছিল। কিন’ তাতে কাজ হয়নি। এ অবস’াকে অর্থ বরাদ্দের ৰেত্রে সমস্যা এবং আর্থিক ব্যবস’াপনায় বিশৃঙ্খলা বলে মনে করে পরিকল্পনা কমিশন। এর পরিপ্রেৰিতে ১২টি প্রকল্পকে সমাপ্ত ঘোষণা করে এডিপি থেকে বাদ দেয়ার সুপারিশ করা হয়। তাছাড়া ৩৭টি প্রকল্পে এক লাখ টাকা করে বরাদ্দ দিয়ে চলমান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল। ইতোমধ্যেই বাকি ৯টি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। মে মাসে অনুষ্ঠিত কমিশনের বর্ধিত সভায় এসব তথ্য উপস’াপন করা হয়।
সূত্র আরো জানায়, বিগত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের এডিপি বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ওই অর্থবছরে মোট ১ হাজার ৭৪০টি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। তার মধ্যে সমাপ্ত হয়েছিল ২৪৬টি প্রকল্প। বাকি প্রকল্পগুলোর মধ্যে ৯০টি প্রকল্পের অনুকূলে ৯১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও এক টাকাও ব্যয় হয়নি। আর্থিক অগ্রগতি ছিল শূন্য। এর কারণ হলো নতুন প্রকল্পের দরপত্র আহ্বানে বিলম্ব, ঋণ না পাওয়া, অর্থছাড় না হওয়া বা দেরিতে অর্থছাড় হওয়া, ভূমি অধিগ্রহণ না হওয়া, মামলাজনিত সমস্যা, প্রকল্প সংশোধন, উন্নয়ন সহযোগী সংস’ার সঙ্গে চুক্তিতে বিলম্ব এবং নামমাত্র বরাদ্দ ইত্যাদি। তাছাড়া ৯৮টি প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ছিল শূন্য। ওই অর্থবছরের ২৫টি প্রকল্পের অনুকূলে মাত্র ১ লাখ টাকা করে বরাদ্দ ছিল, যার বিপরীতে দুটি প্রকল্প ছাড়া বাকিগুলোর কোনো আর্থিক অগ্রগতি হয়নি। তবে ৪৩টি প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয়ের ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় শতভাগ হয়েছে। ২৪৪টি প্রকল্পে ৯০-৯৯ শতাংশ অর্থব্যয় হয়েছে। ২০১টি প্রকল্পে ৭৬-৮৯ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে। ২৯০টি প্রকল্পে ৫১-৭৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। ৩১০টি প্রকল্পে ২৬-৫০ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। ৪৯৭টি প্রকল্পে ২৫ শতাংশের নিচে অর্থব্যয় হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে ২৭৩টি প্রকল্পের আর্থিক এবং ১৯৩টি প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি সন্তোষজনক ছিল না।
এদিকে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পের সিডিউল রেট পরিবর্তন, ডিজাইন পরিবর্তন, স্পেসিফিকেশন পরিবর্তন, ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় বৃদ্ধি, নতুন আইটেম অন্তর্ভুক্ত বা কর্মপরিধি বৃদ্ধির নামেই কৌশলে প্রকল্প সংশোধন করা হয়। কিন’ এর পেছনে থাকে অন্য উদ্দেশ্য। কেননা প্রকল্প যতদিন চলবে সংশিৱষ্ট দায়িত্বশীলরা ততদিন সুবিধা নিতে পারে। প্রকল্পে আকর্ষণের শেষ নেই। পুকুর খনন প্রকল্পে এবং ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানো প্রকল্পেও বিদেশ সফর যুক্ত করা হয়। আর প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার, ভাতা নেয়াসহ নানা সুবিধার কারণে সংশিৱষ্টরা চান না দ্র্বত প্রকল্প শেষ হয়ে যাক। তাছাড়া প্রকল্প তৈরির সময়ই দৰতার অভাব থাকে। যেনতেনভাবে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। ফলে বাস্তবায়ন পর্যায় এসে ডিজাইন পরিবর্তন, নতুন অঙ্গ সংযোজন করতে হয়।
অন্যদিকে, বিগত ২০১৬ সালের অক্টোবরে পরিকল্পনা বিভাগ থেকে একটি পরিপত্র জারি করে প্রকল্প সংশোধনকে নির্বৎসাহিত করা হয়। কিন’ বাস্তবে প্রতিটি প্রকল্প এক বা একাধিকবার সংশোধন করা হয়ে থাকে। প্রকল্প সংশোধনের অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে যথাযথ সমীৰা ও কারিগরি ডিজাইন ছাড়াই প্রকল্প গ্রহণ করা। আর প্রকল্প চললে ৰমতা, ভাতা, গাড়িসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধার পাশাপাশি স্বজনপ্রীতি করে আত্মীয়স্বজনদেরও চাকরি দেয়া যায়। এতো সুবিধার আকর্ষণ কেউ সহজেই ছাড়তে চান না।
এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান এর আগে বলেছেন, প্রকল্প সংশোধনের বিষয়ে কঠোর অবস’ান নেয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে তিন বার কোনো প্রকল্প সংশোধনের জন্য প্রস্তাব এলে তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে উপস’াপন করা হবে। প্রয়োজনে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এরকম প্রকল্পের একটি আলাদা তালিকা তৈরি করা হবে। কোনো ক্রমেই বারবার প্রকল্প সংশোধন কাম্য নয়।