তৈয়বুর রহমান: ধর্ষণ থামছেই না। এর সাথে বাড়ছে গণধর্ষণও। ধর্ষণের হাত থেকে রড়্গা পাচ্ছে না ছাত্রীরাও। ধর্ষণ-নির্যাতনে নিরাপত্তাহীনতায় নারী সমাজ। একের পর এক ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন নারী। বাদ যাচ্ছে না শিশুরাও। নৃশংস ও অভিনব কায়দায় ধর্ষণ ও গণধর্ষণ করে চলেছে দুর্বৃত্তরা।
দেশে গত সপ্তাহে ধর্ষিত হয়েছে ৮ থেকে ১০ জন নারী ও শিশু। মাদারিপুরে বেড়াতে গিয়ে বখাটের ধর্ষণের শিকার হন মা্‌দ্রাসার ছাত্রীসহ তিন জন। পরিচিত দুইজন বখাটে এক ট্রলারে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে পালাক্রমে। পুলিশ খবর পেয়ে সেখান থেকে দুই যুবকসহ তাদের উদ্ধার করে। গত ২৪ আগস্ট ৩ জন শিশুসহ ৫জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে সিলেটের রায়গঞ্জ ও কক্সবাজারের পেকুয়ায়। গত বুধবার ঠাকুরগাঁওয়ে বেড়াতে এসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে এক যুবতি। কয়েক মাসে ধর্ষিত হন মাদ্রাসা ছাত্রী নূসরাতসহ বেশ কয়েকজন মাদ্রাসা ও স্কুলের ছাত্রী। এদিকে দেশের কয়েকটি স’ানে ৫-৬ বছরের শিশুও ধর্ষণের শিকার হয়।
এ বছরের (জানুয়ারি থেকে জুন পর্যনত্ম) প্রথম ছয় মাসেই সারাদেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৩১ জন নারী ও শিশু। যাদের মধ্যে হত্যা করা হয়েছে ২৬ জনকে।
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দেশের ১৪টি জাতীয় দৈনিকের তথ্য বিশেস্নষণ করে এই তথ্য তুলে ধরে মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আয়েশা খানম জানান, গতবছর সারাদেশে ৯ শ ৪২টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয় ৬৩ জন নারী ও শিশুকে। অর্থাৎ, গতবছর যে পরিমাণ ধর্ষণ হয়েছে তার অর্ধেক সময়ে এবছর ধর্ষণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় দেড়গুণ। এই পরিসংখ্যান বলছে, শেষ ছয়মাসে শস্নীলতাহানীর শিকার হয়েছেন ৫৪ জন নারী, ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১২৩ জনকে, যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৭০ জন।
গত বছরের তুলনায় ধর্ষণের হার দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে নারীসহ সমাজের সবাই। অবস’াটা এমন এক পর্যায়ে গেছে যে কী এমন কারণে এধরনের মনসতাত্ত্বিক পরিবর্তন হলো সেটা গবেষণা করে দেখা দরকার।
এদিকে রাজশাহীতেও বেড়ে গেছে ধর্ষণের ঘটনা। এসিডির জরিপে জানা গেছে যে ২০১৯-এ রাজশাহী জেলায় জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যনত্ম ৮৬ জন নারী নির্যাতনের মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭ জন ।
এ ছাড়াও গত এক মাসে (আগস্ট ২০১৯) ১৭ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১১টি নারী ও ৬টি শিশু নির্যাতনের মধ্যে ১ জন ধর্ষণের শিকার হয়। গত আগস্ট মাসের স’ানীয় ও জাতীয় সংবাদপত্রসমূহ এবং এসিডি’র নিজস্ব প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই জরিপ পরিচালিত হয়েছে। গত শনিবার দুপুরে রাজশাহীর বেসরকারি উন্নয়ন ও মানবাধিকার সংস’া এসিডি’ এর ‘রিসার্চ, ডকুমেন্টেশন অ্যান্ড পাবলিকেশন ইউনিট’ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আগস্ট মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে গত ২ আগস্ট ২০১৯ পুঠিয়ায় নারীর আত্মহত্যা, ৪ আগস্ট বাগমারা স্বাস’্য কমপেস্নক্সে যৌন হয়রানির দায়ে বখাটের কারাদ-, ১০ আগস্ট মহানগরীর সোনাদিঘীর মোড় এলাকায় রাজশাহী প্রকৌশল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রম্নয়েট) এক শিড়্গকের স্ত্রী বখাটেদের হাতে শস্নীলতাহানির শিকার, ১৯ আগস্ট মোহনপুরে স্ত্রী ডিভোর্স দেয়ায় ইন্টারনেটে নগ্ন ছবি ছাড়ে স্বামী, ২০ আগস্ট নগরীতে রম্নয়েট শিড়্গার্থী যৌন হয়রানির শিকার, দুর্গাপুরে অস্ত্রের মুখে কিশোরী অপহরণ, ২৩ আগস্ট নগরীতে স্কুল থেকে ফেরার পথে ছাত্রী অপহরণ এবং গোদাগাড়ীতে স্কুল ছাত্রীর আত্মহত্যা, ২৪ আগস্ট কাঁটাখালিতে গৃহবধূর ঝুলনত্ম লাশ উদ্ধার, ২৪ আগস্ট নগরীতে সৎ বাবার হাতে মেয়ে ধর্ষণের শিকার, ২৭ আগস্ট পুঠিয়ায় গলায় ফাঁস দিয়ে গৃহবধূর আত্মহত্যা, গত ২৯ আগস্ট রাতে নগরীতে পুলিশ কনস্টেবলের হাতে এক নারী শস্নীলতাহানির শিকার।
আরও বলা হয়, জেলায় আগস্ট মাসে ১১ নারী নির্যাতনের ঘটনার মধ্যে মহানগরীর থানাগুলোতে সংঘটিত হয়েছে ৬ টি এবং মহানগরীর বাইরের থানাসমূহে সংঘটিত হয়েছে ৫ টি নির্যাতনের ঘটনা। এরমধ্যে বাগমারায় ২টি, পুঠিয়ায় ২টি এবং মোহনপুরে ১ টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার মধ্যে ধর্ষণ ১টি, ধর্ষণচেষ্টা ১টি, আত্মহত্যা ৩টি, যৌন হয়রানি ৫টি এবং অন্যান্য ঘটনা ঘটে ১টি।
জেলায় গত মাসে শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে ৬ টি। এসব ঘটনার মধ্যে মহানগরীর থানাগুলোতে সংঘটিত হয়েছে ১ টি এবং মহানগরীর বাইরের থানাসমূহে সংঘটিত হয়েছে ৫ টি নির্যাতনের ঘটনা। এর মধ্যে মোহনপুরে ১টি, দুর্গাপুরে ২টি এবং গোদাগাড়ীতে ২ টি শিশু নির্যাতনের খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার মধ্যে ধর্ষণ ১ টি, অপহরণ ২ টি, আত্মহত্যা ১টি এবং যৌন হয়রানি ২টি।
উক্ত তথ্য মতে গত ২ জুলাই পুঠিয়ায় গভীর রাতে নারীকে কুপিয়ে হত্যা, ৭ জুলাই গোদাগাড়ীতে গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু, ৯ জুলাই মাকে হত্যা মাদকাসক্ত ছেলে আটক, ১৭ জুলাই দুর্গাপুরে অনত্মঃসত্ত্বা নারীকে নির্যাতন করে গর্ভপাত, ২১ জুলাই দুর্গাপুরে তিন বছরের শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা অভিযুক্ত আটক, ২৭ জুলাই নগরীতে নার্সিং কলেজের মেসে ছাত্রীর ঝুলনত্ম লাশ এবং ৩০ জুলাই রাজশাহীতে যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূকে নির্যাতন।
রাজশাহী জেলায় জুলাই মাসে ১৩ টি নারী নির্যাতনের মধ্যে মহানগরীর থানাগুলোতে সংঘটিত হয়েছে ৬ টি এবং মহানগরীর বাইরের থানাসমূহে সংঘটিত হয়েছে ৭ টি নির্যাতনের ঘটনা। এরমধ্যে বাগমারায় ১টি, পুঠিয়ায় ২টি, গোদাগাড়ীতে ২টি, পবায় ১টি এবং দুর্গাপুরে ১ টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার মধ্যে হত্যা ২টি, হত্যার চেষ্টা ৩ টি, রহস্যজনক মৃত্যু ৩টি, আত্মহত্যা ২টি, আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা ঘটে ১টি, নিখোঁজ ১টি এবং ১টি যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে।
রাজশাহী জেলায় গত মাসে শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে ৬ টি। এসব ঘটনায় মহানগরীর বাইরের থানাগুলোতে সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে বাগমারায় ০২টি, মোহনপুরে ১টি, দুর্গাপুরে ১টি এবং পুঠিয়ায় ২ টি শিশু নির্যাতনের খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার মধ্যে ধর্ষণের চেষ্টা ১ টি, অপহরণ ২ টি, আত্মহত্যার চেষ্টা ১টি, নিখোঁজ ১টি এবং অন্যান্য ঘটনা ঘটে ১ টি।
নারী ধর্ষণ সম্পর্কে রাজশাহী মহিলা পরিষদের সভাপতি কল্পনা রায় বলেন, এখন নারী ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন নিত্য দিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এতে নারী অধিকার দিনের পর দিন খর্ব হচ্ছে। নারী ধর্ষণকারীদের দৃষ্টানত্মমূলক শাসিত্ম দিতে হবে। এর বিরম্নদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।