রিমন রহমান: সামান্য এক হাজার টাকার জন্য এখন কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয় রাজশাহীর সর্বপ্রাচীন দালান ‘বড়কুঠি’। ঐতিহাসিক এই ভবনে বিয়ে, সুন্নাতে খাৎনাসহ সব ধরণের অনুষ্ঠান হয়। এতে ভবনটি ড়্গতিগ্রসত্ম হচ্ছে। এ নিয়ে ড়্গোভ প্রকাশ করছেন রাজশাহীর প্রাচীন ঐতিহ্যের গবেষকরা।
এদিকে গতকাল শুক্রবারও ধুমধামে বিয়ের অনুষ্ঠান হয়ে গেলো বড়কুঠিতে। গতকাল দিনভর প্রাচীন এই পুরাকীর্তির ভেতর চুলো বসিয়ে রান্না-বান্না, খাওয়া-দাওয়া, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সবই হলো। বিয়ের অনুষ্ঠান উপলড়্গে বড়কুঠিতে জমায়েত হয়েছিলেন প্রায় পাঁচ শতাধিক অতিথি।
বড়কুঠি ভবনের সামনেই প্রবেশপথের পাশে একটি সাইনবোর্ড রয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের। এতে লেখা রয়েছে- ‘সংরড়্গিত পুরাকীতি, কোনো ব্যক্তি এই পুরাকীর্তির কোনো রকম ধ্বংস বা অনিষ্ট সাধন করলে বা এর কোনো বিকৃতি বা অঙ্গচ্ছেদ ঘটালে বা এর কোনো অংশের ওপর কিছু লিখলে বা খোদাই করলে বা কোনো চিহ্ন বা দাগ কাটলে ১৯৬৮ সালের ১৪ নম্বর পুরাকীর্তি আইনের ১৯ ধারার অধীনে সর্বাধিক এক বছর পর্যনত্ম জেল বা জরিমানা অথবা উভয় দ-ে দ-িত হবেন।’
কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্তদের সহযোগীতায় ভবনটির নিচতলা ব্যবহার করে অনুষ্ঠিত হলো বিয়ের অনুষ্ঠান। বড়কুঠি এলাকার বাসিন্দা মো. আলমের মেয়ে মিমি খাতুনের বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতায় সেখানে হয়। বর রম্নবেল হোসেনের বাড়ি নগরীর তেরোখাদিয়া এলাকায়। পেশায় তিনি একজন ব্যবসায়ী। আর মিমির বাবা আলম রাজশাহী সিটি করপোরেশনের একজন কর্মচারী।
গতকাল দুপুরের পর বড়কুঠির সামনে গিয়েই দেখা গেল বিয়ের জন্য নির্মাণ করা গেট। প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই পশ্চিম দিকে চোখে পড়লো চুলো জ্বালিয়ে রান্না করার দৃশ্য। আর পূর্ব দিকে ধুয়ে পরিস্কার করা হচ্ছিল খাবারের থালা। উচ্ছীষ্ট খাবার পড়ে ছিল সেখানে। মূল ভবনের ভেতরে ঢুকতেই যে কড়্গ সেখানে করা হয়েছিল কনের বসার স্থান। এই কড়্গটি পার হয়ে ভেতরে গেলেই ‘পাঠকড়্গ’ নামের একটি কড়্গ। চেয়ার-টেবিল সাজিয়ে সেখানে চলছিল খাওয়া-দাওয়া। আর ‘তাসকড়্গ’ নামের আরেকটি কড়্গে রান্নার পর রাখা হয়েছিল খাবার। এছাড়া পাশের আরেকটি কড়্গে করা হয়েছিল বর রম্নবেল হোসেনের বসার স্থান। পুরো বড়কুঠি ভবনের নিচতলা ছিলো লোকে লোকারণ্য। ঠিক কমিউনিটি সেন্টারের মতোই ব্যবহার হলো প্রাচীন এই ভবনটি।
অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ডাচ্‌রা রাজশাহী শহরে রেশম ও অন্যান্য জিনিসের ব্যবসা শুরম্ন করে। এই শতাব্দীর মাঝামাঝি কোনো এক সময় তারা বড়কুঠি নির্মাণ করে। ব্যবসায়ীদের কাছে এটা ‘ডাচ্‌ ফ্যাক্টরি’ হিসেবে পরিচিত ছিল, তবে স্থানীয়ভাবে এই স্থাপনাকে ‘বড়কুঠি’ বলা হয়। বর্ষিয়ানেরা মনে করেন, বড়কুঠি নির্মাণকালে এর চেয়ে বড় কোনো ইমারত রাজশাহী শহরে ছিল না। আশপাশের সব নীলকুঠির মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় বা মর্যদাসম্পন্ন হওয়ায় এর নাম হয়েছিল বড়কুঠি।
দেশভাগের পর ১৯৫১ সালে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হলে বড়কুঠি সরকারি সম্পত্তিতে পরিণত হয় এবং খাদ্য বিভাগের অফিস হিসেবে ব্যবহূত হতে থাকে। ১৯৫৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে বড়কুঠি বিশ্ববিদ্যালয়কে হসত্মানত্মর করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় তার বর্তমান অবস্থানে যাওয়ার আগ পর্যনত্ম বড়কুঠি উপাচার্যের কার্যালয় ও বাসস্থান হিসেবে ব্যবহূত হয়। বর্তমানে বড়কুঠিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ক্লাব রয়েছে। সম্প্রতি এটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেয়ার সিদ্ধানত্ম নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। তবে প্রক্রিয়াটি এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি।
বড়কুঠির দেখাশোনার জন্য এর নিচতলায় পরিবার নিয়ে থাকেন প্রহরী গোলাম মোর্তজা চান্দু। দুটি কড়্গ তিনি ব্যবহার করেন। এর একটি ‘ক্রীড়া কড়্গ’ তার শোবার ঘর। মোর্তজার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পিয়ন মো. বাবলুও বড়কুঠির দেখাশোনার দায়িত্বে আছেন। তবে তিনি পরিবার নিয়ে থাকেন বড়কুঠি ভবনের সামনের মহলস্নায়। এই দুই কর্মচারী বড়কুঠিতে বিয়ের অনুষ্ঠানের অনুমতি দিয়েছেন।
বিষয়টি স্বীকার করে কনের বাবা মো. আলম বলেন, বড়কুঠিতে এর আগেও বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান হয়েছে। এ জন্য এক হাজার টাকা ভাড়া লাগে। তিনি বাবলু ও মোর্তজার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে অনুষ্ঠান করেছেন।
জানতে চাইলে বড়কুঠির প্রহরী গোলাম মোর্তজা বলেন, ভবনটিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারী ক্লাব রয়েছে। এই ক্লাবের পড়্গ থেকেই অনুষ্ঠানের জন্য বড়কুঠির নিচতলা ব্যবহার করতে দেয়া হয়। অনুষ্ঠান হলে যে টাকা নেওয়া হয় সেটা কর্মচারী ক্লাবের তহবিলে জমা করা হয়। এটা আগে থেকেই চলে আসছে।
তবে হেরিটেজ রাজশাহীর প্রতিষ্ঠাতা মাহাবুব সিদ্দিকী বলছেন, বড়কুঠি রাজশাহীর সবচেয়ে প্রাচীন স্থাপনা। এটাকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মতো ভাড়া দেওয়া চরম অন্যায়। এর চেয়ে অন্যায় আর কিছু হতে পারে না। মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, বড়কুঠির পরিচর্যা করে এটাকে একটা বড় প্রতিষ্ঠানে রূপ দেয়ার কথা। সেখানে এ রকম অনুষ্ঠান হচ্ছে শুনে আমি খুবই কষ্ট পাচ্ছি। নিন্দা জানাচ্ছি।
জানতে চাইলে প্রত্মতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা বলেন, এতো প্রাচীন স্থাপনায় ব্যক্তিগত বা সামাজিক অনুষ্ঠান করার অনুমতি দেয়া যায় না। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে একটি পুরনো মিলনায়তন আছে। প্রাচীন ঐতিহ্য বলে সেখানেই আমরা কোনো অনুষ্ঠান করার অনুমতি দেই না। আর রাজশাহীর বড়কুঠি তো আরও গুরম্নত্বপূর্ণ। সেখানে অনুষ্ঠান করার অনুমতি দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তিনি একজন কর্মকর্তা পাঠিয়ে এ বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন।
বড়কুঠিতে বিয়ের অনুষ্ঠান নিয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার এমএ বারী বলেন, ভবনটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেয়ার একটা সিদ্ধানত্ম হয়েছে। তাই প্রত্মতত্ত্ব অধিদপ্তর সেখানে সাইনবোর্ড টাঙিয়েছে। এ অবস্থায় ভবনটি দেখাশোনার জন্য জেলা প্রশাসনেরও দায়িত্ব রয়েছে।
জেলা প্রশাসক হামিদুল হক বলেন, বড়কুঠি এখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকায় এর যেন কোনো ড়্গতি না হয় সেটি তাদেরকেই নিশ্চিত করতে হবে। তারপরেও তিনি এ বিষয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে কথা বলবেন। ভবনটির যেন কোনো ড়্গতি না হয় সেটি নিশ্চিত করা হবে।
বড়কুঠি একটি দুইতলা পাকা বাড়ী যার দৈর্ঘ্য ৮২ ফুট এবং প্রস্থ ৬৭ ফুট। এতে ১২টি কামরা আছে। ওপর তলায় আছে ছয়টি বিভিন্ন মাপের কামরা এবং একটি সভাকক্ষ, এই কামরাগুলো আবাসনের জন্য ব্যবহূত হতো। নিচের কামরাগুলোকে বর্তমানে বহু প্রকোষ্টে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রথম থেকেই নিচতলার কামরাগুলো অন্ধকার ও স্যাতস্যাতে, তুলনামূলকভাবে এখানে আলো ও বাতাসের প্রবেশ কম। ধারনা করা হয়, নিচতলার ঘরগুলো গুদাম ও বন্দীশালা হিসেবে ব্যবহার হতো।
ব্যবসার নিরাপত্তার জন্য ডাচ্‌রা এই কুঠিকে দুর্গ হিসেবে তৈরি করেছিল। যে কোনো দিক থেকে আক্রমণ প্রতিহত করতে কুঠির সবদিকেই সশস্ত্র প্রহরীর ব্যবস্থা ছিল। কুঠির চোখে পড়া বা দর্শনীয় অংশ হচ্ছে এর দক্ষিণ দিকের দুই পাশের উঁচা বুরম্নজ। বাইরের আক্রমণ প্রতিহত করতে নিজস্ব প্রহরীদের জন্য এতে অসংখ্য ফুটো রাখা হয়। এই ফুটো দিয়ে তারা বাইরে এলাকা পর্যবেক্ষণ করতো। প্রয়োজনে সেই ফুটো দিয়ে শত্রম্নকে লড়্গ্য করে গুলি ছুঁড়তো। এতে শত্রম্ন ঘায়েল হতো।
বড়কুঠির দড়্গিণে পদ্মা নদী। নদীপথ থেকে আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য বড়কুঠির ছাদে হালকা কামান স্থাপন করা ছিল। এখানে ছোট-বড় ১৪টি কামান ছিল। এই কামানগুলোর গায়ে ভিওসি (ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী) অক্ষর ক্ষোদিত ছিল। মেদিনীপুর জমিদার কোম্পানি বড়কুঠির কর্তৃত্ব গ্রহণ করার পর এই কামানগুলো নদীয়ার শিকারপুর কুঠিতে স্থানানত্মর করে। তবে একটি কামান রাজশাহী পুলিশ লাইনে স্থানানত্মর করা হয়। বিংশশতাব্দীর প্রথম দিক পর্যনত্ম এই কামান মধ্যাহ্নকালীন তোপধ্বনীর কাজে ব্যবহার হতো।
১৮৫৭ সালে সিপাই বিদ্রোহকালে ইংরেজরা একটি অস্থায়ী ক্যাভালরি কোম্পানি গঠন করে। এটির নাম ছিল রাজশাহী ক্যাভালরি। বড়কুঠি রাজশাহী ক্যাভালরির সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহার হয়। উনবিংশ শতাব্দির শেষের দিকে মেদিনীপুর জমিদার কোম্পানির কাছ থেকে বড়কুঠি কিনে নেয়।
কয়েক বছর আগে এক ডাচ যুবক এসেছিলেন রাজশাহীতে। একটি মানচিত্র নিয়ে তিনি বড়কুঠি এলাকায় কী যেন খোঁজখুঁজি করছিলেন। পরে জানা গেছে, ওই ডাচ যুবক মানচিত্র নিয়ে তাঁর দাদার কবর খুঁজছিলেন। কিন্তু কোথাও কিছু লেখা পাননি তিনি। তাই হতাশ হয়ে তাকে ফিরে যেতে হয়।