রিমন রহমান: পুকুর খননের প্রশিড়্গণ নিতে বিদেশে যেতে হবে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপড়্গের (বিএমডিএ) ১৬ জন কর্মকর্তাকে। এ জন্য মাথাপিঁছু খরচ হবে ৮ লাখ টাকা। ১২৮ কোটি ১৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকার একটি প্রকল্পের ভেতর কর্মকর্তাদের বিদেশের এই প্রশিড়্গণ বাবদ ধরা হয়েছে ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা।
ইতিমধ্যেই প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন হয়েছে। গত মঙ্গলবার ‘পুকুর পুনঃখনন ও ভূ-উপরিস্থ পানি উন্নয়নের মাধ্যমে ড়্গুদ্র সেচের ব্যবহার’ শীর্ষক এই প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। এখন আরও কিছু প্রক্রিয়ার পাশাপাশি শুরম্ন হবে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগের প্রক্রিয়া। এরপরই প্রশিড়্গণের জন্য বিএমডিএ’র ১৬ জন কর্মকর্তা যাবেন বিদেশ।
সংশিস্নষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিএমডিএ সদর দপ্তরে কর্মরত নির্বাহী প্রকৌশলী ও স্মার্ট কার্ড বেইজড প্রিপ্রেইড পাম্প ইউজেস অ্যান্ড এনার্জি মিজারিং সিস্টেম প্রকল্পের (দ্বিতীয় পর্যায়) পিডি প্রকল্প প্রসত্মাবটি প্রস্তুত করেছিলেন। সেটি কৃষি মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশন হয়ে একনেকে ওঠে। একনেক সভা তা অনুমোদন দেয়। প্রকল্প প্রসত্মাবনা অনুযায়ী, পুকুর পুনঃখননের জন্য প্রতি লাখ ঘন মিটারে ব্যয় হবে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং দিঘি পুনঃখননের ড়্গেত্রে ব্যয় হবে ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
বিএমডিএ বলছে, বরেন্দ্র অঞ্চলে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত কম। সেচকাজে মূলত ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তাই ১২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এ অঞ্চলের ৪৩টি উপজেলায় পুকুর ও দিঘি পুনঃখননের প্রকল্প বাসত্মবায়ন করা হবে। এ প্রকল্পে ৭১৫টি পুকুর ও ১০টি দিঘি পুনঃখনন, ৮৫টি সৌরচালিত লো লিফট পাম্প স্থাপন, ৮০টি ভূ-গর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণ, ৮৫টি প্রিপেইড মিটার ক্রয়, ৯ হাজার মিটার ফিতা পাইপ ক্রয় এবং দেড় লাখ বৃক্ষ রোপণ অনত্মর্ভুক্ত আছে। এসব পুকুর, খালকে পুনঃখনন করা হলে ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে সেচ সুবিধা সমপ্রসারণ করে বহুমুখী কাজে ব্যবহার করা যাবে। এর ফলে তিন হাজার হেক্টর জমিতে সেচসুবিধা সমপ্রসারিত হবে । এতে প্রতি বছর অতিরিক্ত প্রায় ১৮ হাজার ৩৪৮ মেট্রিক টন ফসল উৎপাদন ও মৎস্যচাষের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি বহুমুখী কাজে পুকুরের পানি ব্যবহারের সুযোগ হবে। এতে চাপ কমবে ভু-গর্ভস্থ পানির ওপর।
ব্যয় বিভাজনে দেখা যায়, এ প্রকল্পে ১৮ জন কর্মকর্তা ও ৮ জন কর্মচারী কাজ করবেন। তাদের বেতন ধরা হয়েছে সাড়ে ৩ কোটি টাকার বেশি। তাদের ভাতা যাবে সোয়া ৭ কোটি টাকা। এখানে দুই ব্যাচে ১৬ জনকে বিদেশে প্রশিক্ষণ নিতে পাঠানো হবে। এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা। ফলে জনপ্রতি ব্যয় হবে ৮ লাখ টাকা। এছাড়া ৭২৫টি পুকুর ও দিঘির জরিপে ব্যয় হবে সাড়ে ৭৩ লাখ টাকা। ভূ-গর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণের জন্য ইউপিভিসি পাইপ কেনা হবে ১ হাজার মিটারের ৮৫টি, যাতে খরচ ধরা হয়েছে ৬ কোটি টাকা। ফলে প্রতিটি পাইপের মূল্য পড়ছে সাড়ে ৭ লাখ টাকা। আর এই পাইপ প্রতিটি বসাতে ব্যয় হবে ৪ লাখ টাকা। ৮০টি পাইপ বসাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা।
শুধু তাই নয়, ৪২ মাস মেয়াদী এই খনন কার্যক্রমের জন্য বাড়ি ভাড়া বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ কোটি ৬২ লাখ ২০ হাজার টাকা। যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী এই প্রকল্পের জন্য নিয়োগ পাবেন তাদের সবাইকেই নিতে হবে বাড়ি ভাড়া। প্রকল্পটির বাসত্মবায়ন এলাকা রাজশাহী, নওগাঁ, বগুড়া ও নাটোর জেলার ৪৩টি উপজেলা। সেচকাজে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশ উন্নয়ন এবং প্রানিত্মক চাষিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এই প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছে বিএমডিএ।
এই প্রকল্পের সব খরচই করবে সরকার। তবে এই প্রকল্পে কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিড়্গণ নিয়ে বিভিন্ন মহলে শুরম্ন হয়েছে সমালোচনা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে খাল খননের ওপর ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করার নজির রয়েছে। অথচ পুকুর ও দিঘি পুনঃখননের প্রশিক্ষণ নিতে বিদেশে যাওয়া রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়। সরকারি কর্মকর্তাদের মনোরঞ্জনের জন্যই এসব ব্যয়ের খাত তৈরি করা হয়েছে বলে মনে করেন তারা।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রাজশাহী অঞ্চলের সমন্বয়কারী সুব্রত পাল বলেন, প্রকল্পের টাকা জনগণের। এই টাকা খরচের ড়্গেত্রে দায়বদ্ধতা এবং জবাবদিহিতা থাকতে হবে। তিনি বলেন, প্রশিড়্গণের দরকার আছে। কিন্তু এর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু সেটাও আগে দেখতে হবে। দু’একজন কর্মকর্তা বিদেশে প্রশিড়্গণের জন্য যেতে পারেন। তারা এসে অন্যদের প্রশিড়্গণ দিতে পারেন। তাহলে খরচ কমবে।
সুব্রত পাল বলেন, আমাদের দেশেও দড়্গ, যোগ্য জনবল আছে। তাদের কাজে লাগানো যেতে পারে। তাছাড়া বিদেশ থেকে দু’একজন বিশেষজ্ঞকে পরামর্শক হিসেবে নিয়ে এসেও কাজ করা যেতে পারে। সেড়্গেত্রে ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা খরচ হবে না। এতো বিপুল অংকের টাকা খরচ করে প্রশিড়্গণের কোনো মানেই হয় না।
তবে বিএমডিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল হক বলেছেন, বিদেশে অনেক উন্নত উপায়ে পুকুর-দিঘি খনন করা হয়। সেগুলো সরেজমিনে না দেখলে অভিজ্ঞতা হবে না। তিনি বলেন, শুধু পুকুর-দিঘি খননই নয়, উন্নত দেশে কীভাবে বৃষ্টির পানি সংরড়্গণ করা হয় এবং ভূ-উপরিস্থ পানি কাজে লাগানো হয় সেটাও প্রশিড়্গণের সময় কর্মকর্তারা দেখবেন। তাই বিদেশে প্রশিড়্গণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
বিএমডিএ’র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবদুর রশীদও একই কথা বলেছেন। তিনি জানান, প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন হলেও এখনও বেশকিছু প্রক্রিয়া বাকি। তারপর পিডি নিয়োগ করা হবে। এরপর কাজ শুরম্ন হবে। মাঠপর্যায়ে প্রকল্প বাসত্মবায়নের কাজ শুরম্ন হবে আগামী জানুয়ারি-ফেব্রম্নয়ারি মাসের দিকে।