স্টাফ রিপোর্টার: নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন ‘শাহাদাত-ই আল হিকমা’র পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এক মাদ্রাসার কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে রাজশাহীর তানোর উপজেলার পাঁচন্দর গ্রামের একটি পরিবার। তাদের জমি জোর করে দখলে নেয়ার চেষ্টা করছে মাদ্রাসাটি। এর জের ধরে পরিবারের দুই নারীসহ তিনজনের ওপর করা হয়েছে হামলা। এখনও প্রতিনিয়ত হুমকি দেওয়া হচ্ছে পরিবারটিকে।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাজশাহী মহানগরীর একটি সম্মেলন কেন্দ্রে সংবাদ সম্মেলন করে এ অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী সাজ্জাদ হোসেন রাসেল (৩২)। তার বাবার নাম আবু বাক্কার সিদ্দিক। তানোর উপজেলার পাঁচন্দর উত্তরপাড়া গ্রামে তাদের বাড়ি। সংবাদ সম্মেলনে রাসেল তার পরিবারের সদস্যদের জীবনের নিরাপত্তা চান। পাশাপাশি নিজেদের জমি রড়্গায় প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে রাসেল বলেন, তার বাবা আবু বাক্কার সিদ্দিক ১৯৮৯ সালে পাঁচন্দর গ্রামে ২০ শতক জমি সরকারের কাছ থেকে চিরস’ায়ী বন্দোবসত্ম নেন। জমিটিতে আগে তাদের মাটির দোতলা বাড়ি ছিল। পরবর্তীতে তারা অন্য জায়গায় বাড়ি করেন। কয়েক বছর পর ওই জমির পাশে গড়ে ওঠে একটি মাদ্রাসা। এর নাম ‘পাঁচন্দর মহিলা দাখিল মাদ্রাসা’। এই মাদ্রাসাটিই এখন তাদের জমিটি দখলের পাঁয়তারা করছে।
রাসেল বলেন, মাদ্রাসা কর্তৃপড়্গ প্রথমে আমার বাবার কাছে রাসত্মা করার জন্য কিছু জমি চেয়েছিল। আমার বাবা সে জমি স্ট্যাম্পে লিখেও দেন। কথা ছিল, এর বেশি পরিমাণ জমি দাবি করবে না মাদ্রাসা। কিন’ এর কিছু দিন পরই মাদ্রাসা কর্তৃপড়্গ জোর করে জমি দখল করে ঈদগাহ হিসেবে ঘোষণা দেয়। জমি নিজেদের দাবি করে তারা মামলাও করেছিল। কিন’ আদালতে মামলার রায় হয়েছে আমাদের পড়্গে। তারপরেও তারা জমি দখলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে গ্রামের কিছু লোকের সঙ্গে আমাদের বিরোধ চলে আসছিল। এর জের ধরে গত ১৭ আগস্ট আমার ওপর হামলা করা হয়।
রাসেল জানান, সেদিন রাসেল তাদের ওই জমিতে গেলে পাঁচন্দর উত্তরপাড়া গ্রামের মো. নয়ন (২৬), মো. রবি (৩২), মো. আকতার (৩৫), মো. এনামুল (৩২), মো. আয়নাল (৩৫), মো. হারম্নন (৪৫), মো. নাসির (৩৫), মো. সোহেল (২৫), মো. আশরাফ (৩২), মো. মোবারক (২৫), মো. জাকারিয়া (২৩), মো. রাকিব (২৫), নজরম্নল ইসলাম (৩০), মো. মাসুদ (৩২), মো. খাদেম (২০), আবদুস সালাম (৪৮) ও হাফিজুর রহমান (২০) তাকে ঘিরে ধরেন। এরপর লাঠি, লোহার রড, হাসুয়া, চাপাতি, চাকু নিয়ে তার ওপর হামলা চালান। এতে রাসেল রক্তাক্ত জখম হন। ভেঙে যায় ডান হাত। তখন রাসেলের স্ত্রী রম্নমা খাতুন (২৮) তাকে বাঁচাতে এগিয়ে যান।
এ সময় তার ওপরেও হামলা চালানো হয়। এতে রম্নমাও রক্তাক্ত জখম হন। ঘটনা দেখে ঈদ উপলড়্গে তাদের বাড়িতে বেড়াতে আসা বোন শারমিন আক্তার (২৩) এগিয়ে গেলে তাকেও মারধর করা হয়। ওই সময় শারমিনের কাপড় ও চুল ধরে টানটানি করে তার শস্নীলতাহানি ঘটানো হয়। এছাড়া তার গলায় থাকা সোনার চেইন ও হাতের সোনার বালা খুলে নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন রাসেল।
রাসেল জানান, হামলার পর স’ানীয় লোকজন এগিয়ে গিয়ে তাদের রড়্গা করেন। এরপর তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার স্ত্রীর হাতে ১২টি সেলাই লাগে। চিকিৎসার পর তারা সুস’্য হলে গত ২৪ আগস্ট রাসেল তানোর থানায় মামলা দায়ের করেন। কিন’ কোনো আসামিকেই গ্রেপ্তার করেনি পুলিশ। তাই এখন মামলা তুলে নেয়ার জন্য আসামিরা প্রতিনিয়ত হত্যার হুমকি দিচ্ছেন। বলছেন, মামলা তুলে না নিলে এবং জমিটি ছেড়ে না দিলে তাদের দুনিয়াছাড়া করা হবে। এ নিয়ে তারা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
রাসেল বলেন, মাদ্রাসাটির প্রতিষ্ঠাতা জামিলুর রহমান নামে এক ব্যক্তি। মাদ্রাসার বর্তমান সুপার নাসির উদ্দিন তার চাচাতো ভাই। জামিলুর রহমান দীর্ঘ দিন উপজেলা জামায়াতের আমীর ছিলেন। তিনিই কিছু জমি কিনে মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তীতে জামিলুর রহমান জঙ্গি সংগঠন শাহাদাত-ই আল হিকমার নামে মাদ্রাসাটির জমি দলিল করে দেন। তার আশঙ্কা এখনও এই মাদ্রাসাকে ঘিরে জঙ্গি তৎপরতা রয়েছে।
তিনি বলেন, মাদ্রাসার কার্যক্রম গ্রামবাসীর কাছে খুবই রহস্যময়। মাদ্রাসা কর্তৃপড়্গ আমাদের জমির যে অংশ জোর করে দখল করে ঈদগাহ ঘোষণা করেছে সেখানে গ্রামের কেউ নামাজ পড়েন না। বাইরে থেকে অপরিচিত লোকজন এনে ঈদের নামাজ আদায় করে মাদ্রাসা কর্তৃপড়্গ। আর মাদ্রাসায় পাঠদান না হলেও আনাগোনা রয়েছে বাইরের অচেনা লোকের। আমাদের আশঙ্কা, তারা নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন ‘শাহাদাত-ই আল হিকমা’র সদস্য। আর তাই প্রাণনাশের হুমকিতে চরম আতঙ্কে আছি।
ভাঙা হাত নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসে রাসেল লিখিত বক্তব্য পড়তে গিয়ে বার বার কেঁদে ফেলেন। এ সময় তার সঙ্গে স্ত্রী রম্নমা খাতুন, বোন শারমিন আক্তার ও সোনিয়া আক্তার উপসি’ত ছিলেন। জঙ্গি সংগঠন হিকমার সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও জমি দখলের অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে পাঁচন্দর মহিলা দাখিল মাদ্রাসার সুপার নাসির উদ্দিনকে ফোন করা হয়। তবে তিনি এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে চাননি।
প্রসঙ্গত, কাওসার হুসাইন সিদ্দিকী নামে এক ব্যক্তি জঙ্গি সংগঠন শাহাদাত-ই আল হিকমা প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৪ সালের ৬ নভেম্বর রাজশাহী নগরীতে সরকারের বিরম্নদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে সংবাদ সম্মেলন করতে গিয়ে তিনি পুলিশের হাতে বেশ কয়েকজন সহযোগীসহ ধরা পড়েন। এ নিয়ে সারা দেশে তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়। সরকার ওই সময় জঙ্গি সংগঠন আখ্যায়িত করে শাহাদাত-ই আল হিকমা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে তানোরের এই মাদ্রাসাকে ঘিরে এখনও তাদের তৎপরতার আশঙ্কা রয়েছে গ্রামবাসীর।
জানতে চাইলে তানোর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খাইরম্নল ইসলাম বলেন, মাদ্রাসার জঙ্গি সংশিস্নষ্টতার বিষয়ে তার কিছু জানা নেই। তিনি বিষয়টি তদনত্ম করে দেখবেন। জমি দখলের বিষয়ে ওসি বলেন, পাঁচন্দর গ্রামে ঈদগাহ করা নিয়ে গ্রামের কিছু লোকের সঙ্গে একটা পরিবারের ঝামেলা চলছে। এ নিয়ে থানায় মামলা হয়েছে। তবে মামলার একজন আসামিকেও গ্রেপ্তার করা যায়নি। গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে দাবি করেন ওসি।