স্টাফ রিপোর্টার: মাত্র ১০ মাসের অভিজ্ঞতায় সহকারী শিড়্গক থেকে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার কাশিমপুর একে ফজলুল হক উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিড়্গক হয়েছিলেন গোলাম কবির আখতার জাহান। সর্বশেষ গত ২৫ মে বিদ্যালয়টির প্রধান শিড়্গকের পদে এসেছেন তিনি।
যদিও প্রধান শিক্ষক নিয়োগে উচ্চ আদালতে রিট করেন বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিড়্গক আবু বকর সিদ্দিক। রিট নিস্পতি হবার আগেই গোলাম কবির গোপনে প্রধান শিক্ষকের পদ বাগিয়ে নেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
গোলাম কবির আখতার জাহান উপজেলার কাশিমপুর গ্রামের-এলাকার মৃত শাহজাহানের ছেলে। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি জামায়াত-শিবিরের রাজনীতিতে যুক্ত। তৎকালীন সরকারী বিরোধী আন্দোলনেও অংশ নেন এই জামায়াত নেতা। গোদাগাড়ীতে জামায়াতের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অর্থের যোগানদাতাও তিনি।
এরই প্রেক্ষিতে তার বিরম্নদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হয়। পরে এখনকার বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শরিফুল আলমের হাত ধরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন প্রধান শিড়্গক। এরপরই ওই মামলা থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি।
অভিযোগ উঠেছে, প্রায় ১৮ বছর ধরে শিড়্গকতার নানান পর্যায়ে জালিয়াতি করে প্রধান শিড়্গক পদে এসেছেন গোলাম কবির। এই দীর্ঘসময় জড়িয়েছেন নানান অনিয়মে। নিজের অনিয়ম ঢাকতে অনিয়মের সুযোগ করে দিয়েছেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিকেও।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০১ সালের ১১ এপ্রিল সহকারী শিড়্গক হিসেবে নিয়োগ পান গোলাম কবির আখতার জাহান। এর দশ মাসের মাথায় ২০০২ সালের ১০ এপ্রিল একই বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিড়্গক হিসেবে নিয়োগ নেন।
বিধি অনুযায়ী, সহকারী শিড়্গক হিসেবে নিয়োগের দুই বছর শিড়্গানবীশকাল। সহকারী প্রধান শিড়্গক হিসেবে নিয়োগ পেতে সহকারী শিড়্গক হিসেবে ১২ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হয়।
কিন’ শিড়্গানবীশকাল পূরণ হবার আগেই সহকারী প্রধান শিড়্গক হয়ে যান গোলাম কবির। এর পরের ১১ বছর ছয় মাস অভিজ্ঞতা দেখিয়ে গত ২৫ মে প্রধান শিড়্গক হন তিনি। তার সবক’টি নিয়োগই বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিকে ম্যানেজ করে।
অভিযোগ রয়েছে, সহকারী প্রধান শিড়্গক ও প্রধান শিড়্গক পদে গোলাম কবিরের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গোপনে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং গোপন স’ানে কথিত নিয়োগ পরীড়্গা হয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ে গোলাম কবিরের আবেদন বৈধ হবার প্রমাণ নেই। তার পরও তাকেই বৈধ এবং মনোনীতি প্রার্থী হিসেবে চুড়ানত্ম করে নিয়োগ কমিটি।
ওই সময়কার রেজুলেশনের কপি এসেছে প্রতিবেদকের হাতে। তাতে দেখা গেছে, সহকারী প্রধান শিড়্গক পদের সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্ত প্রার্থী হিসেবে দেখানো হয়েছে গোলাম কবির আখতার জাহানকে। কিন’ তিনি কত নম্বর পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন সেটি উলেস্নখ নেই। উলেস্নখ নেই ওই পরীড়্গায় ঠিক কতজন প্রার্থী অংশ নিয়েছিলেন। নিয়োগ পরীড়্গা কোথায় অনুষ্ঠিত হয়েছে সেই স’ানও উলেস্নখ নেই রেজুলেশনে।
তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মোজাহারম্নল ইসলাম ওরফে ঝালুর সভাপতিত্বে ৫ জনের নিয়োগ কমিটি এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। কমিটিতে ডিজির প্রতিনিধি ছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের হরিমোহন সরকারী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিড়্গক মঞ্জুর আহমেদ। তিনি গোলাম কবির আখতার জাহানের নিকটাত্মীয় বলে জানা গেছে।
তৎকালীন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য একেএম কামরম্নজ্জামানও ছিলেন নিয়োগ কমিটিতে। তিনি বাদে কমিটির বাকি সদস্যরা মৃত্যুবরণ করেছেন। গোলাম কবিরের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে একেএম কামরম্নজ্জামান বলেন, তাকে না জানিয়েই নিয়োগ হয়েছে। কমিটির এমন অনেক সদস্যই ছিলেন, যারা এই নিয়োগ বিষয়ে জানতেন না। কেবল সভাপতির সম্মান রড়্গায় রেজুলেশনে সই দিয়েছেন মাত্র।
তার অভিযোগ, এই নিয়োগ ছাড়াও একই সাথে আরো কয়েকটি নিয়োগ হয়েছে। সেখানেও অনিয়ম হয়েছে। এছাড়াও বিদ্যালয়ে নানান অনিয়ম হয়েছে। এসবের প্রতিবাদ জানিয়ে মেয়াদের মাত্র দুই মাস পর ছেড়ে চলে আসেন তিনি।
বিদ্যালয়ে নানান অনিয়মের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিদ্যালয়ের একাধিক শিড়্গক। নাম প্রকাশ না করে এক সহকারী শিক্ষক বলেন, সহকারী প্রধান শিড়্গক হবার পর থেকেই অনিয়মে জড়ান তিনি। শিড়্গকদের ভাষ্য, পুরাতন বই-খাতা বিক্রি, বিদ্যালয়ের নামের জমি ইজারা, দোকানভাড়া, ছোটখাটো নির্মাণ ও সংস্কারে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম করে আসছেন প্রধান শিড়্গক।
পরিচালনা কমিটির সভাপতি শরিফুল আলম ও সদস্য আহাদ আলী যোগসাজসে এই অনিয়ম করে যাচ্ছেন। তার অনিয়মের প্রতিবাদ করলেই হুমকির মুখে পড়ছেন শিড়্গক-কর্মচারীরা।
জানতে চাইলে নিজের সবক’টি নিয়োগই বৈধ বলে দাবি করেন প্রধান শিড়্গক গোলাম কবির আখতার জাহান। তার দাবি, তৎকালীন পরিচালনা কমিটি তাকে নিয়োগ দিয়েছে। বিধি মেনেই সম্পন্ন হয়েছে নিয়োগ প্রক্রিয়া। এ সময় তিনি কোন অনিয়মে জড়িত নন বলেও দাবি করেন।
তার সহকারী প্রধান শিড়্গক পদে নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি জানা নেই বলে দাবি করেন বর্তমান সভাপতি শরিফুল আলম। তার দাবি, প্রধান শিড়্গক নিয়োগ সচ্ছতার সাথে হয়েছে। উচ্চ আদালতের রিটের পরও নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আদালতে নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা দেননি। নিয়োগে আইনত কোন বাধা নেই।
প্রধান শিড়্গক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন তৎকালীন উপজেলা শিড়্গা কর্মকর্তা শামশুল হক। এখন তিনি নওগাঁর সাপাহার উপজেলায় কর্মরত। তার দাবি, সহকারী প্রধান শিড়্গক হিসেবে অভিজ্ঞতার আলোকে ওই শিড়্গককে প্রধান শিড়্গক পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তবে তার সহকারী প্রধান শিড়্গক পদে নিয়োগে জালিয়াতি হয়েছে সেটি তিনি জানতেন না। এনিয়ে নিজের দায় স্বীকার করেন এই শিড়্গা কর্মকর্তা।
জানতে চাইলে জেলা শিড়্গা কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন বলেন, তার ফাইলটা আমরাও দেখেছি, সেখানে কিছু ঘাটতি লড়্গ্য করা গেছে। আমরাও তার সহকারী প্রধান শিড়্গক হিসেবে অভিজ্ঞতা হিসেবে নিয়েছি। কিন’ তৎকালীন পরিপত্র অনুযায়ী তার সহকারী প্রধান শিড়্গকের নিয়োগ অবৈধ। তারপরও তিনি বেতন পাচ্ছেন। এনিয়ে যাবতীয় দায়-দায়িত্ব মাধ্যমিক ও উচ্চ শিড়্গা অধিদপ্তরের।
এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিড়্গা অধিদপ্তরের রাজশাহী অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক ড. শরমিন ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, নিয়োগ নির্ভর করে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও নিয়োগ কমিটির উপর। পরে বিদ্যালয়ের প্রধান শিড়্গক এমপিওর জন্য কাজগপত্র দাখিল করেন। এ সংক্রানত্ম যাবতীয় দায়-দায়িত্ব তাদেরই।
তিনি বলেন, পরিপত্র অনুযায়ী ওই শিড়্গক সহকারী প্রধান শিড়্গক হিসেবেই নিয়োগের অযোগ্য। তার সহকারী প্রধান শিড়্গক হিসেবে পরের অভিজ্ঞতা আমলে নেয়ার সুযোগ নেই। এমপিও স’গিতসহ তার বিরম্নদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস’া নেয়ার কথা জানান তিনি।