রিমন রহমান: রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রায় একা হয়ে পড়েছেন সভাপতি ওমর ফারম্নক চৌধুরী। নিজে সংসদ সদস্য হলেও তার পাশে নেই রাজশাহীর অন্য সংসদ সদস্যরাও। শুধু নিজের নির্বাচনি এলাকা রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের কিছু নেতাকর্মী নিয়ে তিনি পথ চলছেন।
এই দুই উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিরাও তার সঙ্গে নেই। তারা নিজ নিজ উপজেলায় গড়ে তুলেছেন এমপি ফারম্নক চৌধুরী বিরোধী আলাদা বলয়। আর নির্বাচনি এলাকায় দুই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককে নিয়ে পথ চলছেন এমপি ওমর ফারম্নক চৌধুরী।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ২৬ নভেম্বর ওমর ফারম্নক চৌধুরীকে সভাপতি ও আসাদুজ্জামান আসাদকে সাধারণ সম্পাদক করে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি অনুমোদন দেয়া হয়। তারপর ওমর ফারম্নক চৌধুরীকে নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে তৈরি হয়েছে নানা বিতর্ক। তার অতীত রাজনৈতিক জীবনের সূত্র ধরে বিএনপি-জামায়াতকে আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগের পাশাপাশি, দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলায় মদদ দেয়ার অভিযোগও ঢাকার একাধিক দৈনিক সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। সরকারের একটি সংস্থার অনুসন্ধানে মাদক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা হিসেবেও সাবেক এই শিল্প প্রতিমন্ত্রীর নাম এসেছে গণমাধ্যমে।
এখন নতুন বিতর্কে জড়িয়েছে ওমর ফারম্নক চৌধুরীর নাম। এবার আলোচনার কেন্দ্রে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনিদের তৈরি দল ফ্রিডম পার্টিতে তার ভূমিকা। সমপ্রতি ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকায় এ সংক্রানত্ম এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সারাদেশে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সক্রিয় ফ্রিডম পার্টির নেতাকর্মীদের মধ্যে ওমর ফারম্নক চৌধুরীর নামটিও এসেছে। প্রতিবেদনে সেই সময়ের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশাকে উদ্ধৃত করে জানানো হয়, ফারম্নক চৌধুরী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ফ্রিডম পার্টির একটি মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। রাকসুর সাবেক এই ভিপির এমন বিস্ফোরক তথ্যের পর এ নিয়ে শুরম্ন হয় জোর আলোচনা।
এই ঘটনার পর ঢাকা থেকে প্রকাশিত ওই পত্রিকাটির বিরম্নদ্ধে গতকাল সোমবার সমাবেশ করেন ফারম্নক চৌধুরীর অনুসারিরা। গোদাগাড়ী উপজেলা সদরে এর আয়োজন করা হয়। তবে এই সমাবেশে জেলা আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক এজাজুল হক মানু ছাড়া অন্য কেউ যাননি। ফারম্নক চৌধুরী এমপি হলেও রাজশাহীর অন্য কোনো এমপিও সেই সমাবেশে যোগ দেননি। সূত্র বলছে, ফারম্নক চৌধুরীর পাশে রাজশাহীর এমপিদের কেউই নেই।
দলের নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, সভাপতি হলেও ওমর ফারম্নক চৌধুরী জেলা আওয়ামী লীগের কোনো অনুষ্ঠানে যান না। নেতাকর্মীদের নিয়ে সব কর্মসূচি পালন করেন সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ। আর আসাদকে যারা পছন্দ করেন তারা কেউই ওমর ফারম্নক চৌধুরীকে পছন্দ করেন না।
রাজশাহীতে মোট সংসদীয় আসন ছয়টি। এর মধ্যে ফ্রীডম পার্টিতে সংশিস্নষ্টতার কথা ফাঁস করায় রাজশাহী-২ আসনের এমপি ফজলে হোসেন বাদশার সঙ্গে এখন ওমর ফারম্নক চৌধুরীর সম্পর্ক ভালো নয়। আর রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনের এমপি ডা. মনসুর রহমান ও রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের এমপি এনামুল হক জেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক আসাদুজ্জামানের আসাদের খুবই ঘনিষ্ঠ।
অন্যদিকে, রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের এমপি ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমও এখন আসাদের ঘনিষ্ঠ। গত শনিবার একটি অনুষ্ঠানে তাদের একমঞ্চে দেখা গেছে। অথচ এই অনুষ্ঠানে ছিলেন না সভাপতি ফারম্নক চৌধুরী। বাকি এক আসন রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর)। এই আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন আসাদুজ্জামান আসাদ। এ নিয়ে এ আসনের এমপি আয়েন উদ্দিনের সঙ্গে তার কিছুটা দূরত্ব হয়েছিল। তখন আয়েন উদ্দিন ফারম্নকের পড়্গে থাকলেও এখন আর নেই।
এদিকে, এমপি ফারম্নক চৌধুরী সম্প্রতি একটি পত্রিকায় আসাদুজ্জামান আসাদ এবং ফজলে হোসেন বাদশা ছাড়াও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী সরকারকে জড়িয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। অথচ মোহাম্মদ আলী সরকার কোনো দ্বন্দ্বের ভেতর থাকেন না। শুধু বাদশা এবং আসাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকার কারণে তাকে জড়িয়ে বক্তব্য দিয়েছেন এমপি ওমর ফারম্নক চৌধুরী।
আওয়ামী লীগের আরেক প্রভাবশালী নেতা রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রম্নজ্জামান লিটনও এমপি ওমর ফারম্নক চৌধুরীকে ‘প্রশ্রয়’ দিচ্ছেন না বলে গুঞ্জন উঠেছে। অথচ খায়রম্নজ্জামান লিটন এমপি ফারম্নক চৌধুরীর ফুফাতো ভাই। কিন্তু কয়েকদিন আগে জেলা ওলামা লীগের একটি অনুষ্ঠানে খায়রম্নজ্জামান লিটন ও আসাদুজ্জামান আসাদকে এক মঞ্চে দেখা গেছে। এদিকে লিটনের মালিকানাধীন একটি পত্রিকায় সম্প্রতি আসাদের একটি সাড়্গাতকার ছাপা হয়। ওই সাড়্গাতকারে আসাদ বলেন, ফারম্নক চৌধুরী জামায়াত পরিবারের সনত্মান। এমনকি ছাত্রদল করে ফারম্নক চৌধুরী আওয়ামী লীগে ঢুকেছেন বলেও মনত্মব্য করেন আসাদ। এই সাড়্গাতকার প্রকাশের পর গুঞ্জন ডালপালা মেলেছে যে, ফুফাতো ভাই লিটনের সঙ্গেও ফারম্নক চৌধুরীর সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না।
দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি ৭১ সদস্য বিশিষ্ট। এর মধ্যে পাঁচজন মারা গেছেন। বাকি ৬৬ জনের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন নেতা সভাপতি ফারম্নক চৌধুরীর পড়্গে আছেন। এরা হলেন- সহ-সভাপতি একরামুল হক, যুগ্ম সম্পাদক লায়েব উদ্দিন লাভলু, কামরম্নজ্জামান চঞ্চল, মোসত্মাফিজুর রহমান মানজাল, আইন বিষয়ক সম্পাদক এজাজুল হক মানু, সদস্য আব্দুলস্নাহ আল মামুন, আবদুল মজিদ মাস্টার ও অয়েজ উদ্দিন বিশ্বাস।
এদের মধ্যে আব্দুলস্নাহ আল মামুন ফারম্নকের নির্বাচনি এলাকা তানোর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। বিএনপি থেকে ফারম্নক চৌধুরীর হাত ধরে আওয়ামী লীগে আসা আবদুল মজিদ মাস্টার গোদাগাড়ীর কাঁকনহাট পৌরসভার মেয়র। আর অয়েজ উদ্দিন বিশ্বাস গোদাগাড়ী পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি।
এরা ওমর ফারম্নক চৌধুরীর পাশে থাকলেও দুই উপজেলা আওয়ামী লীগেরই সভাপতি নেই তার সঙ্গে। সম্প্রতি গোদাগাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. বদিউজ্জামানকে সরিয়ে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়েছে আরেকজনকে। আর তানোর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মু-ুমালা পৌরসভার মেয়র গোলাম রাব্বানী এমপিকে বাদ দিয়েই নিজের মতো করে রাজনীতি করে আসছেন এলাকায়।
দলীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, তানোরে এখন ফারম্নক চৌধুরীর ভরসা আব্দুলস্নাহ আল মামুন ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান লুৎফর হায়দার রশিদ ময়না। আর গোদাগাড়ীর ভরসা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রশিদ। এই তিন নেতাকে নিয়েই দুই উপজেলা সামলানোর চেষ্টা করছেন এমপি ওমর ফারম্নক চৌধুরী। আর তার পড়্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সক্রিয় আছে ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের কিছু নেতাকর্মী। এর বাইরে তেমন কউই নেই।
জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবদুল মজিদ সরদার বলেন, সভাপতি ওমর ফারম্নক চৌধুরীর ‘একলা চলো’ নীতির কারণে দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি কয়েকজন নেতাকে ব্যবহার করে দলে বিভেদ সৃষ্টি করছেন। আরেক সহ-সভাপতি মকবুল হোসেন বলেন, আমরা সভাপতিকে নিয়ে একসঙ্গেই চলার চেষ্টা করেছি। কিন্তু উনি তা চাননি। এতে দলের ড়্গতি হয়েছে।
জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, কমিটি গঠনের পর আমরা দুই বছর ঠিকমতোই চালিয়েছি। কিন্তু পরবর্তীতে ওমর ফারম্নক চৌধুরী স্বেচ্ছাচারিতা শুরম্ন করলেন। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতেও আসেন না। ফলে নেতাকর্মীরা তার কাছ থেকে দূরে সরে গেলেন।
এদিকে একটি পত্রিকায় দেয়া সাড়্গাতকারে আসাদ বলেছেন, তখন আমি ছোট ছিলাম। কিন্তু সেই সময়কার মুক্তিযোদ্ধারা তো বলেন তার (ফারম্নক চৌধুরী) বাবা ছিলেন রাজাকার। আর তার মা যে এখনো জামায়াত করেন, তা তো পরীক্ষিত সত্য। আসাদ আরও বলেন, ফারম্নক চৌধুরী জামায়াত পরিবারের সনত্মান। আর নিজেও ছাত্রদল করে উঠে এসেছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদল থেকে ক্রীড়া সম্পাদকের পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। শুধু তাই না, ১৯৯১ সালে সংসদ নির্বাচনে ব্যারিস্টার আমিনুল হকের পক্ষে ভোট করেছেন। তার বেয়াই মিলস্নাত হাওয়া ভবনের লোক। আসাদ অভিযোগ করেন, সংসদ সদস্য হওয়ার পর থেকে ওমর ফারম্নক চৌধুরী এলাকায় যতজনকে চাকরি দিয়েছেন তিনি, তার ৭০ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের।
এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে গতকাল সোমবার দুপুরে এমপি ওমর ফারম্নক চৌধুরীকে মুঠোফোনে ফোন করা হয়। সাংবাদিক পরিচয় দিলে তিনি কথা বলবেন না বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। যদিও এর আগে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমকে ওমর ফারম্নক চৌধুরী বলেছিলেন, আমার ফ্রিডম পার্টি বা ছাত্রদল করার তথ্য সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বাবা আজিজুল হক চৌধুরী ও চাচা মকবুল হক চৌধুরীকে তুলে বাবলা বনে নিয়ে হত্যা করে পাকিসত্মানী বাহিনী।