রিমন রহমান: রাজশাহী নগরীর আরডিএ মার্কেটের পেছনে ছোট একটি সড়ক। দৈর্ঘ্য ৫০০ মিটারের বেশি হবে না। এই সড়কের এক পাশে একটি ড্রেন নির্মাণ করেছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক)। আর এই ড্রেনটিই এখন হয়ে উঠেছে মশাদের আসত্মানা।
গতকাল রোববার বিকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ড্রেনটি নির্মাণ করা হলেও এর কোনো নির্গমন পথ নেই। কিন’ ড্রেনের ময়লা পরিষ্কারের মুখ দিয়ে বৃষ্টির পানি ঢুকছে ঠিকই। কিন’ ওই পানি বের হওয়ার কোনো পথ নেই। ফলে স্রোতহীন ওই নোংরা পানিতে বংশ বিসত্মার করছে মশা।
আশপাশের দোকানিরা জানালেন, ড্রেনের বেশ কয়েকটি মুখে ঢাকনা লাগানো হয়নি। তারা চলাচলের সুবিধার জন্য নিজেদের উদ্যোগে কাঠ দিয়ে ঢেকেছেন। কিন’ সেখান দিয়ে বৃষ্টির পানি ঠিকই প্রবেশ করে। বৃষ্টি বেশি হলে ড্রেন ভর্তি হয়ে রাসত্মায় পানি জমে থাকে। বৃষ্টি থামলে ধীরে ধীরে পানিও কমে। কিন’ ড্রেনের ভেতরের পানি আর শুকোয় না। ফলে এর ভেতরেই অবাধে বংশ বিসত্মার করছে মশা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ড্রেনের নির্গমন পথ না থাকায় ওই এলাকার পানি সহজে বের হয় না। সারাড়্গণ কাদা জমে থাকে। গতকালও রাসত্মায় কাদা-পানি দেখা গেছে। আর ওই পানিতে দেখা গেছে ঝাঁকে ঝাঁকে মশা। রাসত্মার পাশে থাকা ড্রেনের একটি মুখের কাঠ সরিয়ে দেখা যায়, ভেতরে পানি। সেখানেও প্রচুর মশা।
রাসত্মাটির পাশেই অবসি’ত একটি দোকানের মালিক বলেন, এই ড্রেন থেকে মশা উড়ে আসে দোকানের ভেতর। এ জন্য দিনেও কয়েল জ্বালাতে হয়। আর সিটি করপোরেশন কাজ শেষ না করার কারণে একদিকে যেমন বৃষ্টির পর কাদার জন্য এলাকাটি দিয়ে যেমন চলাচল করা যায় না তেমনি বদ্ধ ড্রেনের ভেতর বংশ বিসত্মার করছে মশা। কিন’ এই এলাকাটিতে একদিনের জন্যও মশক নিধন কার্যক্রম দেখলাম না।
রাজশাহী মহানগরীর প্রাণকেন্দ্রের এই এলাকাটি সিটি করপোরেশনের ১২ নম্বর ওয়ার্ড। এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রাসিকের প্যানেল মেয়র-১ সরিফুল ইসলাম বাবু। ড্রেনটির কাজ শেষ না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ড্রেন নির্মাণ করছে ‘মীর আক্তার’ নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। এটা একটা বড় প্রতিষ্ঠান। তারা বড় বড় কাজ করে থাকে। ড্রেনটি নির্মাণের মতো ছোট কাজ করার সময় তারা পাচ্ছে না। তবে খুব দ্রম্নতই কাজটি শেষ হয়ে যাবে বলে আশা করছি। ড্রেনটির ভেতরে মশার বংশ বিসত্মার এবং মশক নিধন কার্যক্রম না থাকার নিয়ে স’ানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঠিকই আছে। আমরা চেষ্টা করছি সব মশা মারার জন্য। এটা হবে।
অন্যদিকে ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুর বাহক এডিস মশা নিয়ে এখনও আতঙ্কে রয়েছেন নগরবাসী। সম্প্রতি রাজশাহী মহানগরীর ১৪টি স’ানে এডিস মশার অসিত্মত্ব পাওয়া গেছে। জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভার বংশ বিসত্মার হচ্ছে কি না তা জানতে আবারও নমুনা সংগ্রহ করছেন রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস’্য পরিচালকের দপ্তরের কর্মকর্তারা। বিভাগীয় স্বাস’্য পরিচালক ডা. গোপেন্দ্রনাথ আচার্য বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গতকাল নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে গিয়ে এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননের স’ানগুলো থেকে স্যাম্পলিং সংগ্রহের কাজ শুরম্ন হচ্ছে। এরপর সেগুলো হ্যাচারিতে এনে পরীক্ষা করে দেখা হবে নতুন করে এডিস জন্ম নিচ্ছে কি না।
এর আগে গত ২ থেকে ৬ আগস্ট পর্যনত্ম রাজশাহী নগরীতে এডিস মশার উপসি’তি নিয়ে মাঠে স্যাম্পলিং সংগ্রহ করেন স্বাস’্য বিভাগের কর্মকর্তারা। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের আশপাশসহ নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডেও ১০০টি স্পট থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন তারা। এ সময় তারা ১৪টি স্পটে এডিস মশার লার্ভার ব্যাপক উপসি’তি দেখতে পান।
এদিকে, রাজশাহীতে ডেঙ্গু রোগী কমলেও আক্রানেত্মর আশঙ্কা এখনো কমেনি। আসছে সেপ্টেম্বর মাস পর্যনত্ম এডিস মশার প্রজননের সময়। তাই সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বিশেষ করে নগরীর নির্মাণাধীন ভবনগুলো পর্যবেক্ষণে রাখার তাগিদ দিয়েছে স্বাস’্য বিভাগ। গত ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৪ জন ডেঙ্গুরোগী ভর্তি হয়েছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হতাসপাতালে। তার আগের দিন শনিবার ১১ জন, শুক্রবার ১০ জন এবং বৃহস্পতিবার ৮ জন ভর্তি হয়েছিলেন।
রামেক হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৭ জুলাই থেকে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর ভর্তি শুরম্ন হয়। এর মধ্যে রোববার পর্যনত্ম মোট ৫২৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চিকিৎসা শেষে সুস’ হয়ে বাড়ি গেছেন মোট ৫১৫ জন ডেঙ্গু রোগী। এর মধ্যে মাত্র চার জন রাজশাহীতে আক্রানত্ম হয়ে ভর্তি হয়েছেন। আর অন্যরা ঢাকাসহ বিভিন্ন স’ানে গিয়ে আক্রানত্ম হয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে মাত্র ১৮ জন ডেঙ্গুরোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। অথচ এক সপ্তাহ আগেও হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।
রামেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক সাইফুল ফেরদৌস বলেন, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা প্রতিদিনই কমছে। যে পরিমাণ রোগী ভর্তি হচ্ছেন তার চেয়েও বেশি রোগী চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরছেন। আর আক্রানত্মদের বেশিরভাগই রাজধানী ঢাকা বা বিভিন্ন স’ানে গিয়ে আক্রানত্ম হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন।
তবে গত ১২ আগস্ট একজন রোগী ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস’ায় মারা গেছেন। আব্দুল মালেক নামে ওই ব্যক্তি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বহরম হাউসনগর মহলস্নার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি ঢাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। সেখানে গিয়ে ডেঙ্গু রোগে আক্রানত্ম হয়েছিলেন। দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় পার করে তিনি হাসপাতালে আসেন। আশঙ্কাজনক অবস’ায় হাসপাতালে আনা হলে তার মৃত্যু হয়।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস’্য পরিচালক ডা. গোপেন্দ্রনাথ আচার্য বলছেন, এডিস মশার প্রজননের সময়কাল এখনো বাকি। তাই এখনো বিশেষ নজরদারি রাখতে হবে। নগরীর নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে সাধারণ মানুষকে প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। লোকজনের চলাচলও কম থাকে। তাই পানি জমে এসব ভবনে এডিস মশা জন্ম নেয়ার আশঙ্কা বেশি। এ জন্য সিটি কর্পোরেশনকে এসব ভবন এডিসমুক্ত করতে বলা হয়েছে।