সোনালী ডেস্ক: এ বছর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। এ পর্যনত্ম সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রানেত্মর সংখ্যা ৬১ হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে গত চব্বিশ ঘণ্টায় নতুন করে আরও প্রায় দেড় হাজার আক্রানত্ম হয়েছে। কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না ডেঙ্গু। ঢাকাকেন্দ্রিক রোগটি এখন গ্রামেও সমান আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রাজশাহী মহানগরীর বাসিন্দারাও।
মূলত ডেঙ্গু জীবাণুবাহী এডিস মশার কামড়ে একজন ব্যক্তি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রানত্ম হন। আক্রানত্ম ব্যক্তিকে কোনো জীবাণুবিহীন এডিস মশা কামড়ালে সেই মশাটিও ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। এই মশার জন্ম পরিষ্কার পানিতে তাই বাড়ির আশপাশে যেকোনো ধরনের জমে থাকা পানি ডেঙ্গু রোগ ছড়ানোর জন্য বিপদজনক। বিশেষ করে, এপ্রিল থেকে অক্টোবর মাসে এদের বংশ বৃদ্ধি পায়।
সারা বাংলাদেশ যখন ডেঙ্গুর প্রকোপে ভুগছে, তখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতা শহরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গত কয়েক বছর ধরেই কলাকাতা সিটি করপোরেশন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে। কলকাতা সিটি করপোরেশন বলছে, তারা সারা বছর ধরে নিবিড় নজরদারি চালায়- যাতে কোথাও পানি না জমে থাকে। এর জন্য কর্মীও যেমন রয়েছে, তেমনই এবার এ কাজে আকাশে ওড়ানো হবে ড্রোনও।
এছাড়া শহরের প্রতিটা হাসপাতাল, নার্সিং হোম বা পরীক্ষাগারে রোগীদের কী কী রক্ত পরীক্ষা হচ্ছে, কী ভাইরাস পাওয়া যাচ্ছে, তার প্রতিদিনের হিসাব রাখা হয়, যাতে ডেঙ্গু রোগীর খোঁজ পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়া যায়। তবে একটা সময় ছিল যখন বর্ষা শুরম্ন হলে কলকাতা করপোরেশন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে নামত। কিন্তু ততদিনে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ত শহরের নানা অঞ্চলে। কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে কলকাতা সিটি করপোরেশন সারা বছর ধরেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাজ শুরম্ন করেছে।
কলকাতার ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষ সম্প্রতি বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, তারা কয়েকটা সত্মরে বছরভর নজরদারি চালান। প্রথমত, ১৪৪টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতেই ২০ থেকে ২৫ জন করে কর্মী আছেন, যাদের মধ্যে একদল প্রচারের কাজ চালায়, আর অন্যদল পানি জমছে কিনা কোথাও, সেটার ওপরে নজর রাখে। এর ওপরে র‌্যাপিড অ্যাকশন টিম। তাতে ৮ থেকে ১০ জন লোক থাকে সব ধরনের সরঞ্জাম নিয়ে, গাড়িও থাকে তাদের কাছে। কোনো জায়গায় ডেঙ্গুর খবর পাওয়া গেলে অতি দ্রম্নত তারা সেখানে পৌঁছে এডিস মশার লার্ভা নিয়ন্ত্রণের কাজ করে।
তিনি বলেন, নজরদারি চললেও এখনও অনেক বহুতল বা সরকারি ভবনের আনাচে-কানাচে জল জমে থাকতে দেখা যায় যেগুলো ডেঙ্গুর রোগবাহী মশা এডিস ইজিপ্টাই জন্মানোর আদর্শ জায়গা। তাই যেসব জায়গায় জল জমে থাকতে দেখছে কর্পোরেশনের কর্মীরা, সেই ভবনগুলোর ওপরে এক লাখ টাকা পর্যনত্ম জরিমানা ধার্য করার জন্য আইন পরিবর্তন করা হয়েছে। আবার জল পরিষ্কার করে দেয়ার খরচ বাবদ বিল, বাড়ির বার্ষিক করের বিলের সঙ্গে পাঠিয়ে দিচ্ছে করপোরেশন। নজরদারি আরও ভালো করে চালানোর জন্য এবার আকাশে ড্রোন ওয়ানোর পরিকল্পনা হচ্ছে, যা থেকে মশা মারার তেলও ছড়ানো যাবে। রোগ চিহ্নিতকরণ আর চিকিৎসার ব্যবস্থাও গড়ে উঠেছে করপোরেশনের ১৪৪টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে।
অতীন ঘোষ আরও বলেন, ভারতের বেশিরভাগ ল্যাবরেটরিই এখনও বেসরকারি। তাদের কাছ থেকে ঠিকমতো তথ্য কখনই পাওয়া যায় না। তাই বোঝা যাচ্ছিল না যে কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। আমরা এই সমস্যা কাটানোর জন্য ১৪৪টি ওয়ার্ডেই একজন করে কর্মী রেখেছি, যার একমাত্র কাজ হল ওই এলাকায় যত হাসপাতাল, নার্সিং হোম বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে, সেখানে একটা খাতা নিয়ে হাজির হবেন। কত রোগীর রক্ত পরীক্ষা হলো, কী কী পরীক্ষা হল, পরীক্ষার ফল কী, সেগুলো নোট করে আনবেন তারা। সঙ্গে সঙ্গেই সেই তথ্য অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে পৌঁছিয়ে যায় বরোভিত্তিক মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ টিমের কাছে।
বাংলাদেশের নানা জায়গায় যে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে, সেকথা সংবাদপত্রের মাধ্যমে জেনেছেন অতীন ঘোষ। তিনি বলেন, এটা আমাদের কাছে একটা চিনত্মার কারণ। বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ কলকাতায় আসেন। তাদের মধ্যে কেউ যদি ডেঙ্গুর ভাইরাস নিয়ে আসেন, তা থেকে এখানেও রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়। তাই বাংলাদেশ চাইলে আমরা যে কোনোভাবে সহায়তা করতে রাজি। ওখানকার কোনো পৌরসভা যদি আমাদের কাছে সাহায্য চায়, তাহলে আমরা গিয়ে হাতেকলমে দেখিয়ে দিয়ে আসতে পারি কীভাবে বছরভর আমরা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের কাজটা করি।
মশা নিয়ে গবেষণা করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কবিরম্নল বাশার। তার মতে, বাংলাদেশের শহরগুলোতে সিটি করপোরেশন মশার দিকে বিশেষ একটা নজর দেয় না। শুধু ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়তে শুরম্ন করলে কিছুটা কাজ হয়। কিন্তু ড়্গতিটা আসলে অনেক আগেই হয়ে যায়। মানুষের প্রাণহানি ঘটে। কবিরম্নল বাশার বলেন, সিটি করপোরেশনগুলোকে কলকাতার মতো তৎপর থাকতে হবে। তা না হলে বছর বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেবে।
অধ্যাপক কবিরম্নল বাশার বলেন, এবার ফেব্রম্নয়ারিতে বৃষ্টি হয়েছে। এডিস মশার ডিম ছয়মাস পর্যনত্ম শুকনো স্থানে থাকলে বেঁচে থাকতে পারে। এবার আগে বৃষ্টির কারণে ও এখন থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে এডিস মশার ঘনত্ব বাড়ছে। আবার ঢাকাসহ সারাদেশে পানির স্বল্পতার কারণে মানুষ বালতি কিংবা ড্রামে পানি জমিয়ে রাখে। আর বিভিন্ন ধরণের নির্মাণ কাজের সাইটগুলোতে চৌবাচ্চা, ড্রাম এডিস মশার বিসত্মারে প্রধান ভূমিকা পালন করছে, বলে মনে করেন তিনি।