স্টাফ রিপোর্টার : হঠাৎ করেই রাজশাহীর আইনশৃঙ্খলা পরিসি’তির অবনতি ঘটেছে। অশানত্ম হয়ে উঠেছে শানিত্ম ও সৌহার্দ্যের এই নগরী। একের পর এক ঘটছে সন্ত্রাসী ঘটনা। নারীদের যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্ত করার সঙ্গে বাড়ছে ছিনতাই এবং খুনও। আর স্কুল-কলেজ ছেড়ে বিভিন্ন শিড়্গা প্রতিষ্ঠানের শিড়্গার্থীদের পদ্মাপাড়, পার্ক এবং মোড়ে মোড়ে আড্ডা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে উঠেছে।
রাজশাহীতে এখন চলছে রমরমা মাদক ব্যবসাও। আর বিশেষ করে বাড়ছে কিশোর অপরাধ। তারা চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, খুন ও মাদক ব্যবসাসহ জড়িয়ে পড়ছে বড় অপরাধে। নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির আনুকূল্যে ‘কিশোর গ্যাং’র অপরাধমূলক কর্মকা-গুলো ডালপালা মেলছে বলে মনে করছেন সমাজ বিশেস্নষকরা।
সমপ্রতি রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রম্নয়েট) শিক্ষককে মারধর, অটোরিকশায় ওঠার পর রম্নয়েট ছাত্রীকে যৌন হয়রানি ও ছিনতাইয়ে ব্যর্থ হয়ে কলেজ ছাত্র খুনের ঘটনা উদ্বেগ ছড়িয়েছে নগরজুড়ে। আরও বড় উদ্বেগের ঘটনা ঘটেছে গেল ১৫ আগস্ট রাজশাহীর শহিদ এএইচএম কামারম্নজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানার কার্যালয়ে। পুলিশ, পরিবার এবং চিড়িয়াখানার কর্মকর্তাদের সামনেই সেদিন রম্নয়েট কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মহিদুল ইসলামকে কাঁচ দিয়ে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। হামলায় রক্তাক্ত জখম হন অনত্মত পাঁচজন।
এদিকে রাজশাহীতে এসে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছেন বিদেশী নাগরিকও। গত বুধবার সন্ধ্যায় রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন থেকে বের হওয়ার সময় ছিনতাইকারী কবলে পড়েন সানজিদা নামের বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত ওই আমেরিকান নাগরিক। সানজিদার হাতব্যাগ নিয়ে গেছে ছিনতাইকারী। ওই ব্যাগেই ছিলো তার পাসপোর্ট। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সানজিদা তার স্বামীকে নিয়ে আবার রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে যান সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখতে। তবে লাভ হয়নি।
এদিকে অনেক সময় চোখের সামনে ঘটনা ঘটলেও সমাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে সাধারণ মানুষ আক্রানত্মদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে সাহস পাচ্ছেন না। দুর্বৃত্তদের সামনে রম্নখে না দাঁড়িয়ে, প্রতিরোধ না করে নিরব দর্শকের মতো নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত হতে দেখছেন তারা। অনেক সময় আবার এই প্রত্যক্ষদর্শীদের তোলা ছবি এবং ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যা অপরাধ এবং অপরাধীদের বিরম্নদ্ধে অকাট্য প্রমাণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে এর মাঝখান থেকে ঝরে যাচ্ছে অনেক তরম্নণ-তরম্নণীর প্রাণ। আর ভুক্তভোগীরা পুলিশের কাছে না গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। পুলিশের ওপর আস’া না থাকায় এমনটি ঘটছে বলে মনে করছেন সমাজ বিশেস্নষকরা।
সম্প্রতি রম্নয়েট শিক্ষকের স্ত্রীকে যৌনহয়রানি প্রতিবাদ করায় শিক্ষককে মারধর, রম্নয়েট ছাত্রীকে অটোরিকশায় তুলে লাঞ্ছিত করা, ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার পথে সিটি কলেজছাত্র খুনের সমসাময়িক এমন ঘটনাগুলো এখন ‘টক অব দ্যা সিটি’। পাড়া-মহলস্নার সাধারণ চায়ের স্টল থেকে শুরম্ন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় এখন সবাই সরব ‘আইন-শৃঙ্খলা’ পরিসি’তি অবনতির আলোচনা আর সমালোচনায়।
উদ্বেগজনক হলেও সত্য যে, রাজশাহী জুড়ে গত এক মাসে এমন ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় শতাধিক ঘটনা ঘটেছে। যৌন হয়রানি ছিনতাইসহ নানান অপরাধ কর্মকা-ের অধিকাংশতেই জড়িত হয়ে পড়েছে কিশোর অপরাধীরা। এমন ভয়ানক পরিসি’তিতে উদ্বীগ্ন হয়ে উঠেছেন অভিভাবকরা।
উদ্ভুত পরিসি’তিতে মহানগর পুলিশের কাছে কিশোর অপরাধীদের তালিকা দিয়ে খোদ এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেনর রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা। তিনি বলেন, অতি সমপ্রতি সময়ের ঘটনায় আমি উদ্বিগ্ন। আমি চাই না রাজশাহী ‘বরগুনা’ হোক; প্রকাশ্যে মানুষ হত্যা হোক। শানিত্মর এ নগরটি সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত হোক। আমার এই উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার কথা এরই মধ্যে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছি।
এদিকে নগর পুলিশের দাবি, ভুক্তভোগীরা তাদের কাছে গেলে ব্যবস’া নেওয়া হয়। কিন’ এর পরও অনেকে তাদের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। অবশ্য সেটি দেখেও অনেক সময় আইনি ব্যবস’া নিচ্ছেন তারা। রাজশাহী নগর পুলিশের মুখপাত্র গোলাম রম্নহুল কুদ্দুস বলেন, সর্বোচ্চ গুরম্নত্ব দিয়ে তারা সাম্প্রতিক সময়ের এসব ঘটনা তদনত্ম করে দেখছেন। কোনো ঘটনা ঘটলে সিসিটিভির ফুটেজ এবং স’ানীয়দের সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে পুলিশ অপরাধীদের সনাক্ত করছে এবং আইনের আওতায় নিয়ে আসছে।
তবে সামাজিক অসি’রতা ও আস’াহীনতার কারণেই মানুষ লাঞ্ছিত হয়েও পুলিশের কাছে যাচ্ছে না বলে সমস্যা চিহ্নিত করেছেন সমাজ বিশেস্নষকরা। এর বিপরীতে ভুক্তভোগীরা যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের পাতায় যাচ্ছেন। সেখানে জনমত তৈরি করে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল নিচ্ছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শাহ আজম শানত্মনু বলেন, কমবেশি অনেকের কাছেই পুলিশের কাছে গিয়ে সেবা না পাওয়ার একটা নেতিবাচক অভিজ্ঞতা আছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আশ্রয় নিচ্ছেন। এটা এখন মানুষের সেন্টিমেন্ট হিসেবে কাজ করছে। তাই পুলিশকে এখন আরও আনত্মরিক হতে হবে।
রাবি শিক্ষক শেখ শামীমা সুলতানা বলেন, বিচার হবে কী হবে না এমন প্রশ্নে এখনও অনিশ্চিতায় ভোগেন ভুক্তভোগী মানুষ। এটি একটি কারণ হতে পারে যে মানুষ ওখানে না গিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছেন। তবে তার কাছে মনে হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটা এখন আসলে একটা বড় হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে তথ্যের জন্য। তাই সামাজিক অপরাধ রোধে পুলিশকে আরও নিবিড়ভাবে সাধারণ মানুষের সাথে মিশে কাজ করার পরামর্শ এই বিশেস্নষকের।