স্টাফ রিপোর্টার: রেশমকে ঘিরেই রাজশাহীর পরিচয়। রেশম রাজশাহীর ঐতিহ্য, এক ইতিহাসের নাম। সিল্ক কাপড়ের প্রধান উপাদান রেশমকে ঘিরে রাজশাহী অঞ্চলের রয়েছে সুদীর্ঘ আর উজ্জ্বল অতীত। দিনে দিনে হারিয়ে যাওয়া রেশমের সেই ঐতিহ্য ফেরাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ইচ্ছা অনুযায়ী রাজশাহীতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান কার্যালয়।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, রেশম বোর্ডের বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি) আবদুল হাকিম নিজেই রেশম শিল্পকে এগিয়ে নেয়ার ব্যাপারে আনত্মরিক নন। ডিজি নিজেই এ বছরের ৭ জানুয়ারি পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের উপস্থিতিতে বলেছেন, বাংলাদেশে রেশম বোর্ডের আদৌ কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। কয়েক দিন আগে একাধিক দৈনিক পত্রিকায় বিষয়টি প্রকাশ হলে রাজশাহীতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। দাবি উঠেছে দ্রম্নত সময়ের মধ্যে ডিজি আবদুল হাকিমের অপসারণেরও।
রাজশাহী মহানগর বঙ্গবন্ধু পরিষদের সহ-সভাপতি অধ্যাপক রম্নহুল আমিন প্রামানিক বলেন, উনি (ডিজি) ঐতিহ্যের মানুষ না। ঐতিহ্য সম্পর্কে কোনো ধ্যান-ধারণাও রাখেন না। তাই এ ধরনের মনত্মব্য করতে পেরেছেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু তো এমনি উদ্যোগ নেননি। তিনি এ দেশের ঐতিহ্যকে অনুসন্ধান করেছিলেন। কিছু মানুষ ব্যাপারগুলো না বুঝেই বেফাঁস মনত্মব্য করেন। আর নিজের প্রতিষ্ঠানকেই যিনি অস্বীকার করেন, সেখানে তিনি থাকেন কী করে! তার তো দরকার নেই।
নিজের করা মনত্মব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে রেশম উন্নয়ন বোর্ডের ডিজি আবদুল হাকিম গত মঙ্গলবার দাবি করেছিলেন, এমন মনত্মব্য তিনি করেননি। কিন্তু তিনি এ কথা বলেছেন বলে মিথ্যা কথা ছড়ানো হচ্ছে। তবে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে ডিজি হাকিম বোর্ডের অপ্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
এদিকে ডিজি হাকিম রেশম বোর্ডের প্রয়োজনীয়তা না দেখলেও ঔপনিবেশিক আমল থেকেই এই শিল্পের কদর করা হয়েছে। মূলত ঔপনিবেশিক আমল থেকেই বাংলায় শুরম্ন হয় রেশম চাষ। ১৯০৫ সালে রেশম শিল্পের বিকাশের প্রতিষ্ঠা করা হয় দুটি বীজভান্ডার। ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ সরকার রেশমের শিল্পকে তদারক করার জন্য আলাদা একটি বিভাগ চালু করে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় বাংলার রেশমপ্রধান অঞ্চল ভারতের অংশে চলে যায়। অল্প কিছু অঞ্চল পড়ে এপার বাংলায়।
এর মধ্যে পাকিসত্মান সরকারের উদাসীনতায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটের রেশমশিল্প প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। পরে অবশ্য ড়্গুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) অধীন রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে ১০টি রেশম বীজভান্ডার স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম রাজশাহী রেশম কারখানা। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর পর্যনত্ম সমগ্র রেশম কার্যক্রম বিসিকের আওতায় পরিচালিত হতো। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রচেষ্টায় নতুন করে আলোর মুখ দেখতে শুরম্ন করে রেশম শিল্প।
রেশম শিল্পকে সমৃদ্ধ করার জন্য নাটোরে উত্তরা গণভবনে এসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজশাহীতে রেশম বোর্ড এবং রেশম গবেষণা ও প্রশিড়্গণ কেন্দ্র স্থাপনের ঘোষণা দেন। পরে ১৯৭৪ সালে রাজশাহীতে রেশম গবেষণা ও প্রশিড়্গণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এর তিন বছর ১৯৭৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ রেশম বোর্ড। এরপরই রাজশাহী রেশম কারখানা এ বোর্ডের কাছে হসত্মানত্মর করা হয়।
পরবর্তীতে ২০১৩ সালের ৬ মার্চ ১৩ নম্বর আইন বলে বাংলাদেশ রেশম বোর্ড, রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং সিল্ক ফাউন্ডেশন- এ তিনটি প্রতিষ্ঠানকে একীভূতকরণের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড’ গঠন করা হয়। এটি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান।
রেশম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সঠিক পরিকল্পনার কারণে ২০০৯-১৬ সাল পর্যনত্ম ব্যাপক কার্যক্রমের মাধ্যমে রেশম বোর্ডে বেশকিছু সফলতা এসেছে। এর মধ্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে প্রায় সাত লাখ। রেশমচাষী বা বসনী প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে প্রায় ছয় হাজার। তুঁতচারা উৎপাদন, সরবরাহ ও রোপণ করা হয়েছে প্রায় ২৮ লাখ। রেশম বীজগুটি উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কেজি। রোগমুক্ত রেশম ডিম উৎপাদন ও বিতরণ করা হয়েছে প্রায় ২৪ লাখ। রেশম গুটি উৎপাদন করা হয়েছে প্রায় আট লাখ কেজি। রেশম সুতা উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৬৭ হাজার কেজি। আবাসন ও আদর্শ রেশমপলস্নী স্থাপন হয়েছে ২৫টি এবং বর্তমানে বস্নক পদ্ধতিতে তুঁত চাষ করা হচ্ছে প্রায় ৫৫টি বস্নকে। এছাড়া রেশম বোর্ডের পরিচালনা পর্ষদের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি হয়ে বন্ধ রেশম কারখানাও চালু করেছেন রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা। বিএনপি-জোট সরকারের আমলে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী এই কারখানাটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল।
কিন্তু রেশম বোর্ডের বিএনপি-জামায়াতপন্থী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আবার এই বোর্ড নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সূত্র বলছে, বোর্ডের ডিজি আবদুল হাকিমেরই রয়েছে বিএনপি-জামায়াতপ্রীতি। তার সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্কও পুরনো। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে দ-প্রাপ্ত জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর সংসদীয় এলাকা পাবনার সাথিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ছিলেন তিনি। নিজামীর মন্ত্রিত্বের প্রায় পুরো সময়টাতেই তিনি তার আস্থাভাজন হিসেবে দাপটের সঙ্গে সাথিয়া উপজেলায় বহাল ছিলেন। পরে তিনি বিএনপি নেতা আলমগীর কবিরের আস্থাভাজন হিসেবে নওগাঁর আত্রাইয়ের ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এই আবদুল হাকিমই এখন রেশম বোর্ডের প্রয়োজনীয়তা নেই বলে মনত্মব্য করছেন। অথচ গেল বছরের এপ্রিলে তিনি ডিজি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার আগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১৪টি নার্সারি, ৩৯টি কেন্দ্র ও ১৫৯টি উপকেন্দ্র গড়ে তুলেছে রেশম বোর্ড। দেশের ৪৮টি জেলা ও ২০২টি উপজেলায় রেশম উৎপাদন কার্যক্রম সমপ্রসারিত হয়েছে। উলেস্নখযোগ্য সংখ্যক বেসরকারি সংস্থাও রেশম উৎপাদন কার্যক্রমে জড়িত হয়েছে এবং এর ফলে গ্রামীণ দরিদ্রদের কর্মসংস্থান বেড়েছে।
আর এ সব সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেশম বোর্ড প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখেছিলেন বলে। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা নেই বলে রেশম বোর্ডেরই ডিজির মনত্মব্যে রাজশাহীর সচেতনমহল ড়্গোভ প্রকাশ করেছেন। বঙ্গবন্ধুর গড়া এই প্রতিষ্ঠান নিয়ে এমন মনত্মব্য করায় এই শোকের মাস আগস্টেই ডিজি আবদুল হাকিমকে অপসারণের দাবি করেছেন কেউ কেউ।
কবিকুঞ্জের সাধারণ সম্পাদক কবি আরিফুল হক কুমার বলেন, আমার মনে হয় ডিজি আবদুল হাকিম যতদিন দায়িত্বে আছেন ততদিনে রেশমের উন্নয়নে কোনো অবদান রাখতে না পেরে এ ধরনের মনত্মব্য করেছেন। তিনি কী কী উন্নয়ন করেছেন তা এখন জানার এবং অনুসন্ধানের সময় এসেছে। তিনি বলেন, রেশম বোর্ড শতাব্দি প্রাচীন সংস্কৃতির উত্তরাধিকার। ঐতিহ্যের বিষয়। আর এই প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ফসল। এই প্রতিষ্ঠান নিয়ে এমন মনত্মব্য করা মোটেও ঠিক হয়নি।
রাজশাহী মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার ডা. আবদুল মান্নান বলেন, যে প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধু গড়েছেন সেটা নিয়ে কথা বলার উনি কে? এটা আমাদের রাজশাহীর মানুষের জন্য খুব দুঃখজনক। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু দেশের উন্নয়নের একটা মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়েছেন। কিন্তু এখনও বিএনপি-জামায়াতের কর্মকর্তারা উন্নয়ন বাধাগ্রসত্ম করে দেশকে ভুল পথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। নিশ্চয় ডিজি আবদুল হাকিম তাদের বাইরে নন। আমরা তার অপসারণ চাই।