তৈয়বুর রহমান: কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে ব্যসত্ম সময় কাটাচ্ছেন কর্মকাররা। কোরবানির পশু জবাই, চামড়া ছাড়ানো ও মাংস টুকরো করতে ধারালো অস্ত্রের বিশেষ প্রয়োজন। এ কাজে ব্যবহৃত হয় চাপাতি, দা, বটি, চাকুসহ বিভিন্ন ধরনের দেশি অস্ত্র। কোরবানি শেষ হয়ে গেলে এগুলোর কোন কাজ না থাকায় সারাবছর পড়ে থাকে ঘরের কোণে। পড়ে থেকে থেকে সেগুলো পুরানো হয়ে যায়। বছর ঘুরে আবার কোরবানি এসে গেলে সেগুলো শান দেবার প্রয়োজন হয়।
কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে এসেছে। সময় আর মাত্র দুইদিন বাকি। সময় ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে অস্ত্র শান বা ধার দেবার ধুম পড়েছে রাজশাহীর কামারের দোকানে দোকানে। শুধু নগর নয় এর বাইরেও রাজশাহীর গ্রামাঞ্চলে কামার সম্প্রদায় ব্যসত্ম দিন কাটাচ্ছেন।
নগরীর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি স্টেডিয়াম মার্কেটে নগরীর ভেদা কর্মকার বলেন, কোরবানির সময় কাছিয়ে আসায় সকালে এসে দোকানে অস্ত্র ধার ও তৈরির জন্য বসি, সারা দিন চলে আর অনেক রাতে বাড়ি ফিরতে পারি। তেরখাদিয়ার সুভাষ ও ডলার কর্মকার বলেন, এখন অনেক তৈরি এসব অস্ত্র বাজারে কেনা পাওয়া যায়। সারাবছরে বসে কাটাতে হয়। কোরবানির সময় আসলে কাজের চাপ এতো বাড়ে যে কোন ফুরসৎ পাওয়া যায় না। এমনকি খাবার সময় টুকুও পর্যনত্ম পাওয়া যায় না। গ্রাহকরা মাথায় চড়ে বসে। যেমনটি দেখা গেল উপশহরে হারম্নন কর্মকারের দোকানে। সেখানে রাত দিন দা, বটি, চাপাতি, চাকু, হাসুয়া তৈরি ও ধার দিতে ব্যসত্ম কামাররা। প্রতিটি হাসুয়া ২০০ থেকে ৩৮০, ছুরি ১৪ ইঞ্চি ৪০০ টাকা, ১৮ ইঞ্চি ৪৫০ টাকা এবং চামড়া ছাড়ানোর জন্য ছোট ছোট চাকু ৩০ থেকে ৪০টাকা মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। আবার পুরানো অস্ত্র রামদা পুড়ানো ও ধার দিতে ৮০ টাকা। ছুরি ও হাসুয়া পুড়ানো ও ধার দেয়া ৫০ টাকা, ছোট ছুরি পুড়ানো ২০ থেকে ৩০ টাকা।
এদিকে অস্ত্র তৈরির দোকানে কাজের জন্য কর্মচারী রয়েছে ৫ জন, কোন কোন দোকানে ৩ জন। তারা অস্ত্র তৈরিতে রাত দিন কাজ করে চলেছেন। আর সাহেব বাজারের তৈরি অস্ত্রের দোকান ইকবাল ট্রেডার্স সহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দেশি ঐ রেডিমেট তৈরি চাকু ছুরির দোকানে বেড়ে গেছে যথেষ্ট ভিড়।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে রাজশাহী জেলার ৯টি উপজেলায় কাজের চাহিদা না থাকায় কামার শিল্পের সাথে সংশিস্নষ্ট অনেকেই এ পেশা ত্যাগ করছেন। এর কারণ হিসেবে জানা গেছে যে, এ শিল্পের প্রধান উপকরণ লোহা, ইস্পাত ও কয়লার দাম বেড়ে যাওয়ায় কামাররা এখন অর্থসঙ্কটে ভুগছেন। অতীতে ৪০-৫০ টাকায় এক বসত্মা কাঠকয়লা পাওয়া যেত। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০০-৩০০ টাকায়। চামড়ার তৈরি ‘ভাতি’ দিয়ে কয়লার আগুন জ্বালানোর সময় বাতাস দিতে হয়। তার মূল্যও বেড়ে গেছে। এরপরেও বসে নেই কামাররা। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে এখন ব্যসত্ম সময় পার করছেন।
নগরীর কামার শিল্পী হারম্নন কর্মকার জানান, ১৫-২০ টাকার লোহার দাম এখন বেড়ে হয়েছে ৮০-৯০ টাকা। ‘ভাতি’র দাম তিন হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১০ হাজার টাকা। শ্রমিকদের মজুরি দিনপ্রতি ৪০০-৫০০ টাকা পর্যনত্ম গুণতে হচ্ছে। তবে বছর জুড়ে এ শিল্পে মন্দা ভাব থাকলেও প্রতি বছর কোরবানির ঈদের আগে তাদের কদর বাড়ে। ঈদ মওসুমে কাজের ব্যসত্মতা বেড়ে যায়। তারা আরও বলেন, এক সময় লোহার তৈরি দা, বঁটি, ছুরিসহ বিভিন্ন জিনিস গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার হতো প্রচুর। বর্তমানে কামারের তৈরি লোহার জিনিসের পরিবর্তে স্টিলের রেডিমেড উপকরণের ব্যবহার বেড়েছে।
নগরীর এক স মিলের মালিক জানান, কোরবানিকে সামনে রেখে দা, বটি, চাকু, ছুরি, চাপাতির পাশাপাশি মাংস বানানোর জন্য গাছের গুঁড়ির চাহিদাও বেড়ে গেছে। স মিলগুলোতে গুঁড়ি কিনতে এখনই ভিড় জমাতে শুরম্ন করেছেন ক্রেতারা। নগরীতে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে মাংস কাটার জন্য দেশি অস্ত্র তৈরির জন্য কামারের দোকান এবং মাংস কাটার জন্য কাঠের গুঁড়ির ব্যবসা এখন জমে উঠেছে। আর দুই দিন পরই ঈদ। মানুষের চাহিদার কথা বিবেচনা করে ড়্গুদ্র্র ও মৌসুমী স মিলের কাঠ ব্যবসায়ীরা এসব গুঁড়ি বিক্রি করছেন।
নগরীর সাহেববাজার, বিনোদপুর, কাটাখালী, শালবাগান এলাকায় এই ব্যবসা জোরেসোরে চলছে। বিভিন্ন মাপের বিভিন্ন দামের এসব গুঁড়ি সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ২শ’ ৫০ থেকে শুরম্ন করে সর্বোচ্চ সাত-আটশ’ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে এগুলো।
নগরীর শালবাগান এলাকায় মাংস কাটার গুঁড়ি বিক্রেতা জানান, কাঠের মধ্যে তেঁতুল গাছের কাঠ অত্যনত্ম শক্ত ও মজবুত। তার কাছে সবগুলো তেঁতুলের গুঁড়ি। প্রতিবছর কোরবানির ঈদ সামনে রেখে তারা কাঠের গুঁড়ি বিক্রি করেন। তিনি আরও বলেন, এ কাঠগুলো ঠিকা ও কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছে।
নগরীর উপশহর, সাহেববাজার, সপুরা, শালবাগান,লক্ষ্মীপুর, হড়গ্রাম বাজার, সাগরপাড়া,তালইমারী, কাজলা,বিনোদপুরসহএলাকার কামারদের দোকানে প্রচুর ভিড় দেখা যাচ্ছে। ঈদের আগের রাত পর্যনত্ম কামারের দোকানে ভিড় থাকবে বলে সবার ধারণা করা হচ্ছে।