রিমন রহমান: সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু জ্বর। এই রোগের বাহক এডিস মশার লার্ভাও মিলেছে রাজশাহীতে। কিন্তু রাজশাহী মহানগরীতে মশা নিয়ন্ত্রণে গতি নেই। আগের মতো ঢিমেতালেই চলছে এই কার্যক্রম। সচেতন নগরবাসী বলছেন, সংশিস্নষ্ট সবাইকে নিয়ে সমন্বিতভাবে এখনই মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে নগর সংস্থাকে। তা না হলে ছড়িয়ে পড়তে পারে ডেঙ্গু।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ জুলাই প্রথম এই হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রানত্ম রোগী ভর্তি হন। এরপর থেকে প্রতিদিনই রোগী ভর্তি হচ্ছেন। এ পর্যনত্ম ডেঙ্গুজ্বরে আক্রানত্ম হয়ে হাসপাতালে রোগী ভর্তি হয়েছেন ২৪৮ জন। এদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৫০ জন। গতকাল বৃহস্পতিবার রোগী ভর্তি ছিলেন ৯৮ জন।
এদিকে রাজশাহীতেই ডেঙ্গুতে আক্রানত্ম হয়েছেন এমন রোগীও পাওয়া গেছে। স্থানীয় সাংবাদিক ফেরদৌস সিদ্দিকী ঢাকায় না গিয়েও ডেঙ্গুতে আক্রানত্ম হয়েছেন। বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে স্বাস্থ্য বিভাগকে। তাই বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় নগরীর ১০০টি স্থান থেকে পানি সংগ্রহ করে তাতে এডিস মশার লার্ভা আছে কি না তার পরীড়্গা চালিয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি স্পটে মিলেছে এডিস মশার লার্ভা। কিন্তু তারপরেও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) মশক নির্ধন কার্যক্রমে তেমন গতি আসেনি।
সংশিস্নষ্ট সূত্রে জানা গেছে, খোদ রাসিকের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক ডেঙ্গু জ্বরে আক্রানত্ম হয়েছেন। তবে তিনি ঢাকা থেকে আক্রানত্ম হয়ে এসেছেন বলে সিটি করপোরেশনের পড়্গ থেকে দাবি করা হয়েছে। রাজশাহীতে যেন ডেঙ্গু ছড়িয়ে না পড়ে সে জন্য সম্প্রতি বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে সভাও করেছে সিটি করপোরেশন। সেখানে মশক নিধন কার্যক্রম জোরদারের সিদ্ধানত্ম হয়।
কিন্তু কার্যক্রমে কোনো গতি পায়নি। নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলররা একদিন করে মশক নিধন কর্মসূচি পালন করেছেন। সেখানে ব্যানার নিয়ে আগাছা পরিস্কারের ছবি তোলা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে আগাছা পরিস্কার আর চলছে না।
এদিকে ‘পরিবেশের জন্য ড়্গতিকর’ এমন যুক্তি দেখিয়ে ২০১৫ সালের পর নগরীতে মশক নিধনের জন্য ফগার মেশিনের ব্যবহার করা হয়নি। তবে সম্প্রতি মশক নিধন নিয়ে সিটি করপোরেশনে অনুষ্ঠিত জরম্নরী সভায় ফের ফগার চালু করার সিদ্ধানত্ম হয়। কিন্তু গতকাল পর্যনত্ম এটিও শুরম্ন হয়নি। তবে সিটি করপোরেশনের হাতে থাকা পুরনো মাত্র পাঁচটি ফগার মেশিন দিয়ে মশক নিধন শুরম্ন হতে পারে বলে জানা গেছে।
সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন জানিয়েছেন, আগের মতো এখনও নগরীর ড্রেনগুলোতে খুব সামান্য পরিমাণে ডিজেল ও কোরোসিন তেলের মিশ্রণ ছিটিয়ে মশার ডিম নষ্টের চেষ্টা চলছে। নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডকে ছয়টি ভাগে ভাগ করে এই কার্যক্রম চলছে। প্রতিদিন মাত্র ৫০০ মিলিলিটার তেল ছেটানো হয়। ছয়দিন পর পর একটি ড্রেনে তিন থেকে চার ফোটা করে তেল পড়ে বলেও জানিয়েছেন সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা।
এদিকে নগরীর কোন কোন এলাকায় এডিস মশার লার্ভা রয়েছে সে সম্পর্কেও কোনো ধারণা নেই সিটি করপোরেশনের। কেননা, নগর সংস্থায় নেই কীট নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা। অথচ এই পদ আছে ঠিকই। বেশ কয়েক বছর আগে এই পদে জনবল নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তিতে দেয়া হলেও নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। কীট নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা থাকলে তিনি গবেষণা করে বলতে পারতেন কোন এলাকায় এডিসের বংশ বিসত্মার বেশি। ফলে সেসব এলাকায় মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা যেত। কিন্তু এটি না হওয়ায় অনেকটা ‘ধারণা’ করে তেল ছেটাচ্ছে সিটি করপোরেশন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন বলেন, কীট নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা থাকলে ভাল হতো। কিন্তু সিটি করপোরেশনে এই পদে কেউ আসতে চান না। কারণ, এখানে বেতন হবে কম। তাই এই পদে কেউ কখনো যোগদান করেননি। তবে আমাদের পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করা হয়েছে। প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা চলমান রয়েছে।
তবে রাজশাহী রড়্গা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান মনে করেন, পরিচ্ছন্নতা অভিযানের নামে যা হচ্ছে তা ‘আই ওয়াশ’। ফটোসেশন ছাড়া কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। তিনি বলেন, রাজশাহীতে এডিস মশার লার্ভা আছে। সেগুলো ধ্বংস হচ্ছে না। তাই ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগকে সমন্বিতভাবে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। আর এই কাজ যেন সুষ্ঠুভাবে হয় তার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সচেতন মহলের সবাইকে অনত্মর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।