স্টাফ রিপোর্টার: বিএনপি নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টুর মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততায় রেশম বিষয়ক একটি বেসরকারি সংস’া (এনজিও) স’াপনের প্রক্রিয়া চালানোর অভিযোগ উঠেছে খোদ রাজশাহীস’ বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি) আবদুল হাকিমের বিরম্নদ্ধে। সরকারি পদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে তিনি রেশম বোর্ডের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এই কাজে ব্যবহার করছেন। এ নিয়ে বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে তারা বিষয়টি নিয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, আবদুল আউয়াল মিন্টুর মালিকানাধীন লাল তীর ও মাল্টিমুড কোম্পানির সঙ্গে মিলে এনজিওটি দাঁড় করাতে রেশম প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট এলাকার রেশম চাষি ও বসনীদের সম্পৃক্ত করার প্রক্রিয়া শুরম্ন করেছেন। এর সঙ্গে পস্ন্যানিং কমিশনের এক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও জড়িত। এই এনজিওর প্রস’তিমূলক কাজের জন্য রেশম বোর্ডের একজন বর্তমান কর্মকর্তাকে সার্বিক দায়িত্ব দিয়েছেন এই মহাপরিচালক।
অভিযোগে জানানো হয়, বিএনপি নেতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠান গড়ার মতো সখ্য তৈরির নেপথ্যে রয়েছে বর্তমান মহাপরিচালকের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের পুরনো সম্পর্ক। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে দ-প্রাপ্ত জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর সংসদীয় এলাকা পাবনার সাথিয়ায় ইউএনও ছিলেন তিনি। নিজামীর মন্ত্রিত্বের প্রায় পুরো সময়টাতেই তিনি তার আস’াভাজন হিসেবে দাপটের সঙ্গে সাথিয়া উপজেলায় বহাল ছিলেন। পরে তিনি বিএনপি নেতা আলমগীর কবিরের আস’াভাজন হিসেবে নওগাঁর আত্রাইয়ের ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অভিযোগে আরও উলেস্নখ করা হয়েছে, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে রেশম বোর্ডে বিএনপি-জামায়াতপনি’ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিয়েছেন তিনি। জ্যেষ্ঠদের ডিঙিয়ে এক জামায়াত নেতাকে করেছেন তার ভারপ্রাপ্ত ব্যক্তিগত সহকারী। সচিবের কক্ষে এসি সংযোগ না থাকলেও তার সেই জামায়াতপনি’ পিএ-এর কক্ষে একটি দুই টনের এসি লাগানো হয়েছে। ঢাকার মোহাম্মদপুরে জামায়াতের রোকন ঢাকা আঞ্চলিক কার্য্যালয়ের উপ-পরিচালক নূর কুতুবুলকে রাঙামাটি রেশম উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছেন মহাপরিচালক আবদুল হাকিম। এমনকি ওই অভিযোগে নাম উলেস্নখ করে দাবি করা হয়েছে, নিজের আমলে বেশ কয়েকজন জামায়াত নেতাকর্মীকে বোর্ডে চাকরি দিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রম্নত প্রকল্পে গড়িমসি: বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালে তুঁত চাষ উন্নত করা ও একটি বাড়ি একটি খামারের সঙ্গে একে সম্পৃক্ত করে প্রকল্প গ্রহণের নির্দেশ দেন। সাবেক মহাপরিচালক আনিস ভুইয়া তার মেয়াদে সেই কাজটি করেননি। গেলো বছরের ৪ এপ্রিল বর্তমান মহাপরিচালক দায়িত্ব গ্রহণের পরও প্রকল্পটি বাসত্মবায়নের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অভিযোগে বলা হয়, বর্তমান মহাপরিচালক প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রম্নতিমূলক এই প্রকল্পটি নিয়ে ন্যুনতম কোনো উদ্যোগও নেননি। বরং বিভিন্ন সময় রেশম বোর্ড নিয়ে বিরূপ কথাবার্তা বলেছেন। বিএনপি নেতা মিন্টুর সঙ্গে রেশম বিষয়ক এনজিও দাঁড় করাতে তিনি এমনটা করছেন সন্দেহ করে অভিযোগে আরও জানানো হয়, এ বছরের ৭ জানুয়ারি পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের উপসি’তিতে মহাপরিচালক বলেন, বাংলাদেশে রেশম বোর্ডের আদৌ কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই।
লুটপাটের মহোৎসব: এই স্বল্প সময়ে দায়িত্বপালনকালেই মহাপরিচালক আবদুল হাকিমের বিরম্নদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ আনা হয়েছে। লিখিত অভিযোগে বলা হয়, গেলো বছর রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশার প্রচেষ্টায় বন্ধ থাকা রাজশাহী রেশম কারখানার ৫টি লুম পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়। সমপ্রতি মহাপরিচালক সরকারি কোনো বরাদ্দ ছাড়াই সবগুলো লুম চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন। এজন্য তিনি চাকরিচ্যুত একজন কর্মচারী ও ঠিকাদারকে কৌশলী টেন্ডারে লুম মেরামতের কাজ পাইয়ে দিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে ওই ঠিকাদার মেশিন মেরামত করতে ৫টি সচল মেশিন খুলে অচল করে দিয়েছেন। এসব যন্ত্রাংশ নিয়েই মেশিন মেরামতের কাজ সারছেন। গত ৮ জুন কিছু যন্ত্রাংশও চুরি হয়ে যায় তার কাজের এলাকা থেকে। পরবর্তীতে সেটি ধামাচাপা দিতে এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবগতও করা হয়নি। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, মহাপরিচালকের নির্দেশেই এই কাজটি করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও জানানো হয়, মহাপরিচালক পরিচালনা কমিটিকে উপেক্ষা করে ২০ শতাংশ কম দরে উৎপাদিত রেশম বস্ত্র বিক্রির নির্দেশ দিয়েছেন। যদিও উৎপাদিত বস্ত্রের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে অভিযোগে। দাবি করা হয়েছে, মহাপরিচালক ও তার ঘনিষ্ঠ ঠিকাদার মিলে রেশম বস্ত্র কারখানা থেকে বাইরে নিয়ে যান। এরপর এগুলো প্যাকেট করে ঢাকায় পাঠানো হয়। এ কারণেই বিপণনের দিকে মনোযোগ না দিয়ে বর্তমানে প্রায় কোটি টাকার কাপড় ও ৫০ লাখ টাকার রেশম সুতা ভা-ারে পড়ে আছে।
অভিযোগে বলা হয়, রেশম বোর্ডে একাধিক ভালো সভাকক্ষ থাকার পরেও বর্তমান মহাপরিচালক আরেকটি সভাকক্ষ তৈরি করিয়ে নিয়েছেন। এই সভাকক্ষ তৈরির বিল দেখানো হয়েছে ১১ লাখ টাকা। অথচ রেশম কাপড়ের সংরক্ষণাগার সংস্কারের কাজটি ঝুলিয়ে রেখেছেন।
অভিযোগে আরও জানানো হয়, প্রায় ১০০ জন রেশম চাষির জন্য বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিলো। যথাসময়ে এই প্রশিক্ষণটি বাসত্মবায়ন না করে ভুয়া ভাউচার দেখিয়ে প্রশিক্ষণের সব বরাদ্দই লোপাট করা হয়েছে। গত ৩০ জুন নির্ধারিত প্রশিক্ষণ না করিয়েই রেশম বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণভাতা প্রদান করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক আবদুল হাকিম বলেন, এসব ডাহা মিথ্যা খবর। অভিযোগকারীর অভিযোগ উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত। আমার মতো অনেস্ট (সৎ) লোক সারা বাংলাদেশে কয়টা পাবেন, খুঁজে দেখেন। বিএনপি নেতার সঙ্গে এনজিও প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি সরকারি চাকরি করি। এনজিও কেন করতে যাব? এনজিও করার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। কে করছে সে খবরও আমার কাছে নেই।