স্টাফ রিপোর্টার: দীর্ঘদিন ধরেই মাধ্যমিক ও উচ্চ শিড়্গা (মাউশি) অধিদপ্তরের রাজশাহী অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক (ডিডি) হিসেবে আছেন ড. শরমিন ফেরদৌস চৌধুরী। মাঝে একবার শাসিত্মমূলকভাবে ঢাকায় শিড়্গা ভবনে টেনে নেয়া হলেও সাত মাস পর তিনি আবারও রাজশাহী এসেছেন তদবির করে। কিন্তু থামেনি অনিয়ম।
খোদ সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিড়্গক-কর্মচারীদের এমপিও (বেতন-ভাতার সরকারি অংশ) তালিকাভুক্ত করতে মাউশির রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ে ভয়াবহ দুর্নীতি হয়ে থাকে। অফিস সহকারী আবদুল আজিজ ও আবদুল আওয়ালকে নিয়ে এমপিও সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন ডিডি শরমিন।
সম্প্রতি মাউশিতে পড়া এক অভিযোগের প্রেড়্গিতে শরমিন ফেরদৌসের নানা অনিয়ম-দুর্নীতির তদনত্ম শুরম্ন হয়েছে। রাজশাহী কলেজের অধ্যড়্গ হবিবুর রহমানকে তদনত্মকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। অধ্যড়্গ হবিবুর রহমান ইতিমধ্যে ডিডি শরমিনকে তার দপ্তরের কাগজপত্র প্রস্তুত করতে বলেছেন।
ড. শরমিন ফেরদৌস চৌধুরী রাজশাহীর পিএন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিড়্গক ছিলেন। ২০১২ সালের নভেম্বরে তাকে মাউশির রাজশাহী অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত ডিডি করা হয়। এরপর জড়িয়ে পড়েন নানা অনিয়মে। অবশেষে ২০১৮ সালের শুরম্নতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক গোপনীয় প্রতিবেদনে শরিমনসহ দেশের ১৭৫ জন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর নানা অনিয়মের চিত্র উঠে আসে। এর ভিত্তিতে শিড়্গা মন্ত্রণালয় ওই বছরের ১৫ ফেব্রম্নয়ারির মধ্যে অভিযুক্তদের বিরম্নদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য মাউশিকে নির্দেশ দেয়। নির্দেশনা মোতাবেক জুলাই মাসে ডিডি শরমিনকে শাসিত্মমূলকভাবে ঢাকায় মাউশির মাধ্যমিক শিড়্গা বিভাগের ডিডি করে টেনে নেয়া হয়। কিন্তু ঢাকা যাওয়ার পর থেকেই আবার রাজশাহী আসার জন্য তদবির শুরম্ন করেন শরমিন। এরপর এ বছরের ফেব্রম্নয়ারিতে ফিরে আসেন রাজশাহীতে। তারপর আবারও জড়িয়ে পড়েছেন নানা অনিয়মে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, দারম্নল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ নিষিদ্ধ হলেও ডিডি শরমিন আড়াই লাখ টাকার বিনিময়ে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার খনজোর জয়সাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী গ্রন্থাগারিক নাজমা আকতার বানুকে এমপিওভুক্ত করেছেন। তার ইনডেঙ নম্বর এএল-১১৪২৮৪০। দারম্নল ইহসানের সনদে একই পদে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার দৌলতপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের মো. সেলিমেরও এমপিও করে দেয়া হয়েছে।
কাম্য শিড়্গাগত যোগ্যতা না থাকলেও ২০১৬ সালে এমপিও হয়েছে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বিজ্ঞানের শিড়্গক মোজাফফর হোসেনের। তার ইনডেঙ নম্বর-১১৩১৪৬০। দুর্গাপুর উপজেলার পানানগর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের শিড়্গক মো. রোকনুজ্জামানেরও এমপিও হয়েছে অনিয়ম করে। ১২ বছরের শিড়্গকতার অভিজ্ঞতা না থাকলেও চারঘাট উপজেলার নিমপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে জাল সনদে প্রধান শিড়্গক হিসেবে নিয়োগ পান ইমদাদুল হক। অভিযোগ, এর জন্য দুই লাখ টাকা নিয়েছেন ডিডি শরমিন ফেরদৌস চৌধুরী। পরবর্তীতে মন্ত্রণালয় এই দুর্নীতি ধরতে পারলে ইমদাদুল হকের বেতন বন্ধ করা হয়। তিন লাখ টাকার বিনিমেয় জাল নিবন্ধন সনদে এমপিওভুক্ত হন রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিড়্গক জেসমিন আরা।
অভিযোগে আরও জানা গেছে, বাঘা উপজেলার কেশবপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী প্রধান শিড়্গক হাবিবুর রহমান একই উপজেলার দিঘা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। অনুমোদনহীন আমেরিকা-বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএড সনদ দিয়ে তিনি প্রথমে বিএড স্কেল পান। তারপর একই সনদ দিয়ে তিনি সহকারী প্রধান শিড়্গক হিসেবে এমপিও করান। অথচ আমেরিকা-বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএড কোর্সের অনুমোদনই নেই। বিষয়টি জানাজানি হলে ডিডি শরমিন ফেরদৌস দুই লাখ টাকার বিনিময়ে রয়্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভুয়া সনদ দিয়ে হাবিবুরের এমপিও করে দেন।
এছাড়া ছাতারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শাখা শিড়্গক এমদাদুল হকেরও এমপিও করা হয়েছে অনিয়ম করে। সনদে পদার্থ ও রসায়ন না থাকলেও পুঠিয়ার সাধনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিড়্গক জহুরম্নল হককে বিজ্ঞানের শিড়্গক হিসেবেই এমপিওভুক্ত করে দিয়েছেন ডিডি শরমিন। এজন্য নেয়া হয়েছে মোটা অংকের অর্থ। বাঘার আজের আলী নামের এক ব্যক্তি ডিডিকে এই টাকা এনে দিয়েছেন।
এদিকে শুধু এমপিওভুক্তিতেই দুর্নীতি নয়, অভিযোগে ডিডি শরমিন ফেরদৌসের আরও নানা অনিয়মের ফিরিসিত্ম তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে উলেস্নখ করা হয়েছে, শরমিন ফেরদৌস পিএন স্কুলের প্রধান শিড়্গক থাকা অবস্থায় স্কুলটির ছাত্রী হোস্টেলে থাকতেন। ডিডি হওয়ার আগে-পরে মিলিয়ে তিনি প্রায় ছয় বছর হোস্টেলটিতে বসবাস করেছেন। প্রতিমাসে ভাড়া দিয়েছেন মাত্র ৪ হাজার ২০১ টাকা। অথচ তার ভাড়ার প্রাপ্যতা ২৩ হাজার ৪২৪ টাকা। শরমিন ফেরদৌস সরকারকে প্রায় ১৪ লাখ টাকা ফাঁকি দিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, ডিডি হওয়ার পর তিনি ৪০০ শিড়্গকের প্রশিড়্গণের টাকা আত্মসাত করেন। পরে জানাজানি হলে তোপের মুখে টাকা ফেরত দেন। শরমিন ফেরদৌস ইচ্ছেমতো শিড়্গক-কর্মচারীদের বদলি করেন। ২০১৭ সালের এসএসসি পরীড়্গা চলাকালে মাউশি এক পরিপত্র জারি করে যে, পরীড়্গা চলাকালে কাউকে বদলি করা যাবে না। কিন্তু তিনি দিলরম্নবা আক্তার নামে এক শিড়্গককে চারঘাট থেকে রাজশাহী শহরে বদলি করে আনেন উৎকোচ নিয়ে। ডিডি শরমিন নিজের সনত্মানকে সরকারি স্কুলে ভর্তির জন্য শিড়্গক কোটা পান না। তারপরেও তিনি এই কোটায় ২০১৭ সালে তৎকালীন প্রধান শিড়্গকের সহযোগিতায় নিজের মেয়েকে পিএন স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করান। এর আগে ভাগ্নে এবং ভাতিজাকে একই স্কুলে ভর্তি করান। অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতি করে তাদের মেধাতালিকায় দ্বিতীয় এবং তৃতীয় করা হয়। তাই পরবর্তীতে স্কুলে তারা আর ভাল ফলাফল করতে পারেনি। এ রকম অসংখ্য অভিযোগ আছে তার বিরম্নদ্ধে।
তার অনিয়মের তদনত্ম প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজশাহী কলেজের অধ্যড়্গ হবিবুর রহমান বলেন, এমপিওভুক্তিতে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে, এমন একটি অভিযোগের তদনত্ম আমাকে করতে দেয়া হয়েছে। চার-পাঁচ দিন আগে আমি আদেশটি পেয়েছি। আমি ডিডি শরমিন ফেরদৌসকে কাগজপত্র প্রস্তুত করতে বলেছি। তাই মাউশির মহাপরিচালকের কাছে আমি কয়েকদিন সময় চেয়েছি। আগামী চার-পাঁচ তারিখের দিকে আমি মাউশিতে গিয়ে অভিযোগগুলোর তদনত্ম করবো।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশির রাজশাহী অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত ডিডি ড. শরমিন ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, আমি এ বিষয়ে কোনো মনত্মব্য করবো না। যেহেতু বিষয়টা নিয়ে তদনত্ম চলছে। তবে আমি বলবো, সবগুলো অভিযোগই মিথ্যা। আর আমার বদলিটা শাসিত্মমূলক ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে যখন অনিয়মে জড়িত হিসেবে আমার নাম এসেছিল, আমি এর প্রতিবাদ করেছিলাম। মাউশির পড়্গ থেকে তদনত্ম করা হয়েছিল। সেখানে আমার কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি।