এফএনএস: বেসরকারি আইসিডি ব্যবহারের মাশুল বাড়ানো হয়েছে। আমদানি-রফতানিকারকরা এর বিরোধিতা করলেও পহেলা আগস্ট থেকে তা কার্যকর হচ্ছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোটস অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) পৰ থেকে বর্ধিত মাশুল কার্যকরের বিষয়টি মন্ত্রণালয় ও ব্যবহারকারীদের চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে। আইসিডি মালিকদের ওই সংগঠন কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে আগের চেয়ে ২৫ শতাংশ বর্ধিত মাশুল বা চার্জ কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছে। তবে আইসিডি ব্যবহারকারীরা এ সিদ্ধান্ত মানতে রাজি নন। তাদের মতে, মন্ত্রণালয় ও আমদানি-রফতানিকারকদের পাশ কাটিয়ে একতরফাভাবে বর্ধিত মাশুল কার্যকর করা হচ্ছে। বিকডা এবং আমদানি-রফতানি বাণিজ্য সংশিৱষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
সংশিৱষ্ট সূত্র মতে, বেসরকারি আইসিডি নীতিমালা অনুযায়ী মাশুল বাড়ানোর এখতিয়ার বিকডার নেই। কারণ তাতে আমদানি-রফতানি ব্যয় আগের চেয়ে অনেক বেড়ে যাবে। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা। ইতিমধ্যে আমদানি-রফতানি ব্যবসায়ীরা বর্ধিত মাশুল স’গিত চেয়ে মন্ত্রণালয়ে পাল্টা চিঠি পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তাছাড়া বিকডার সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ। সংগঠনটির পৰ থেকে সিদ্ধান্ত বাতিলের পদক্ষেপ নিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও কাস্টমস কমিশনারকে চিঠি দেয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, প্রাইভেট আইসিডির মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রফতানি হওয়া পণ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই হ্যান্ডলিং হয়। রফতানিকারকরা ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যানে পণ্য বন্দরের আশপাশে গড়ে ওঠা আইসিডিগুলোতে এনে বোঝাই করে। পরে সেখান থেকে রফতানি কনটেইনার বন্দরে নিয়ে জাহাজে তোলা হয়।
পুরো প্রক্রিয়াটি বেশ কটি ধাপে সম্পন্ন হয়। যার জন্য সংশিৱষ্ট আইসিডি রফতানিকারকের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে মাশুল নিয়ে থাকে। আর আমদানি পণ্যের ২১ শতাংশ বন্দর থেকে আইসিডিতে নেয়া হয়। শুল্কায়ন শেষে সেগুলো আমদানিকারকরা নিয়ে যায়। তাছাড়া আইসিডিগুলো খালি কনটেইনারও সংরক্ষণ এবং পরিবহন করে থাকে।
সূত্র আরো জানায়, ২০১৬ সালের আইসিডি নীতিমালা অনুযায়ী আইসিডির মাশুল নির্ধারণের দায়িত্ব ট্যারিফ কমিটির। ওই কমিটির সিদ্ধান্ত ছাড়া মাশুল বাড়ানো যাবে না। প্রথমদিকে ট্যারিফ কমিটি ছিল না। এ সুযোগে আইসিডি মালিকরাই মাশুল নির্ধারণ করে। পরবর্তী সময়ে ট্যারিফ কমিটি গঠিত হলেও ওই কমিটির যৌক্তিকতা নিয়ে বিকডা বিভিন্ন সময় প্রশ্ন তোলে। পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথা বলে বিকডা চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে ১৯টি আইসিডিতে বর্ধিত মাশুল কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছিল।
তাতে আপত্তি জানায় ওসব আইসিডির মাধ্যমে পণ্য পরিবহনকারী ব্যবসায়ীরা। বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ীদের বিরোধিতার মুখে তখন মাশুল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত স’গিত রাখে বিকডা। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে তখন বলা হয়েছিল- মাশুল বৃদ্ধির বিষয়টি যৌক্তিক কিনা তা ট্যারিফ কমিটি যাচাই-বাছাই করে দেখবে। কিন’ ট্যারিফ কমিটির কাজ চলমান থাকাবস’ায়ই আবারো বর্ধিত মাশুল কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছে বিকডা।
এদিকে বিকডার পৰ থেকে বলা হচ্ছে, বর্ধিত মাশুল কার্যকরের বিষয়টি জানিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও ট্যারিফ কমিটিকে ২৫ জুলাই ই-মেইলে এবং ২৮ জুলাই ডাকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তাতে মাশুল বৃদ্ধির যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়েছে। খালি কনটেইনারের ৪টি, রফতানি কনটেইনারের ৬টি ও আমদানি কনটেইনারের ২টি ক্যাটাগরি মিলিয়ে ১২টি ক্যাটাগরিতে হ্যান্ডলিং মাশুল বাড়ানো হয়েছে।
যা আগের মাশুলের চেয়ে প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। আইসিডিগুলো চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে মাশুল বাড়াতে চেয়েছিল। কিন’ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একটি সভায় দর বাড়ানো থেকে বিরত থাকতে বিকডাকে অনুরোধ করা হয়। ওই কারণে তখন দর বাড়ানো হয়নি। ওই সময় বলা হয়েছিল- দরবৃদ্ধির বিষয়টি ট্যারিফ কমিটির মাধ্যমে বিবেচনা করে দ্র্বত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
আইসিডির ট্যারিফ নির্ধারণে ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি ও চট্টগ্রাম বন্দরের অধীন তিনটি কমিটি করা হয়েছে, যাতে সেবাগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। কিন’ গত চার মাসে ট্যারিফ কমিটির কর্মকা-ে বিকডা হতাশ। ওই কমিটি মাশুল নির্ধারণের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি। এ অবস’া অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। তাই বর্ধিত ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয় করার উদ্দেশে বিকডা আগামী ১ আগস্ট থেকে বর্ধিত মাশুল কার্যকর করতে যাচ্ছে, যা গত ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর করার কথা ছিল।
অন্যদিকে আইসিডি ব্যবহারকারী বিভিন্ন পক্ষ বলছে, আইসিডি মালিকপক্ষ একতরফাভাবে মাশুল বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। এটা বেআইনি। আমদানি-রফতানিকারকরা এ ঘোষণা মানবে না। এর বির্বদ্ধে মন্ত্রণালয়ে পাল্টা চিঠি দিতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। বিকডার কর্মকা-ের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সংশিৱষ্টতা রয়েছে। এ বিষয়ে একটি নীতিমালাও রয়েছে।
আইসিডি কর্তৃপক্ষ চাইলেই তাদের ইচ্ছেমতো মাশুল বাড়াতে পারে না। মাশুল বাড়ানোর পেছনে যদি কোনো যৌক্তিক কারণ থাকে, তাহলে তা তুলে ধরতে পারে। এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা হতে পারে। ট্যারিফ কমিটিও এ নিয়ে কাজ করছে। তারা ট্যারিফ কমিটিকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কাউকে কিছু না জানিয়ে নেয়া একতরফা সিদ্ধান্ত কার্যকর করা যাবে না। কারণ এ মুহূর্তে মাশুল বাড়ালে আমদানি-রফতানি ব্যয় বাড়বে। তাতে ব্যবসা-বাণিজ্যে। প্রধানমন্ত্রী যেখানে ব্যবসা ব্যয় কমানোর কথা বলছেন, সেখানে তারা তা বাড়াতে পারে না। বিকডা যেন বাড়তি মাশুল কার্যকর করতে না পারে সে জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চেয়ে ব্যবসায়ীদেও পৰ থেকে শিগগিরই চিঠি পাঠানো হবে। তবে ইতিমধ্যে আইসিডির মাশুল বৃদ্ধির চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ। বিকডার এ সিদ্ধান্ত বাতিলের পদক্ষেপ নিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও কাস্টমস কমিশনারকে চিঠি দিয়েছেন বিজিএমইএ।
বিকডা সভাপতি নুর্বল কাইয়ুম খান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে বলেন, বিশাল বিনিয়োগ এবং অপারেশনাল ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রতিটি আইসিডি আর্থিক র্বগ্নতার মধ্যে রয়েছে। আইসিডির সেবাগুলোর বিপরীতে বর্তমানের সেবামাশুল বিশাল অঙ্কের অপারেশনাল ব্যয় এবং আইসিডির সামগ্রিক ব্যবসা পরিচালনার জন্য যথেষ্ট নয়।
একই বিষয়ে চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম জানান, কিছু নিয়ম-কানুনের ভিত্তিতে আইসিডিগুলো ব্যবসা পরিচালনার জন্য লাইসেন্স নিয়েছে। যদিও তারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিন’ তাদেরকে তো একটি সরকারি কর্তৃপক্ষের অধীন থেকে কাজ করতে হবে।