এফএনএস: একজন যুগ্ম সচিবের গাড়ির অপেক্ষায় ফেরি ছাড়তে তিন ঘণ্টা দেরি হওয়ায় অ্যাম্বুলেন্সে থাকা এক স্কুলছাত্রের মৃত্যুর অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্তে কমিটি করে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব শাহনওয়াজ দিলর্ববা খানের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব শাহ হাবিবুর রহমান হাকিম। তদন্ত কমিটিকে আগামি সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে গতকাল সোমবার নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
নড়াইলের কালিয়া পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র তিতাস গত বৃহস্পতিবার সড়ক দুর্ঘটনায় গুর্বতর আহত হলে তাকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছিলেন স্বজনরা। সেদিন রাত ৮টায় অ্যাম্বুলেন্সটি যখন কাঁঠালবাড়ি ১ নম্বর ফেরিঘাটে পৌঁছায় তখন কুমিলৱা নামে একটি ফেরি ওই ঘাটেই ছিল। কিন’ সরকারের এটুআই প্রকল্পে দায়িত্বরত যুগ্ম সচিব আবদুস সবুর ম-লের গাড়ি যাবে- এই নির্দেশনা থাকায় ফেরি ছাড়তে দেরি করে ঘাট কর্তৃপক্ষ। শেষ পর্যন্ত রাত ১১টার দিকে যুগ্ম সচিবের গাড়ি ঘাটে পৌঁছানোর পর ফেরি ‘কুমিলৱা’ রওনা হয়। কিন’ মাঝ নদীতে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যায় ১১ বছর বয়সী তিতাস। তার পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, তারা পুলিশ, বিআইডবিৱউটিএকে ফেরি ছাড়ার অনুরোধ করলেও কাজ হয়নি। এমনকি সরকারি জর্বরি সেবার ফোন নম্বর ৯৯৯ এ ফোন করা হলেও ফেরি ছাড়েনি। তিতাসের মামা বিজয় ঘোষ বলেন, আমার বোন ফেরির লোকদের পায়ে ধরে মাটিতে পড়ে কেঁদেছে। তবু ওরা ফেরি ছাড়েনি। উল্টো বলেছে ফেরি ছাড়লে নাকি তাদের চাকরি থাকবে না। তারা বলেছে ভিআইপি আসবে। আর আমাদের রোগী যে মরে যাচ্ছে, সেদিকে তাদের কোনো নজর নেই। ঘাটের ব্যবস’াপক মো. সালাম হোসেন মিয়া বলেন, ডিসি স্যার আমাকে জানান, ভিআইপি যাবেন। ফেরি যেন আগে না ছেড়ে যায়। তবে আমি তখন ঘাটে ছিলাম না। আমাদের স্টাফকে বলে দিই ভিআইপি আসার কথা। পরে সেখানে কী হয়, তা আমার জানা নেই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নদীতে স্রোত বেশি থাকায় ফেরি পারাপারে এখন দ্বিগুণ সময় লাগে। তাছাড়া রাতে তেমন একটা ফেরি চলে না। তাই ঘাটে যানজট কমবেশি থাকেই। তবে আমরা অ্যাম্বুলেন্সসহ জর্বরি যাত্রীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পারাপারের ব্যবস’া করে দিই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, সরকারের এটুআই প্রকল্পের যুগ্ম সচিব আবদুস সবুর ম-ল পিরোজপুর থেকে ঢাকা যাচ্ছিলেন। তিনি কাঁঠালবাড়ি ঘাটে যাওয়ার আগে আমার কাছে ফেরিতে যাওয়ার বিষয়টি জানান। পরে আমি ঘাটের ব্যবস’াপক সালামকে জানাই। কিন’ ওই ঘাটে অ্যাম্বুলেন্সে একজন গুর্বতর আহত রোগী আছে, তা আমি জানতাম না। ঘাটের ম্যানেজার এ বিষয় আমাকে কিছু জানাননি। পরে গত রোববার বিষয়টি জানতে পারলাম। সরকারি কর্মকর্তা বা ভিআইপিদের জন্য ফেরি বিলম্বিত করার কোনো নিয়ম আছে কি না জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, তিনি (আবদুল সবুর ম-ল) চাঁদপুরের সাবেক জেলা প্রশাসক। এ ছাড়া তিনি যুগ্ম সচিব। তাই তাকে ভিআইপি বলা যায়। এই ধরনের কর্মকর্তারা এই নৌপথে এলে তাদের বিশেষভাবে গুর্বত্ব দেওয়া হয়। মাদারীপুরের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শহীদুল হক পাটোয়ারিকে আহ্বায়ক করে গঠিত চার সদস্যের ওই কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তিতাসের মৃত্যুর বিষয়টি জানিয়ে যুগ্ম সচিব আবদুস সবুর ম-লের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, এ বিষয়টি নিয়ে আমি বিব্রত এবং একই সাথে হতবাক। আমি যে কী পরিমাণ অস্বস্তির মধ্যে আছি, তা বলে বোঝাতে পারব না। আমি ফেরি আটকে রাখতে বলিনি। আমি শুধু বলেছি আমি যাব- একটা ব্যবস’া করতে। আমার কাছে কোনো সিদ্ধান্তও জানতে চাওয়া হয়নি। এদিকে আবদুস সবুর ম-লকে কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব লেখা হয়েছে, যা সঠিক নয় বলে জানানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে। সেখানে বলা হয়, প্রকৃতপক্ষে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও এর অধীনস্ত সংস’ায় আবদুস সবুর ম-ল নামে কোনো অতিরিক্ত সচিব বা যুগ্মসচিব বা কোনো কর্মকর্তা নেই। সেদিন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও এর অধীনস্ত সংস’ার ওই নামে কেউ কাঁঠালবাড়ি-শিমুলিয়া র্বটে ফেরি পারাপার হননি।