এফএনএস: চলমান বন্যায় দেশের যোগাযোগ ব্যবস’ায় ধাক্কা লেগেছে। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বন্যাক্রান্ত এলাকার সড়ক ও রেল যোগাযোগ। এখন পর্যন্ত গুর্বত্বপূর্ণ দেশের ১১টি মহাসড়ক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিতে মহাসড়ক ডুবে থাকায় কোনো কোনো অঞ্চলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। আবার অনেক জায়গায় পানি নেমে গেলেও চলা-চলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে ক্ষতিগ্রস্ত মহাসড়ক। আর দুর্গত এলাকার জেলা ও গ্রামীণ সড়কও চলে গেছে বেহাল দশায়। পাশাপাশি বিভিন্ন স’ানে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে রেলপথ। ফলে গুর্বত্বপূর্ণ ৮টি র্বটে ট্রেন চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। বন্ধ হয়ে পড়েছে একাধিক র্বট। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং বাংলাদেশ রেলওয়ে সংশিৱষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশিৱষ্ট সূত্র মতে, রাঙ্গামাটি, বান্দর-বান ও খাগড়াছড়ি সড়ক বিভাগের আওতাধীন খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি-বান্দরবান আঞ্চলিক মহাসড়কটির কয়েকটি অংশ পানিতে ডুবে আছে। একই অবস’ায় রয়েছে কেরানীহাট-বান্দরবান জাতীয় মহাসড়কও। চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি জাতীয় মহা-সড়কটির ৫৮তম কিলোমিটারে কলাবাগান নামক স’ানে মাটি ধসে গেছে। এখানে সাময়িক তৎপরতার অংশ হিসেবে এসক্যাভেটর দিয়ে পানির গতিপথ পরিবর্তন ও প্যালা-সাইডিং স’াপন করে ক্ষতিগ্রস্ত স’ানটি ঝুঁকিমুক্ত করেছে রাঙ্গামাটি সড়ক বিভাগ। তাছাড়া সুনামগঞ্জ-জামাল-গঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের কয়েকটি স’ান পানিতে তলিয়ে গেছে। বন্যায় যান চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে পার্শ্ববর্তী নেয়ামতপুর-তাহিরপুর ও কচিরঘাটি-বিশ্বম্ভরপুর আঞ্চলিক মহাসড়কেও। সিলেট-মৌলভীবাজারের গুর্বত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মহাসড়কটি তিন থেকে চারটি স’ানে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। শেরপুর-জামালপুর মহা-সড়কের পোড়ার দোকান নামক স’ানে সড়কের প্রায় তিন ফুট ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বন্যার পানি। এ অংশটিতে ঝুঁকি নিয়ে চলছে যান-বাহন। পারাপারে নৌকাও ব্যবহার করছেন স’ানীয়রা। সিলেট-গোয়াইন-ঘাট মহাসড়কের ১১তম কিলো-মিটারের বারকিপুরে বন্যায় একটি বেইলি ব্রিজ ভেঙে গেছে। ফলে এ পথে বন্ধ রয়েছে যান চলাচল। ক্ষতিগ্রস্ত সেতুটি মেরামতের জন্য বন্যার পানি কমা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলে জানিয়েছেন স’ানীয় সড়ক বিভাগের প্রকৌশলীরা। কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস’ায় চলে গেছে শ্যামপুর-দুর্গাপুর মহাসড়কও।
সূত্র জানায়, বিগত ২০১৭ সালের বন্যায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল রংপুর-কুড়িগ্রাম জাতীয় মহাসড়ক। পরবর্তী সময়ে মহা-সড়কটি সংস্কার করা হলেও সামপ্রতিক বন্যায় কাউনিয়া এলাকায় ফের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স’ান দিয়ে ছোট ছোট যানবাহন কোনো রকমে চলাচল করলেও ভারী যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়েছে। বন্যায় পঞ্চগড়ের করতোয়া নদীর ওপর নির্মিত সেতুর এক প্রান্তের এক্সপ্যানশন জয়েন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স’ানটি এরই মধ্যে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা পরিদর্শনও করেছেন। এর বাইরে বন্যায় নির্মাণাধীন যশোর-খুলনা জাতীয় মহাসড়কটিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর-তারা-কান্দি সড়কের একাংশ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। এ কারণে সড়কটি দিয়ে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়েছে। সড়কটি মেরামতে সেনাবাহিনী ও পানি উন্নয়ন বোর্ড যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে। গুর্বত্বপূর্ণ এসব মহাসড়ক ছাড়াও দুর্গত এলাকার জেলা ও গ্রামীণ সড়কগুলোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনো বন্যাদুর্গত ২১ জেলার অনেক গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে ডুবে রয়েছে। গাইবান্ধা শহরের পিকে বিশ্বাস রোড, সান্তারপট্টি রোড, স্টেশন রোডের কাচারীবাজার থেকে পুরনো জেলখানা পর্যন্ত, ভিএইড রোড, ডেভিড কোম্পানী-পাড়ার দুটি সড়ক, মুন্সিপাড়া শহীদ মিনার সংলগ্ন সড়ক, ব্রিজ রোড কালিবাড়িপাড়া সড়ক, কুটিপাড়া সড়ক, পূর্বপাড়া সড়ক, একোয়া-স্টেটপাড়া সড়ক, বানিয়ারজান সড়ক, পুলিশ লাইন সংলগ্ন সড়ক পানিতে ডুবে রয়েছে। কুড়িগ্রামে ৭২ কিলোমিটার কাঁচা ও ১৬ কিলোমিটার পাকা রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় দেশের কোথায় কী পরিমাণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার তথ্য সংগ্রহ করছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। এর পাশাপাশি বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উদ্ভূত বিরূপ পরিসি’তি পর্যবেক্ষণ, তথ্য সংগ্রহ, অভিযোগ গ্রহণসহ মাঠ পর্যায়ে নির্দেশনা প্রদানের জন্য সওজ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষও খোলা হয়েছে। বন্যার কারণে যেসব স’ানে সড়ক-মহাসড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেসব স’ানে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড টানানোরও উদ্যোগ নিয়েছে অধি-দপ্তর।
সূত্র আরো জানায়, বন্যার প্রভাবে সড়কপথের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স’ানে রেলপথও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণে অন্তত ৮টি র্বটে ট্রেন চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ বাজার সেকশন ও জামালপুর-তারাকান্দি সেকশনের সরিষাবাড়ী-বয়ড়া স্টেশনের মধ্যবর্তী স’ানে রেললাইন বন্যার পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এ কারণে আন্তঃনগর তিস্তা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস ট্রেনসহ ঢাকা, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে ছেড়ে আসা সব ট্রেন দেওয়ানগঞ্জ বাজার ও তারাকান্দি পর্যন্ত চলাচল না করে জামালপুর স্টেশন পর্যন্ত চলছে। আর পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের বাদিয়া-খালী রোড-ত্রিমোহনী জংশন স্টেশনের মধ্যবর্তী স’ানে রেললাইন বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে ঢাকা-লালমনিরহাট র্বটে চলাচল করা লালমনি এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঢাকা-সান্তাহার-বগুড়া-বোনারপাড়া-কাউনিয়া-লালমনিরহাট র্বটের বদলে ঢাকা-সান্তাহার-পার্বতীপুর-লালমনিরহাট র্বট দিয়ে চলাচল করছে। একইভাবে রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঢাকা-সান্তাহার-বগুড়া-বোনারপাড়া-কাউনিয়া-রংপুর র্বটের বদলে ঢাকা-সান্তাহার-পার্বতীপুর-রংপুর র্বট দিয়ে যাতায়াত করছে। আন্তঃনগর দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস ট্রেনটি দিনাজপুর-সান্তাহার-দিনাজ-পুর র্বটের বদলে দিনাজপুর-গাইবান্ধা-দিনাজপুর র্বটে এবং আন্তঃ নগর করতোয়া এক্সপ্রেস সান্তাহার-বুড়িমারী-সান্তাহারের বদলে সান্তা-হার-বোনারপাড়া-সান্তাহার দিয়ে চলাচল করছে। পদ্মরাগ এক্সপ্রেস ট্রেনটি বন্যার কারণে বাদিয়াখালী স্টেশনে আটকা পড়ায় বন্ধ হয়ে পড়েছে সান্তাহার-লালমনিরহাট-সান্তাহার র্বটের ট্রেন চলাচল। পাঁচপীর-উলিপুর স্টেশনের মাঝে রেললাইন পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ৪২১-৪২২ নম্বর লোকাল ট্রেন পার্বতীপুর-কুড়িগ্রাম-পার্বতীপুর ও ৪১৫-৪১৬ নম্বর লোকাল ট্রেন তিস্তা জংশন-কুড়িগ্রাম-তিস্তা জংশন র্বটে চলাচল করছে।
এদিকে সড়ক-মহাসড়কে বন্যার প্রভাব প্রসঙ্গে সওজ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পৱ্যানিং অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স উইং) আশরা-ফুল আলম জানান, বন্যা মোকা-বেলায় সব সময়ই সওজ অধিদপ্তর প্রস’তি নিয়ে রাখে। প্রস’তি দুই ধরনের। একটা বন্যা-পূর্ববর্তী সম-য়ের জন্য। এ সময় যেসব স’ানে বন্যার কারণে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়, সেসব স’ানে সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবেলায় কাজ করেন অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা। এর বাইরে বন্যা-পরবর্তী সময়ে যত দ্র্বত সম্ভব ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামত করে চলাচলের উপযোগী করতে। বন্যা মোকাবেলায় সওজর সক্ষমতা বেড়েছে। অর্থ বরাদ্দেও কোনো কমতি নেই। তবে কিছু এলাকা এখনো বন্যার পানিতে তলিয়ে আছে। পানি না কমানো পর্যন্ত সেখানে কাজ করা কঠিন। তার পরও বন্যাদুর্গত এলাকাগুলো কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পরিসি’তি পর্যবেক্ষণ ও জর্বরি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
অন্যদিকে একই প্রসঙ্গে রেলপথমন্ত্রী নূর্বল ইসলাম সুজন জানান, বন্যার কারণে দেশের বিভিন্ন স’ানে রেলপথ পানিতে তলিয়ে গেছে। এ কারণে কয়েকটি র্বটে ট্রেন চলাচল কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে। তবে যাত্রীদের কথা বিবেচনায় রেখে সম্ভাব্য সব বিকল্প র্বট ব্যবহার করা হচ্ছে। বন্যা মোকাবেলায় রেলওয়ের প্রকৌশলীরা সার্বক্ষণিক মাঠপর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছে।