সোনালী ডেস্ক: নওগাঁ, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জে বন্যার পানি কমে যাচ্ছে , কিনত্মু বেড়ে যাচ্ছে বন্যার্তদের দুর্ভোগ। দুর্গত এলাকায় খাবার পানি ও গো-খাদ্যের সঙকট দেখা দিয়েছে। বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল।
মান্দা (নওগাঁ) প্রতিনিধি জানান, বসতবাড়ি থেকে নেমে গেছে বন্যার পানি, কিনত্মু দুর্ভোগ বেড়েছে। পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধসে পড়েছে উপজেলার নূরুলস্নাবাদ ইউনিয়নের চকহরি নারায়ণ গ্রামের আশরাফুল ইসলামের মাটির তৈরি তিনটি ঘর। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গত দু দিন ধরে রাত কাটছে খোলা আকাশের নিচে। একই অবস্থা হয়েছে দড়্গিণ চকবালু গ্রামের হোসেন আলীর, বনকুড়া গ্রামের আলতাফ হোসেন, আলাউদ্দিন ও কুকিলা বেওয়ার। বসতবাড়িতে বন্যার পানি উঠায় বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের ভরট্ট শিবনগর গ্রামের দেলবর হোসেনের দেয়ালের বাড়িটিও ধসে পড়েছে। বন্যার সময় আশ্রয় নিয়েছিলেন প্রতিবেশির ইটের তৈরি বাড়ির দোতালায়। ভরট্ট শিবনগর গ্রামের কৃষক বেলাল হোসেন বলেন, ‘বন্যার পানি নেমে গেছে। কিনত্মু মাঠের পানি নামতে আরও সময় লাগবে। ফলে পাটসহ মাঠের কোনো ফসলই এই এলাকার কৃষকের ঘরে উঠবে না। বীজতলা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আমনও রোপন করতে পারবে না দুর্গত এলাকার কৃষক। এতে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাবে।’
সোমবার বন্যাদুর্গত বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের দাসপাড়া, ভরট্ট শিবনগর, চককামদেব, কয়লাবাড়ি, কশব ইউনিয়নের দড়্গিণ চকবালু ও বনকুড়া গ্রাম ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বন্যার পানিতে তাদের ফসলি জমি থেকে শুরম্ন করে বসতভিটা পস্নাবিত হওয়ায় ব্যাপক ড়্গয়ড়্গতি হয়েছে। বন্যার পানি সরে গেলেও তাদের যে ড়্গতি হয়েছে তা সহজে পূরণ হবে না। মানুষের কাজকর্ম নেই। এ অবস্থায় খেটে খাওয়া মানুষের দিন কাটছে চরম কষ্টে। স্থানীয় আব্দুল জব্বার, আনোয়ার হোসেনসহ আরও অনেকে জানান, বন্যার পানি নেমে গেছে। এখন দ্রম্নত ভাঙন স্থানটি মেরামত করা প্রয়োজন। বাঁধটি বাধা হলে কৃষকরা আমন ধান রোপণ করে ড়্গয়ড়্গতি পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবে।
বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য গোলাম আযম বলেন, তার ওয়ার্ডের চারটি গ্রামের প্রায় ৯০ ভাগ বাড়িতে পানি ঢুকে অনত্মত ৪০০ পরিবার বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। তারা এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে। দুর্গত এলাকার লোকজন খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। সরকারিভাবে যেটুকু সহায়তা পাওয়া গেছে চাহিদার তুলনায় তা একেবারেই অপ্রতুল। বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমার ইউনিয়নের ১৩টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়। এতে ৩ হাজার ৭ শ ৯৩ পরিবার বন্যায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। বন্যার্ত মানুষের মাঝে দ্রম্নত ত্রাণ দেয়া প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, বন্যায় ড়্গতিগ্রসত্ম মানুষের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ চলছে। কাল-পরশু ইউএনও কার্যালয়ে তা জমা দেয়া হবে।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ইতোমধ্যে দুর্গত ৬ শ পরিবারের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে ড়্গতিগ্রসত্ম প্রত্যেক পরিবারেই ত্রাণ সহায়তা দেয়া হবে।
উলেস্নখ্য, মান্দা উপজেলার কশব ইউনিয়নের চকবালু নামকস্থানে আত্রাই নদীর ডান তীরের বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে বিসত্মীর্ণ এলাকা পস্নাবিত হয়। উপজেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্যানুসারে এবারের বন্যার পানিতে ৯ শ ৩০ হেক্টর জমির রোপা আমন ধানের বীজতলা ও শস্য খেত তলিয়ে গেছে। ১ শ ৫০টি পুকুর ও জলাশয়ের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। ২৫টি শিড়্গাপ্রতিষ্ঠানের শিড়্গাকার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এছাড়া ৭টি ব্রিজ-কালভার্ট, ৭টি পাকা রাসত্মার ৫২ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার আংশিক ড়্গতিগ্রসত্মসহ ১ শ ৬৫টি নলকূপ ও ২০০ টি শৌচাগার ড়্গতিগ্রসত্ম হয়েছে।
বগুড়া প্রতিনিধি জানান, বগুড়ায় যমুনা নদীতে পানি কমছে । অন্য দিকে বাঙালিনদীসহ জেলার অধিকাংশ নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ফলে ওইসব অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবতিত রয়েছে। গত কয়েক দিনে যমুনার পানি কমে সোমবার বিকাল পর্য়নত্ম বিপদ সীমার ৪৩ সে. মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে । অন্যদিনে বাঙালি ও করতোয়াসহ জেলার বিভিন্ন নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ফলে জেলার শেরপুরে নতুন নতুন এলাকা পস্নাবিত হবার খবর মিলেছে। কয়েক ঘণ্টায় বাঙালিনদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে এখন বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ।
এদিতে গত ১৩ জুলাই থেকে লাগাতার বৃষ্টিপাত ও উজানের পাহাড়ি ঢলে যমুনানদীতে পানি বৃদ্ধি পেতে থাকে । পানি এক সময় রেকর্ড ভেঙে বিপদসীমার প্রায় ১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। জেলার ৩ উপজেলা সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনটের প্রায় দেড় লাখ মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে । প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায় । বর্তমানে নদীর পানি কমলেও গোটা অঞ্চলে খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় পানিবাহিত রোগের আশঙকা করা হচ্ছে। কয়েক দিনে বন্যার্তদের মধ্য সরকারিভাবে বিতরণ করা হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই কম ।
বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় পূর্ব বগুড়ায় এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শুকনো খাবার ও নগদ অর্থ এবং জীবন রড়্গাকারী ওষুধ । এদিকে পাশাপাশি গবাদি পশুর খাদ্য পরিস্থিতিও উদ্বগজনক বলে জানা গেছে ।
এদিকে সোমবার বিকেলে বগুড়া সার্কিট হাউজে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির এক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলা প্রশাসক ফয়েজ উদ্দিনের সভাপতিত্বে ওই সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এনামুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম ও স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নান। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব শাহ কামালসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সভায় অংশ নেন।
সভায় বগুড়া জেলা প্রশাসক ফয়েক আহম্মেদ জেলায় চলতি বন্যা পরিস্থিতি সমপর্কে ব্রিফিংকালে জানান, বর্তমানে জিআর খাতে ১৮৪ মেট্রিক টন চাল ও নগদ অর্থ ৫০ হাজার টাকা অবশিষ্ট রয়েছে। এই অর্থ ও ত্রাণ দ্রুত ফুরিয়ে যাবে। তিনি বর্ন্যাতদের জন্য অন্যান্য বরাদ্দ এবং গবাদি পশুর জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দের কথা বলেন। তিনি আরো জানান বাঙালি ও যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় পস্নাবিত হয়েছে। সারিয়াকান্দি, সোনাতলা, ধুনট উপজেলার ২২টি ইউনিয়নের ১৭৯টি গ্রাম। নদী ভাঙনের কারনে এ পর্যনত্ম ড়্গতিগ্রসত্ম হয়েছে সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার ২০৫টি ঘরবাড়ি। সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার ৯৫০টি ঘরবাড়ি আংশিক ড়্গতিগ্রসত্ম হয়েছে। ৩৬৯২ জন বানভাসী মানুষ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয়ে নেয়ার পাশাপাশি বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে ১১ হাজার ৬০০ জন বন্যা দুর্গত। সভায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব শাহ কামাল জানান, এ পর্যনত্ম জেলায় ৭১৭ মেট্রিক টন জিআর চাল, ৩ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার ও নগদ অর্থ সহায়তা বরাদ্দ দেয়া আছে সাড়ে ১১ লাখ টাকা। প্রয়োজনে আরও ত্রাণ ও অর্থ বরাদ্দ ছাড় করা হবে বলে জানান তিনি। এসময় প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এনামুর রহমান বলেন, জেলার জন্য সরকারি ৫০০ পিচ তাঁবু পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনে প্রয়োজনে আরো শুকনো খাবার ও তাঁবু পাঠানো হবে। সভায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালযের উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম বলেন, বগুডায় বাঙালি, নাগর ও যমুনানদীর ভাঙনরোধ করতে সরকার বেশ কিছু পরিকল্পনা নিয়েছে। এই পরিকল্পনাগুলো বাসত্মবায়ন হলে ভবিষ্যতে জেলায় বন্যার ঝুঁকি কমে যাবে।
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বন্যার পানি ঢুকে সিরাজগঞ্জের ৫টি উপজেলার ২৮২টি শিড়্গাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে গেছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ৭টি শিড়্গাপ্রতিষ্ঠান। জেলা শিড়্গা অফিস জানায়, বন্যা কবলিত এসব শিড়্গা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২১৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৬৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। আর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ৬টি প্রাথমিক ও ১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। জেলা প্রাথমিক শিড়্গা কর্মকর্তা সিদ্দিক মোহাম্মদ ইউসুফ রেজা বলেন, জেলার ৫টি উপজেলার ২১৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। এসব বিদ্যালয়ের পাঠদান বন্ধ রয়েছে। তিনি বলেন, বন্যা কবলিত প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে কাজিপুরে ৮৬, চৌহালিতে ১৯, সিরাজগঞ্জ সদরে ২৫, শাহজাদপুরে ৬৫, এবং বেলকুচি উপজেলায় ২০টি রয়েছে।