সোনালী ডেস্ক: চলিস্নশ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমানকে গ্রেফতার দেখানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল রোববার ঢাকা সিনিয়র স্পেশাল জজ কে এম ইমরম্নল কায়েশ শুনানি শেষে এই আদেশ দেন। এর আগে, ১৬ জুলাই দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বরখাসত্ম পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির ও ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিরম্নদ্ধে দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ মামলাটি করেন দুদক পরিচালক শেখ মো. ফানাফিল্যা।
মামলার এজাহারে বাদী বলেন, দুদকের বরখাসত্ম পরিচালক বাছির নিজে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য ডিআইজি মিজানের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন। মিজান দুর্নীতির অভিযোগ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য বাছিরকে ঘুষ দিয়েছেন। আর এসব করে দু’জন-ই দ-বিধির ১৬২/১৬৫ (ক)/১০৯ ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ এর ৫ (২) ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ৪ (২)(৩) ধারায় শাসিত্মযোগ্য অপরাধ করেছেন। ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ অনুসন্ধানকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, নথিপত্র পর্যালোচনা, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) ফরেনসিক প্রতিবেদন ও প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের বক্তব্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, মিজানের বিরম্নদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দুদকে অনুসন্ধানের জন্য গৃহীত হয়।
অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গত বছরের ২৫ নভেম্বর বাছিরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি কাজ শুরম্ন করেন গত বছরের ২৯ নভেম্বর। অনুসন্ধান চলাকালে চলতি বছরের ৯ জুন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় খবর সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার হয় যে, মিজান তার বিরম্নদ্ধে চলা অনুসন্ধান প্রভাবিত করতে দুদক পরিচালক বাছিরকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন। বিষয়টি দুদকের নজরে আসলে উচ্চ পর্যায়ের তদনত্ম কমিটি গঠন করা হয়। তদনত্ম কমিটি তাৎক্ষণিকভাবে বাছিরের বক্তব্য নেয়। পরে ঘুষ নেওয়ার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত বলে প্রতিবেদন দাখিল করে। পরে গত ১৩ জুন বিষয়টি অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়।
অনুসন্ধানকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংশিস্নষ্টদের বক্তব্য, এনটিএমসি হতে বিশেষজ্ঞ মতামত ও পারিপার্শ্বিক বিষয় পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, মিজান ১৫ জানুয়ারি একটি বাজারের ব্যাগে কিছু বইসহ পঁচিশ লাখ টাকা নিয়ে রমনা পার্কে যান এবং বাছিরের সঙ্গে আলোচনা করেন। একপর্যায়ে আলোচনা শেষে দু’জনই রমনা পার্ক থেকে বের হয়ে শাহজাহানপুর এলাকায় যান। এ সময় মিজান টাকার ব্যাগটি বাছিরের হাতে দেন। এরপর ২৫ ফেব্রম্নয়ারি মিজান দ্বিতীয় দফায় ১৫ লাখ টাকা বাছিরকে দেওয়ার জন্য আবারও রমনা পার্কে যান। সেখানে দু’জন আলোচনা শেষে পার্ক থেকে বেরিয়ে শানিত্মনগর যান। সেখানে শপিং ব্যাগে নিয়ে আসা ১৫ লাখ টাকা বাছিরকে দিয়ে শানিত্মনগর থেকে চলে যান মিজান।
এজাহারে বলা হয়েছে, বাছির ও মিজানের বিভিন্ন সময়ের কথোপকথন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাছির তার ছেলেকে ঢাকার কাকরাইলের উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল থেকে আনা নেওয়ার জন্য মিজানের কাছে একটি গাড়ি দাবি করেছেন। গাড়ি চাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বিভাগীয় তদনত্ম টিমের কাছে বক্তব্যও দিয়েছেন বাছির। এজাহারে বলা হয়, ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সংগৃহীত/প্রাপ্ত রেকর্ডপত্র, এনটিএমসি’র কাছ থেকে পাওয়া বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদন ও সাক্ষীদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে আরও দেখা যায়, মিজান ও বাছির উভয়ে বেআইনিভাবে দুটি পৃথক সিম ব্যবহার করে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। ওই সিম দুটি মিজানের বডিগার্ড মো. হৃদয় হাসান ও অর্ডারলি মো. সাদ্দাম হোসেনের নামে কেনা হয়।
মিজানের ভাষ্যমতে, তিনি ০১৪০১৯৪৪৯১৫ নম্বরের সিমটি ব্যবহারের জন্য বাছিরকে একটি স্যামসাং মোবাইল কিনে দেন। অনুসন্ধানকালে এনটিএমসি’র প্রতিবেদন ও সাক্ষীদের বক্তব্য বিশেস্নষণ করে দেখা যায়, ০১৪০১৯৪৪৯১৫ সিমটি একটি স্যামসাং মোবাইলে ব্যবহৃত হয়েছে। যার মডেল স্যামসাং এসএম – বি৩১০ই, স্যামসাং কোরিয়া, জিএসএম ৯০০, জিএসএম ১৮০০। মোবাইলটি ডিআইজি মিজানের বডিগার্ড হৃদয় হাসান বিগত ৯ জানুয়ারি বনানী সুপার মার্কেট থেকে কিনেছেন। মিজানের ভাষ্যমতে, ০১৪০১৯৪৪৯১৫ সিমটি তার বডিগার্ড হৃদয় হাসানের নামে তারই নির্দেশে, তারই টাকায় কেনা হয়েছে। মোবাইল অপারেটরদের দেওয়া তথ্যে মতে, সিমটি হৃদয় হাসানের নামে জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। মিজানের বডিগার্ড হৃদয় ৯ জানুয়ারি বনানী সুপার মার্কেট থেকে সিমটি কেনেন। পরে ১০ জানুয়ারি মিজান সিমসহ মোবাইল সেটটি বাছিরকে দেন। অন্যদিকে মিজানও তার অর্ডারলি সাদ্দাম হোসেনের নামে সিম (০১৯৭৪৫৫৬৫৫১) কেনেন। এবং তা দিয়ে বাছিরের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রাখতেন। তারা এক অপরের মধ্যে এসএমএস চালাচালিও করতেন।
অনুসন্ধানকালে আরও প্রমাণিত হয়, মিজান অসৎ উদ্দেশ্যে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ঘুষ লেনদেনের কথোপকথন রেকর্ড করে সংরক্ষণ করেছেন এবং পরবর্তীতে গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। অভিযোগ অনুসন্ধানকালে, বিশেষজ্ঞ মতামত, প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের বক্তব্য, অডিও রেকর্ডে উভয়ের কথোপকথন ও পারিপার্শ্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে প্রমাণিত হয় যে, নিজে অভিযোগের দায় হতে বাঁচার জন্য মিজান অসৎ উদ্দেশ্যে ঘুষ দিয়ে বাছিরকে প্রভাবিত করেছেন।
এজাহারে আরও উলেস্নখ করা হয়েছে, বাছির সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দুদক থেকে পাওয়া দায়িত্ব পালন করেননি। অসততার প্রমাণ দিয়েছেন। যা দ-বিধির ১৬১ ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২) (৩) ধারায় শাসিত্মযোগ্য অপরাধ। একইভাবে মিজানও সরকারি কর্মকর্তা হয়ে নিজের বিরম্নদ্ধে উঠা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার আশায় অর্থাৎ অনুসন্ধানের ফলাফল নিজের পক্ষে নেওয়ার অসৎ উদ্দেশ্যে বাছিরকে প্রভাবিত করেছেন। যা দ-বিধির ১৬৫ (ক) ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) (৩) ধারায় শাসিত্মযোগ্য অপরাধ।
এমতাবস্থায়, বাছির ও মিজানের বিরম্নদ্ধে দ-বিধির ১৬১/১৬৫ (ক)/১০৯ ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) (৩) ধারায় একটি নিয়মিত মামলা রম্নজু করার জন্য অনুরোধ করা হলো। মিজান ও বাছির একে অপরকে প্রভাবিত করার সময়কাল : গত বছরের ২৯ অক্টোবর থেকে এ বছরের জুন পর্যনত্ম। প্রসঙ্গত, ঘুষ কেলেঙ্কারির ঘটনায় ১৫ জুলাই কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে মিজানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। আর ১০ জুলাই এ বিষয়ে আইনজীবী অ্যাডভোকেট কামাল হোসেনের মাধ্যমে দুদকে লিখিত বক্তব্য জমা দেন বাছির। মিজান ও বাছিরের ঘুষ লেনদেনের ঘটনায় দুদকের অনুসন্ধান কমিটি গঠন হয় ১৩ জুন। তিন সদস্যের এ কমিটির প্রধান দুদক পরিচালক শেখ মো.ফানাফিল্যাহ। অন্য দুই সদস্য হলেন-সংস্থাটির সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান ও মো. সালাউদ্দিন।