স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার শ্রমিক নেতা নুরম্নল ইসলাম হত্যা মামলাটি পুলিশ ভিন্নখাতে নিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিহত নুরম্নলের মেয়ে নিগার সুলতানার অভিযোগ, পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাকিল উদ্দিন আহমেদ মামলার এজাহার বদলে দিয়েছেন।
এ নিয়ে তিনি ওসির বিরম্নদ্ধে রাজশাহীর পুলিশ সুপার (এসপি) শহিদুলস্নাহর কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। একইসঙ্গে মামলাটি বাতিলের জন্য তিনি আদালতে আবেদন করেছেন। গত ১৮ জুলাই তিনি এসপির কাছে অভিযোগ করেন। একই দিন রাজশাহীর জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট ও আমলী আদালত-২ এ মামলা বাতিলের আবেদন করেন নিগার সুলতানা।
গত ১১ জুন পুঠিয়ার কাঁঠালবাড়িয়া এলাকার একটি ইটভাটা থেকে উপজেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি নুরম্নল ইসলামের (৫৪) লাশ উদ্ধার করা হয়। এরপর ১৮ জুন জেলা পুলিশ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, নুরম্নল ইসলামের সমকামিতার বদ অভ্যাস ছিল। এলাকার এক কিশোরকে তিনি এ কাজে বাধ্য করতেন। ১০ জুন রাতেও নুরম্নল ইসলাম ওই কিশোরের সঙ্গে সমকামিতায় লিপ্ত হন। একপর্যায়ে পড়ে গেলে ওই কিশোর তাকে ইটের আঘাতে হত্যা করে। তাই ওই কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তবে নিহতের পরিবার বিষয়টিকে বলছে ভিত্তিহীন।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ২৪ এপ্রিল উপজেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে নুরম্নল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এই নির্বাচনে পুঠিয়া থানার ওসি ড়্গমতার অপব্যবহার করে নুরম্নলকে পরাজিত করান। ফলে সাধারণ সম্পাদক হন আবদুর রহমান পটল। এই ফলাফলের বিরম্নদ্ধে নুরম্নল ইসলামসহ পরাজিত তিনজন প্রার্থী আটজনকে আসামি করে আদালতে মামলা করেন। আদালত শ্রমিক ইউনিয়নের সমসত্ম কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
নুরম্নল ইসলাম যে রাতে খুন হন সেদিনই আদালতের জারিকারক উপজেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যালয়ে গিয়ে আদালতের এ নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তার সঙ্গে নুরম্নল ইসলামও ছিলেন। তখন আসামিদের সঙ্গে তার বাকবিত-া হয়। এরপর রাত সাড়ে ৮টা থেকে নুরম্নল ইসলামের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পর দিন সকালে ইটভাটায় নুরম্নল ইসলামের লাশ পাওয়া যায়।
এ ঘটনার পর নিহতের মেয়ে নিগার সুলতানা নির্বাচনি মামলাটির তিনজন আসামিসহ মোট পাঁচজনের নাম উলেস্নখ করে পুঠিয়া থানায় একটি হত্যা মামলার এজাহার দেন। তখন ওসি সেটা সংশোধন করতে বলেন। নিগার সুলতানা ওসির কথামতো সংশোধন করে ওই পাঁচজনকে সরাসরি আসামি না করে ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে তাদের নাম উলেস্নখ করেন। এরপর সেটা ওসিকে দিলে তিনি ‘ দেখছি’ বলে নিগারকে বাসায় চলে যেতে বলেন। কিন্তু নিগার সুলতানার একটি এজাহারও মামলা হিসেবে রেকর্ড করেননি ওসি।
নিহতের শ্যালক মাসুদ রানা দাবি করেন, ওসি সাকিল উদ্দিন আহমেদ নিগার সুলতানার কাছ থেকে একটি সাদা কাগজে স্বাড়্গর নিয়ে রেখেছিলেন। সেই কাগজেই পরবর্তীতে মামলার এজাহার করা হয়। এতে কারও নাম নেই। সেই মামলাটিই এখন তদনত্ম করছে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। এ মামলাটিতেই এক কিশোরকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ওসি এজাহার বদলে দেয়ার কারণে নিহতের স্ত্রী সাজেদা বেগম বাদী হয়ে ছয়জনকে আসামি করে আদালতে একটি মামলা করেন। আদালত মামলাটি গ্রহণ করেন। কিন্তু একটি ঘটনার ওপর দুটি মামলা চলতে পারে না বলে পরে মামলাটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। এর পরিপ্রেড়্গিতে গত ১৮ জুলাই নিগার সুলতানা আদালতে গিয়ে বলেন, তাকে পুঠিয়া থানার যে মামলায় বাদী হিসেবে দেখানো হয়েছে সে মামলার এজাহার তার দেয়া নয়। এটা ওসির মনগড়া এজাহার। তাই তিনি মামলাটি বাতিলের আবেদন করেন। একইসঙ্গে তিনি তার মায়ের দায়ের করা মামলাটির কার্যক্রম শুরম্নর জন্য আদালতে আবেদন করেন। রোববার পর্যনত্ম আদালত এ ব্যাপারে কোনো আদেশ দেননি। আদেশ পরে হবে বলে জানা গেছে।
নিগার সুলতানা বলেন, তার বাবার লাশ যেখানে পড়ে ছিল সেখানে ঘটনার দিন গিয়েছিলেন শ্রমিক নেতা আবদুর রহমান পটল। তখন এই হত্যাকা-ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে সাধারণ শ্রমিকরা তাকে লাঞ্ছিত করেছিলেন। এ ঘটনায় পটলের ভাগ্নে শফিউল ইসলাম পর দিন থানায় ২২ জনকে আসামি করে মামলা করেন। এ মামলায় তাদের পরিবারেরই পাঁচজনকে জড়ানো হয়েছে। এ মামলায় তারা হয়রানি হচ্ছেন। অথচ তার বাবার হত্যাকা-ের সঙ্গে পটলের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে তারা মনে করেন। পুলিশ বিষয়টি গুরম্নত্ব না দিয়ে তাদের বিরম্নদ্ধে দায়ের করা মামলাটির প্রতিই বেশি গুরম্নত্ব দিয়ে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নিচ্ছে।
এজাহার বদলে দেয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পুঠিয়া থানার ওসি সাকিল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সাদা কাগজে সই নিয়ে এজাহার করা সম্ভব না। যে এজাহার হয়েছে সেটা নিহতের পরিবারের সদস্যরাই দিয়ে গেছেন। এজাহার আমরা দেইনি। নিহতের পরিবারের সদস্যদের বিরম্নদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রসঙ্গে ওসি বলেন, ওই মামলার এখনও অগ্রগতি নেই। তদনত্ম চলছে।
জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) ইফতেখায়ের আলম বলেন, নুরম্নল হত্যার ঘটনায় পুঠিয়া থানার একটি মামলার তদনত্ম প্রায় শেষ। আমাদের জেলা ডিবি পুলিশের একজন পরিদর্শক মামলাটির তদনত্ম কর্মকর্তা। ইতিমধ্যে এ মামলায় এক কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তদনত্ম কর্মকর্তা সঠিকভাবেই তদনত্ম করছেন। মামলাটি বাতিলের আবেদনের বিষয়ে তিনি বলেন, আবেদন হতেই পারে। সেটা আদালতের সিদ্ধানেত্মর ব্যাপার। আর পুঠিয়ার ওসির বিরম্নদ্ধে যে অভিযোগ হয়েছে সেটা তারা তদনত্ম করে দেখবেন বলেও জানান জেলা পুলিশের এই কর্মকর্তা।