রিমন রহমান: ক’দিন আগেও রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পানি শুকিয়ে জেগে উঠেছিল বিসত্মীর্ণ চর। তবে সেই চর এখন ডুবে যাচ্ছে পানিতে। দিন যত যাচ্ছে, ততই ফুলে ফেঁপে উঠছে পদ্মা। বাড়ছে স্রোত। সেই স্রোতের তোড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে জেলার পবা, গোদাগাড়ী, চারঘাট ও বাঘা উপজেলার কিছু কিছু এলাকায়।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, গত ১৩ জুলাই থেকে পানি দ্রম্নত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ওই দিন সন্ধ্যা ৬টায় পদ্মার পানির উচ্চতা পাওয়া যায় ১২ দশমিক ৪২ মিটার। এরপর থেকে পানি বাড়তে বাড়তে গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৫৭ মিটার। সন্ধ্যা ৬টায় আরও বেড়ে হয় ১৫ দশমিক ৬০ মিটার। রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পানির বিপদসীমা ১৮ দশমিক ৫০ মিটার।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের গেজ রিডার এনামুল হক জানান, রাজশাহী মহানগরীর মাস্টারপাড়া কলোনীর সামনে পদ্মা গার্ডেনে তিনি প্রতিদিন তিন বেলা পানির উচ্চতা রেকর্ড করেন। তিনি দেখছেন, গত ১ জুলাই থেকে নদীর পানি একটু একটু করে বাড়তে শুরম্ন করেছে। ৫ জুলাই সন্ধ্যা ৬টায় পানি পাওয়া যায় ১০ দশমিক ৩১ মিটার। পরদিন ৬ জুলাই পানি একটু কমে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ২৮ মিটার।
কিন্তু ৭ জুলাই থেকে আর পানি কমেনি। প্রতিদিনই বাড়ছে। ৭ জুলাই সন্ধ্যায় পানির উচ্চতা ছিল ১০ দশমিক ৩৪ মিটার। আর ৮ জুলাই সন্ধ্যায় ছিল ১০ দশমিক ৪৮ মিটার, ৯ জুলাই ১০ দশমিক ৭৬, ১০ জুলাই ১০ দশমিক ৯৯, ১১ জুলাই ১১ দশমিক ৩৭, ১২ জুলাই ১১ দশমিক ৭৭, ১৩ জুলাই ১২ দশমিক ৪২, ১৪ জুলাই ১৩ দশমিক ০৫, ১৫ জুলাই ১৩ দশমিক ৮০ এবং ১৬ জুলাই ১৪ দশমিক ৬২ মিটার।
এনামুল হক জানান, বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় পানির উচ্চতা ছিল ১৫ দশমিক ১৮ মিটার। এর আগে সকাল ৬টায় ছিল ১৪ দশমিক ৯০ মিটার। বুধবার ভোর থেকে গতকাল ভোর পর্যনত্ম ২৪ ঘণ্টায় পানি বেড়েছে ৫৪ সেন্টিমিটার। আর গতকাল ভোর ৬টা থেকে বেলা ৩টা পর্যনত্ম পানি বেড়েছে ১৩ সেন্টিমিটার। গতকাল বেলা ৩টায় পানির উচ্চতা পাওয়া গেছে ১৫ দশমিক ৫৭ মিটার। সন্ধ্যা ৬টায় পাওয়া গেছে আরও তিন সেন্টিমিটার বেশি।
রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছিল ২০০৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর। সেদিন পানির সর্বোচ্চ উচ্চতা ছিল বিপদসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার বেশি ১৮ দশমিক ৮৫ মিটার। এরপর আবার ২০১৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পদ্মা বিপদসীমা অতিক্রম করেছিল। সেদিন পানির উচ্চতা দাঁড়িয়েছিল ১৮ দশমিক ৭০ মিটার। তবে ২০০৪ থেকে ২০১২ সাল পর্যনত্ম টানা ৮ বছর পদ্মার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেনি। এবার যেভাবে পানি বাড়ছে তাতে বিপদসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা করছেন পদ্মাপাড়ের বাসিন্দারা।
তবে বন্যার আশঙ্কা করছে না জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার দপ্তর। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আমিনুল হক বলেন, আমরা বন্যার তেমন আশঙ্কা করছি না। তবে পদ্মার তীরবর্তী বাঘা, চারঘাট ও গোদাগাড়ীর চরাঞ্চলের কিছু অংশ তলিয়ে যেতে পারে। তার জন্য আমাদের প্রস্তুতি আছে।
ত্রাণ কর্মকর্তা আমিনুল হক জানান, জেলার ৯টি উপজেলায় ইতিমধ্যে ২ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার পাঠানো হয়েছে। প্রতি প্যাকেটে রয়েছে ১০ কেজি চাল, ১ কেজি ডাল, ১ কেজি লবণ, ১ লিটার সয়াবিন তেল, ১ কেজি চিড়া ও ২ প্যাকেট নুডুলস। এছাড়া হাতে রয়েছে ২০০ মেট্রিক টন চাল এবং পর্যাপ্ত নগদ টাকা। বন্যা হলে আরও ত্রাণ সামগ্রী পাওয়া যাবে বলেও জানান তিনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে পাড়ে গিয়ে দেখা গেছে, নদীতে স্রোত বইছে। রাজশাহী মহানগরীর বুলনপুর থেকে নবগঙা পর্যনত্ম প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় পানি শহররক্ষা বাঁধ ছুঁয়েছে। তার ভেতরেই চলছে আই-বাঁধ নির্মাণের শেষ মূহুর্তের কাজ। আজ শুক্রবারের মধ্যে কাজটি শেষ হওয়ার কথা জানিয়েছেন সেখানকার শ্রমিকরা।
অন্যদিকে, পানির চাপে জেলার পবা উপজেলার সোনাইকান্দি এলাকায় পদ্মা তীর রক্ষা প্রকল্পের নির্মিত নতুন বাঁধে ধস নেমেছে। সোনাইকান্দি আই গ্রোয়েনের পাশে নতুন নির্মিত বাঁধে এ ধস নামে। ওই এলাকা দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে নির্মাণের পর বাঁধে এই ধস নেমেছে বলে জানিয়েছেন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আফিস আহমেদ জানান, বাঁধে ধস নামায় বালুর বসত্মা ও মাটি ফেলে রাখা হয়েছে। আগামী শুকনো মৌসুমের আগে এটি আর নির্মাণ করা সম্ভব নয়। তবে ওই স্থানের ধস আর যেন বাড়তে না পারে তার জন্য রক্ষাণাবেক্ষণ কাজ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।