স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী জেলায় বছরে প্রায় ৮১ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়। কিন্তু জেলার চাহিদা প্রায় ২৩ হাজার মেট্রিক টন। চাহিদার উদ্বৃত্ত এই মাছ চলে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকায়। ট্রাকভর্তি পানিতে জীবনত্ম থেকেই মাছগুলো যায় ঢাকা। মৎস্য দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, জীবনত্ম মাছ পাঠানোর ড়্গেত্রে রাজশাহী এখন আদর্শ।
রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দেবীপুর গ্রামের মাছ চাষি আবদুল আওয়ালের পুকুর রয়েছে ৮টি। এর মধ্যে তিনটি পুকুর নিজের। বাকিগুলো ইজারা নেওয়া। আটটি পুকুরের আয়তন ১৩০ বিঘা। বছরে প্রায় দুই হাজার মণ মাছ উৎপাদন করেন তিনি। স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে আওয়ালের বেশিরভাগ মাছ যায় ঢাকা। আর তাজা মাছ পাঠানোর জন্য দামও পান বেশি। এতে তিনি লাভবান হন।
আওয়াল জানান, বিশেষ কায়দায় ট্রাকে পানি ভর্তি করে রাখা হয়। পুকুরে মাছ ধরেই তা ওই পানিতে ছেড়ে দেয়া লাগে। একটি ট্রাকে ২৫ থেকে ৩০ মণ জীবনত্ম মাছ পাঠানো যায়। গাড়ি ভাড়া লাগে ১৬ হাজার টাকা। আনুষাঙ্গিক অন্যান্য খরচ ধরলে মোট খরচের পরিমাণ ২০ হাজার টাকা। কিন্তু এই টাকা ঢাকায় গিয়েই উঠে যায়। অন্য মাছের চেয়ে ঢাকার বাজারে জীবনত্ম মাছের দাম পাওয়া যায় কেজিতে ৫০ থেকে ৬০ টাকা বেশি। জীবনত্ম মাছ পাঠানোই লাভ বেশি বলেই জানান তিনি।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা অলক কুমার সাহা বলছেন, শুধু আবদুল আওয়ালই নয়, রাজশাহীর বেশিরভাগ চাষি জীবনত্মভাবে ঢাকায় মাছ পাঠান। তারা এ জন্য চাষিদের উদ্বুদ্ধ করেন। জীবনত্ম মাছ পাঠানোর জন্য কেউ ফরমালিনের ব্যবহার করেন না। ফলে রাজশাহীর মাছের সুনাম অড়্গুণ্ন থাকে। এখন রাজশাহীর দেখাদেখি পাশের নওগাঁ, নাটোর এবং বগুড়ার চাষিরাও জীবনত্ম মাছ ঢাকায় পাঠাচ্ছেন।
আর রাজশাহীর মধ্যে প্রথমে জীবনত্ম উপায়ে মাছ পাঠানো শুরম্ন করেন জেলার পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের চাষিরা। পারিলা গ্রামের মাছ চাষি সোহরাব হোসেন শুরম্নটা করেছিলেন ২০ বছর আগে। তিনি জানান, ১৯৯৮ সালে তিনি এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাস করতে পারেননি। তাই চাকরিও হয়নি। ১০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরম্ন করেন মাছ চাষ। সফলও হন। ১০-১২ কেজি ওজনের মাছও উৎপাদন হয় তার পুকুরে। কিন্তু এত বড় মাছ নিয়ে বাজারে গেলে ক্রেতারা বলত, বিদেশ থেকে আমদানি করা মাছ। কেউ বিশ্বাস করতে চায় না, এটা পারিলার পুকুরের মাছ। সোহরাব ভাবেন, জীবনত্ম মাছ নিয়ে বাজারে যেতে পারলে কেউ আর বলতে পারবে না আমদানির মাছ।
তিনি জানান, প্রথমে পানিভর্তি ড্রামে করে রাজশাহীর বাজারে নিয়ে যান তাজা মাছ। এবার ক্রেতাদের চোখ তার মাছের দিকে। আগের তুলনায় কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি দাম পাওয়া গেল। আসেত্ম আসেত্ম বগুড়া ও ঢাকায় ভালো বাজার খুঁজে পান। এখন ট্রাকে করেই তাজা মাছ নিয়ে যান। সোহরাব জানান, মাছ ঢাকা পাঠাতে ট্রাকের ভেতর মোটা পলিথিন বা ত্রিপল বিছিয়ে পানি ভরা হয়। অঙিজেনের ঘাটতি মেটাতে একটা খালি পাতিলের ভেতর পা ঢুকিয়ে ট্রাকের ওপর বসে সেটার সাহায্যে অনবরত ঢেউ দিতে হয়। রাজশাহী থেকে ঢাকার মতো দূরত্বে নেওয়ার জন্য পথে একবার পানি বদল করতে হয়। তিনি প্রথমে জীবনত্ম মাছ পাঠানোর যে উপায় আবিষ্কার করেন তা পরে পুরো ইউনিয়ন, এরপর পুরো জেলা এবং জেলা ছাড়িয়ে পাশের জেলাগুলোর চাষিরাও শুরম্ন করেছেন।
গতকাল বুধবার থেকে শুরম্ন হয়েছে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০১৯। এ উপলড়্গে সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কড়্গে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে মৎস্য দপ্তর। সেখানে জানানো হয়, মাছ চাষে সারাদেশের মধ্যে রাজশাহীর অবস্থান ষষ্ঠ। এ জেলায় বছরে মাছের চাহিদা ৫৮ হাজার ৮১৮ দশমিক ৭৫ মেট্রিক টন। তবে উৎপাদন হয় ৮০ হাজার ৮৯৯ দশমিক ৭৯৫ মেট্রিক টন। জেলার চাহিদা মিটিয়ে ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে উদ্বৃত্ত প্রায় ২২ হাজার ৮১ মেট্রিক টন মাছ। এসব মাছের প্রায় সবটাই যাচ্ছে জীবনত্ম উপায়ে। এর ফলে চাষিরা ভাল দাম পাচ্ছেন। লাভবান হচ্ছেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, রাজশাহীতে পুকুর রয়েছে ৪১ হাজার ৮৭৬টি। এসবের আয়তন ৭ হাজার ২৯৪ হেক্টর। আর ৩ হাজার ৪৬২ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিক খামার রয়েছে ৬ হাজার ১০৮টি। এছাড়া ৩৭০ হেক্টর জমিতে ২২৯টি বারোপিট, ২ হাজার ২২৫ হেক্টর জমিতে ১৬০টি খাল, ৭ হাজার ৪৬৪ হেক্টর জমিতে ৬৭টি বিল এবং ১০ হাজার ২৭৫ হেক্টর জমির পস্নাবন ভূমিতে মাছ উৎপাদন হয়। এছাড়া ৯ হাজার ১৬০ হেক্টর আয়তনের জেলার ১১টি নদী থেকেও পাওয়া যায় মাছ। সবমিলিয়ে জেলায় মোট জলাশয় রয়েছে ৪৮ হাজার ৫৩১টি। মোট আয়তন ৩৯ হাজার ২৫২ হেক্টর।
রাজশাহীর বিপুল পরিমাণ জলাশয়ে মাছের পোনার চাহিদা মেটাতে সরকারি-বেসরকারি হ্যাচারিতে রেনু এবং পোনার উৎপাদনও শুরম্ন হয়েছে। রাজশাহীতে সরকারি হ্যাচারি রয়েছে দুটি। আর বেসরকারি ১৩টি। এছাড়াও বেসরকারিভাবে গড়ে উঠেছে ১৬১টি নার্সারি। এসবে রেণুর উৎপাদন হয় ৮ দশমিক ৮৫৮ মেট্রিক টন। তবে জেলার চাহিদা ৭ দশমিক ৫৬০ মেট্রিক টন। বাকি ১ দশমিক ২৯৮ মেট্রিক টন রেণু পাঠানো হয় জেলার বাইরে। পোনার উৎপাদনেও রয়েছে উদ্বৃত্ত।
ইদানিং জেলার গোদাগাড়ী, বাঘা ও বাগমারা উপজেলায় নদীতে খাঁচায় মাছ চাষও শুরম্ন হয়েছে। আর মৎস্য অধিদপ্তর গবেষণা করে দেখেছে, শুধু কার্প কিংবা রম্নই জাতীয় মাছই নয়; রাজশাহীর পুকুরেই সম্ভব গলদা চিংড়ির চাষ। এই চিংড়িও জীবনত্মভাবে পাঠানো যাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে। তাই রাজশাহী সদর হ্যাচারিতে গলদার পোনা উৎপাদন শুরম্ন হয়েছে। আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যেই এসব পোনা পুকুরে চাষের উপযোগী হয়ে উঠবে।
সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক শামসুজ্জোহা, উপ-পরিচালক হাসান ফেরদৌস, দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক পারভেজ রায়হানও উপস্থিত ছিলেন। তারা জানান, সরকারের প্রচেষ্টায় রাজশাহীতে মাছ চাষ দিন দিন বাড়ছে। এই মূুহূর্ত জেলার ১৮ হাজার ২৭ জন চাষি বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করছেন। তাদের প্রায় সবাই স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি ঢাকায় মাছ পাঠাচ্ছেন জীবনত্মভাবে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা অলক কুমার সাহা জানান, প্রতিদিন প্রায় ২৫০টি ট্রাকে রাজশাহী থেকে জীবনত্ম মাছ পাঠানো হয়। প্রতি ট্রাকে ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি মাছ থাকে। এভাবে মাছ পাঠানোর কারণে চাষিরা ব্যাপকভাবে লাভবান হন। আবার তাজা মাছের কারণে রাজশাহীর সুনামও অড়্গুণ্ন থাকে। তাই এবার মৎস্য সপ্তাহে তারা এ বিষয়ে আরও বেশি প্রচার-প্রচারণা চালাবেন।
মৎস্য সপ্তাহের দ্বিতীয় দিন আজ বৃহস্পতিবার বের করা হবে র‌্যালি। এ দিন জেলার শ্রেষ্ঠ মৎস্যচাষিদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ শেষে মাছের পোনাও অবমুক্ত করা হবে। তৃতীয় দিন আগামীকাল জেলার বাগমারা উপজেলায় আলোচনা সভা শেষে উদ্বোধন করা হবে মৎস্য মেলা। চতুর্থ দিন চলবে ফরমালিন বিরোধী অভিযান। এর পরদিন স্কুল-কলেজে অনুষ্ঠিত হবে মৎস্য চাষ বিষয়ক কুইজ প্রতিযোগিতা।
ষষ্ঠ দিনে হাটবাজারে মৎস্য চাষে উদ্বুদ্ধকরণ সভা অনুষ্ঠিত হবে। একইসঙ্গে প্রচার করা হবে প্রামাণ্যচিত্র। ২৩ জুলাই সপ্তম দিনে জেলার পবা উপজেলা পরিষদ হল রম্নমে আয়োজন করা হবে মূল্যায়ন ও সমাপনী অনুষ্ঠানের। জেলা ও উপজেলা মৎস্য দপ্তর, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন সমন্বিতভাবে সপ্তাহটি উদযাপন করবে। কর্মসূচি পালনে সহযোগিতা কামনা করা হয় সাংবাদিকদেরও।