এফএনএস: ভারি বর্ষণ ও উজানের ঢল অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশের প্রধান নদ-নদী অববাহিকায় পানি বেড়েই চলেছে। দেশের কমপড়্গে ২০টি জেলায় বন্যার বিসত্মৃতি ঘটেছে। দুর্গত মানুষের সংখ্যা অনত্মত ১১ লাখ বলে দুর্যোগ ব্যবস’াপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। বন্যায় রাসত্মাঘাট, ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ক্ষতিগ্রসত্ম হয়েছে। পানিতে ডুবে কুড়িগ্রামে পাঁচটি এবং জামালপুরে দুটি শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। আগামী ৭২ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও গঙ্গা-পদ্মা নদীতে পানি আরও বাড়বে বলে আভাস দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভুঁইয়া বলেন, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের পরিসি’তির আরও অবনতি হতে পারে। সেই সঙ্গে নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ ও সিলেটের পরিসি’তি সি’তিশীল থাকতে পারে। লালমনিরহাট, চট্টগ্রাম ও বান্দরবানে পরিসি’তির উন্নতি হতে পারে। সুরমা-কুশিয়ারা ছাড়া দেশের সব নদীর পানি বাড়ছে। দেশের ৯৩টি নদ-নদীর পানি সমতল স্টেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ৬৩টি পয়েন্টে পানি সমতল বৃদ্ধি ও ২৯টি পয়েণ্টে পানি হ্রাস পেয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যনত্ম গত ২৪ ঘন্টায় বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২৩ টি নদীর পানি বিপদ সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।সুরমা-কুশিয়ারা ব্যতিত দেশের সকল নদ-নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন ভারতের আসাম ও মেঘালয় প্রদেশসমূহের অনেক স’ানে অগামী ২৪ ঘন্টায় মাঝারী হতে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী ২৪ ঘন্টায় ব্রক্ষ্মপুত্র-যমুনা ও গঙ্গা-পদ্মা নদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে এবং আগামি ২৪ ঘন্টায় আত্রাই নদী, বাঘাবাড়ি ও পদ্মা নদী গোয়ালন্দ পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। আগামী ২৪ ঘন্টায় কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলায় বন্যা পরিসি’তির অবনতি হতে পারে। লালমনিরহাট, নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলায় বন্যা পরিসি’তি আগামি ২৪ ঘন্টায় উন্নতি হতে পারে। রোববার ১৪টি নদীর ২৫টি পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।পানি পরিসি’তি ১টি পয়েন্টে অপরিবর্তিত রয়েছে এবং ১টি পয়েন্টের কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। নদ-নদীর পরিসি’তি সম্পর্কে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীরণ কেন্দ্রের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আজ জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘন্টায় (গত সোমবার সকাল ৯ টা থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৯ টা পর্যনত্ম) বাংলাদেশে উলেস্নখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়নি। বন্যা পরিসি’তি নিয়ে প্রতিবেদকদের পাঠানো খবর:
উত্তরাঞ্চল: কুড়িগ্রামের বন্যায় ক্ষতিগ্রসত্ম ৯ উপজেলার পানিবন্দি এখন ২ লাখ ৯০ হাজার মানুষ। ৮৯৯ হেক্টর জমির ফসল, ৭১ কিলোমিটার রাসত্মা ও ২৭৭ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নানাভাবে ক্ষতিগ্রসত্ম হয়েছে। লালমনিহাটে ক্ষতিগ্রসত্ম হয়েছে ৫ উপজেলা। এখানকার ৯০৯৬টি পরিবার ক্ষতিগ্রসত্ম হয়েছে। নীলফামারীর ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার সাড়ে তিন হাজার মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রসত্ম। সরকারি হিসাবে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর উপজেলার ২০ ইউনিয়নের ১৬ হাজার পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রসত্ম হয়েছে। লালমনিরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আহসান হাবিব জানান, বন্যাক্রানত্ম লোকজনের জন্য এ পর্যনত্ম ২৪৫ মেট্রিক টন চাল, শুকনো খাবারের দেড় হাজার প্যাকেট ও সাড়ে চার লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সদর উপজেলার মোগলহাট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান হাবিব জানান, ধরলার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় মোগলহাট ইউনিয়নের ফলিমারী, খারম্নয়া ও ইটাপোতা গ্রামের বেশকিছু এলাকা পস্নাবিত হয়েছে। এতে প্রায় এক হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস’ায় রয়েছে। কুলাঘাট ইউপি চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলী জানান, ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কুলাঘাট ইউনিয়নের বনগ্রাম, শিবেরকুঠি, চর শিবেরকুঠি, বোয়ালমারী চর ও আলোকদীঘি গ্রামের প্রায় সাড়ে তিন হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। লালমনিরহাট কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিধু ভূষণ রায় জানান, বন্যায় জেলার ৩২৫ হেক্টর জমির রোপা আমন ও বীজতলা তলিয়ে গেছে। গাইবান্ধা জেলার ৭ উপজেলার ১ লাখ ৬৬ হাজারেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রসত্ম হয়েছে বন্যায়। ঘাঘট ও ব্রহ্মপুত্রের পানির তোড়ে গত সোমবার আরও তিনটি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে। এতে ৩১টি গ্রাম ও ওইসব এলাকার রাসত্মাঘাট এবং ফসল নতুন করে পানিতে ডুবে গেছে। জেলার বন্যাকবলিত চার উপজেলা সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও গাইবান্ধা সদরের ২১৩ গ্রাম পস্নাবিত হয়ে লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বন্যার্তরা বিভিন্ন বাঁধ, আশ্রয় কেন্দ্র, স্কুল ও মসজিদ-মাদ্রাসায় আশ্রয় নিয়েছেন। বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকটের সঙ্গে খাদ্য সংকটও দেখা দিয়েছে। গবাদি পশু-পাখি রাখা নিয়ে পড়তে হয়েছে বিপাকে। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক মোখলেছুর রহমান জানান, গত সোমবার রাতে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপৎসীমার ১১২ সেন্টিমিটার, ঘাঘট নদীর পানি বিপৎসীমার ৭৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং তিসত্মার পানি বিপৎসীমার ২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এদিকে, গত সোমবার ঘাঘট ও ব্রহ্মপুত্রের পানির তোড়ে ভেঙে গেছে চারটি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বিভিন্ন অংশ। এরমধ্যে গাইবান্ধা সদরের ঘাঘট নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের খোলাহাটি ইউনিয়নে কুঠারপাড়া এলাকায় ৫০ ফুট, গোদারহাট এলাকায় সোনাইল বাঁধের ১০০ ফুট ভেঙে গিয়ে ১৫ গ্রাম পস্নাবিত হয়েছে। অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্রের পানির তোড়ে সদর উপজেলার গিদারী ইউনিয়নের বাগুড়িয়া এলাকায় বাঁধের ১০০ ফুট অংশ ধসে গেছে, আর ফুলছড়ি উপজেলার কাতলামারী এলাকায় বাঁধ ভেঙে পস্নাবিত হয়েছে ১৬ গ্রাম। পানি ঢুকে যাওয়ায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ২৩৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাঠদান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ১২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। ফুলছড়ি উপজেলায় তিনটি ও গাইবান্ধা সদর উপজেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ইতোমধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বগুড়ায় বন্যায় ক্ষতিগ্রসত্ম ৯৮টি গ্রামের ৬৭ হাজার মানুষ দুর্ভোগে রয়েছেন। ৮ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রসত্ম হয়েছে। নদী ভাঙনে ৩৮৫টি বাড়ি ভেঙে গেছে। সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি বিপৎসীমার উপরে বইছে। এনায়েতপুরের ব্রাহ্মনগাতী, আড়কান্দি, হাটপাচিল ও কাজিপুর উপজেলার নাটুয়ারপাড়া, বাঐখোলা পাটাগ্রামসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে।
চট্টগ্রাম অঞ্চল: চট্টগ্রাম জেলার ক্ষতিগ্রসত্ম ১৪ উপজেলার মধ্যে সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, ফটিকছড়ির বেশিরভাগ ও অন্যান্য উপজেলা আংশিক পস্নাবিত হয়ে দুর্গত সাড়ে চার লাখ মানুষ। ৬৭৫টি বাড়ি সম্পূর্ণ ও ৯০৮৫টি আংশিক ক্ষতিগ্রসত্ম। সাতকানিয়া ও চন্দনাইশ উপজেলা মহাসড়ড়ের উপর দিয়ে ২ ফুট উচ্চতায় পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এ দু উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের সঙ্গে জেলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন প্রায়। চট্টগ্রামে চট্টগ্রাম জেলায় বন্যায় ২ জন ও নগরে পাহাড়ধসে ২ জন নিহত হয়েছেন। কক্সবাজারে ৭ উপজেলায় পানিবন্দি ৪১ হাজারেরও বেশি মানুষ। ১৭৪০ হেক্টর বীজতলা আংশিক ক্ষতিগ্রসত্ম হয়েছে। বান্দরবানে ক্ষতিগ্রসত্ম উপজেলা ৫টি। বান্দরবানের সঙ্গে চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। রম্নমা উপজেলায় নদীর স্রোতে ২ জন নিখোঁজ রয়েছে। খাগড়াছড়ির ১০৮টি গ্রাম ক্ষতিগ্রসত্ম। দুর্গত মানুষের সংখ্যা ৪০ হাজারেরও বেশি। রাঙামাটির বন্যা পরিসি’তির উন্নতি হয়েছে। জেলার ১০ উপজেলায় প্রায় ৬ হাজারের বেশি পরিবার ক্ষতিগ্রসত্ম। ফেনীর পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলার প্রায় দুই হাজার পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রসত্ম।
সিলেট অঞ্চল: সুনামগঞ্জে ক্ষতিগ্রসত্ম ৭ উপজেলার ১ লাখ ৪ হাজার লোক দুর্গত অবস’ায় রয়েছে। ১ হাজার ৩৮৫ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রসত্ম হয়েছে। সিলেটে ক্ষতিগ্রসত্ম ১২ উপজেলার ২ লাখ ৯৬ হাজার মানুষ এখন বন্যাদুর্গত। জেলায় ১ হাজার ১৫টি বাড়ি সম্পূর্ণ ও ৫ হাজার ৩৯৬টি বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রসত্ম হয়েছে। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কয়েকটি গ্রামে বন্যার পানি ঢুকেছে। বামনপাশায় নির্মাণাধীন ২০ মিটার বাঁধ ভেঙে গেছে। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলায় ৫ হাজার ৫০০ জন মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রসত্ম হয়েছে। রাসত্মাঘাট নষ্ট ও ফসলহানি রয়েছে। এছাড়া নেত্রকোণায় বন্যায় তিনটি উপজেলা ক্ষতিগ্রসত্ম হয়েছে। গত সোমবার সকালেও বজ্রপাতে কলমাকান্দায় একটি ছেলে মারা গেছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার হাওড়া নদীর বাঁধ ভেঙে অনত্মত ১৫টি গ্রাম পস্নাবিত হয়েছে।