এফএনএস: দেশে কর্মরত বীমা কোম্পানিগুলো তীব্র অসুস’ প্রতি-যোগিতায় লিপ্ত। আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে মিথ্যা প্রলোভনে গ্রাহক বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়েছে অধিকাংশ কোম্পা-নি। এমনিতেই দেশের অর্থনীতির আকারে বীমা কোম্পানির সংখ্যা বেশি। এমন পরিসি’তিতে নতুন বীমা কোম্পানিগুলো চরম সঙ্কটে পড়েছে। ওসব প্রতিষ্ঠানের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। ইতিমধ্যে অধিকাংশ কোম্পা-নির এ্যাকাউন্ট (হিসাব) নেতিবাচক হয়ে গেছে। ফলে বীমা কোম্পানি-গুলো ভয়াবহ আর্থিক সঙ্কটে পড়েছে। কয়েকটি কোম্পানি শুধুমাত্র নামেই টিকে রয়েছে। সামগ্রিকভাবে যা বীমা খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আর জনবলের অভাবে এসব কোম্পানির ওপর যথাযথ নজরদারি করতে পারছে না নিয়ন্ত্রক সংস’া ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপ-মেন্ট এ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি (আইডিআরএ)। এমন পরিসি’তিতে বীমা খাতে যে হারে অনিয়ম হচ্ছে, সে তুলনায় তাদের বির্বদ্ধে কার্যকর ব্যবস’া নেই বললেই চলে। ফলে বীমা কোম্পানিগুলো আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বীমা খাত সংশিৱষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশিৱষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে দেশে ৭৮টি বীমা কোম্পানি কার্যক্রম চালাচ্ছে। তার মধ্যে জীবন বীমা ৩০টি ও সাধারণ বীমা ৪৮টি। দুই খাত মিলিয়ে শেয়ারবাজারে তালিকা-ভুক্ত রয়েছে ৪৬টি কোম্পানি। বর্তমানে বীমা খাতে সম্পদের পরিমাণ ৩৫ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে জীবন বীমায় ২৯ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা ও সাধারণ বীমায় ৫ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। তবে প্রতারণার কারণে বিশাল এ খাতের প্রতি মানুষের আস’া নেই। ২০১০ সালে নতুন বীমা আইন হওয়ার পর পরিসি’তির কিছুটা উন্নতি হলেও ব্যাপক অনিয়ম রয়েছে। দেশে প্রতি হাজার মানুষের মধ্যে মাত্র চারজনের জীবন বীমা রয়েছে। ওই হিসেবে জীবন বীমার আওতায় মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র ৬০ লাখ মানুষ।
সূত্র জানায়, বিভিন্ন বীমা কোম্পানির ৫ বছরের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গড়ে মোট পলিসির অর্ধেক অর্থাৎ ৩০ লাখই প্রথম বছরে কিস্তি দেয়ার পর আর সচল থাকেনি। নতুন পলিসি খোলার জন্য জীবন বীমা কোম্পানির প্রতিনিধিরা যতোটা মনোযোগী, খোলার পর আর ততোটা মনোযোগী থাকে না। পাশাপাশি পলিসি গ্রাহকদেরও সচেতনতার অভাব রয়েছে। তাছাড়া কোম্পানিগুলোর বির্বদ্ধেও রয়েছে প্রতিশ্র্বতি ভঙ্গের অভিযোগ। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পর্যবেক্ষণের তথ্যানুযায়ী একশ্রেণীর অসাধু বীমা প্রতিনিধি গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে তা আত্মসাৎ করে দেয়। মূলত স্বল্পশিক্ষিত প্রতিনিধিরা মাঠপর্যায়ে বীমা পণ্য বিক্রিতে জড়িত। তারা বীমা সম্পর্কে মানুষকে আলোকিত না করে বরং প্রলুব্ধ করে। ফলে মানুষ অনেক ক্ষেত্রে প্রতারিত হচ্ছে। গ্রাহক প্রতারণায় দায়ি প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির আওতায় আনতে সমপ্রতি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে (আইডিআরএ) নির্দেশ দিয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
সূত্র আরো জানায়, দেশে ব্যবসারত সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলো উত্থা-পিত বীমা দাবির ৬০ শতাংশই পরিশোধ করছে না। বিগত ২০১৮ সাল শেষে কোম্পানিগুলোর তৈরি প্রতিবেদন থেকেই এমন তথ্য পাওয়া যায়। বর্তমানে দেশে ব্যবসা করছে ৪৬টি সাধারণ বীমা কোম্পানি। তার মধ্যে ৩৭টি কোম্পানির বীমা দাবি উত্থাপন ও পরিশোধ সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে। বীমা দাবি উত্থাপনের গত বছরের ডিসেম্বর মাস শেষে দাবির অর্থ পাননি এমন গ্রাহকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৬১৬ জন। ওই মাসটিতে বিভিন্ন কোম্পানিতে প্রক্রিয়াধীন বীমা দাবির সংখ্যা ছিল ৯ হাজর ৪২৯। এর মধ্যে ডিসেম্বর মাসে বীমা দাবির অর্থ পেতে আবেদন করেন এক হাজার ৯৮২ জন। বাকি ৮ হাজার ৫৩০ গ্রাহক ডিসেম্বর মাসের আগেই আবেদন করেছিলেন। আর ডিসেম্বর মাসে দাবির অর্থ পেয়েছেন এক হাজার ৮৮৯ জন। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস’া সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের (জেবিসি) দেশের সাত বিভাগের ৯টি অঞ্চলের ৬৮টি বিক্রয়কেন্দ্র ও ৩৫৪টি শাখা কার্যালয় রয়েছে। বর্তমানে সংস’াটিতে একক পলিসি রয়েছে তিন লাখ ৯৬ হাজার। তাছাড়া গ্র্বপ বীমা রয়েছে ২৪০টি প্রতিষ্ঠানের (এক লাখ ৪৩ হাজার সদস্য)। পাশাপাশি মেটলাইফ আলিকোর কার্যকর পলিসি সংখ্যা ১৩ লাখ ৭৯ হাজার। বিগত ১৯৭৩ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত জীবন বীমা ব্যবসায় জেবিসির অবস’ানই প্রথম ছিল। বর্তমানে আলিকো প্রথম। এর পরই রয়েছে ডেল্টা লাইফ, ন্যাশনাল লাইফ, প্রগতি লাইফ, মেঘনা লাইফ, রূপালী লাইফ, প্রগ্রেসিভ লাইফ, পপুলার লাইফ ও ফারইস্ট লাইফের অবস’ান।
এদিকে বিদ্যমান মোটরযান আইনে কোন গাড়ির বীমা না করে রাস্তায় চালানো যায় না। বীমা ছাড়া কেউ গাড়ি নামালে ট্রাফিক পুলিশের মামলাসহ নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। তবে আইনে গাড়ির জন্য দুই ধরনের বীমার সুযোগ রাখা হয়েছে। সেগুলো ফার্স্ট পার্টি এবং থার্ড পার্টি ইন্স্যুরেন্স। ফার্স্ট পার্টি ইন্স্যুরেন্স হলো দুর্ঘটনায় যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হলে বীমা কোম্পানি ওই যানবাহনের ক্ষতিপূরণ দেবে। এই ক্যাটাগরির ইন্স্যুরেন্সের জন্য গ্রাহক-কে পণ্যমূল্যের ৩ শতাংশ পর্যন্ত প্রিমিয়াম দিতে হয়। সেক্ষেত্রে কোন কারণে গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হলে নানা হয়রানির পর দাবির আংশিক নিষ্পত্তি করে কোম্পানিগুলো। আর থার্ড পার্টি ইন্স্যুরেন্স হলো, বীমা করা যানবাহনে তৃতীয় কোন ব্যক্তির ক্ষতি করলে কোম্পানি ওই তৃতীয় ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেবে। সেক্ষেত্রে বীমা গ্রহীতা কোন ক্ষতিপূরণ পাবে না। এ ধরনের প্রতিটি ইন্সুরেন্সে ৫শ’ থেকে ৬শ’ টাকা প্রিমিয়াম নেয় কোম্পানি-গুলো। আর আইনের বাধ্যবাধকতা এবং প্রিমিয়াম কম হওয়ায় অধিকাংশ গ্রাহক থার্ড পার্টি ইন্স্যুরেন্স করেই রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছে। তবে থার্ড পার্টি ইন্স্যুরেন্সের বিপরীতে ক্ষতিগ্রস্ত কারোর দাবি পূরণ করা হয়েছে, এ রকম কোন রেকর্ড নেই।
অন্যদিকে দেশের বীমা খাতের এমন পরিসি’তি প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশ্বে বীমা খাতের ব্যাপক গুর্বত্ব রয়েছে। কিন’ বাংলাদেশে বীমা খাতের প্রতি মানুষের এক ধরনের আস’ার সঙ্কট তৈরি হয়েছে। এর বড় কারণ হচ্ছে কোম্পানিগুলো শুধু প্রিমিয়াম নিতে অভ্যস্ত। কিন’ ক্ষতিপূরণ দেয়ার ক্ষেত্রে হয়রানি-অজুহাতের শেষ থাকে না। এ সঙ্কট কাটাতে হলে স্বচ্ছতা ফেরাতে হবে। তাছাড়া দেশে নতুন কোম্পানি অনুমোদনের আগে বিবেচনায় নেয়া উচিত ছিল আরো কোম্পানির প্রয়োজন আছে কিনা। পাশাপাশি আগের কোম্পানিগুলো ভালভাবে কাজ করছে কিনা সেটাও বিবেচ্য বিষয়। প্রয়োজনের বাইরে কোন কাজ করলে সেখানে বিশৃঙ্খলা হবেই। নিয়ন্ত্রক সংস’ার সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে। তা না হলে কোম্পানিগুলো স্বেচ্ছাচারিতা চালাবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ কবির হোসেন জানান, থার্ড পার্টি ইন্স্যুরেন্স হলো রাস্তায় গাড়ি নামানোর জন্য একটি আইনি স্বীকৃতি। এখানে কোন দাবি পূরণ হয় না। ফলে এ ধরনের বীমার কোন ভিত্তি নেই। বিশ্বের অনেক দেশে এই ধরনের বীমা নেই। কারণ যারা সচেতন তারাই এটি উঠিয়ে নিচ্ছে। আমরা নিজেরাও এটি উঠিয়ে নেয়ার পক্ষে।
একই প্রসঙ্গে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সদস্য গকুল চাঁদ দাস জানান, স্বীকার করতে আপত্তি নেই যে, নতুন বীমা কোম্পানির অবস’া খারাপ। কারণ এটি প্রতিযোগিতার বাজার। এখানে সক্ষমতা দিয়ে টিকে থাকতে হয়। নিয়ন্ত্রক সংস’ার পক্ষ থেকে ওসব কোম্পানিকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা করা হচ্ছে। তবে বীমা খাতে দীর্ঘদিন এক ধরনের আস’ার সঙ্কট তো রয়েছেই। এর কারণ হলো এ খাতের ইতিবাচক দিকগুলো প্রচার হয় না। কোম্পানি-গুলোর কার্যক্রম নজরদারির জন্য আইডিআরএ সাধ্যমতো চেষ্টা করছে। কিন’ জনবল সীমিত। বর্তমানে আইডিআর কার্যালয়ে মাত্র ৩৪ কর্মকর্তা রয়েছেন। আর ৪৬টি সাধারণ বীমা কোম্পানির জন্য মাত্র একজন কর্মকর্তা কাজ করছে। তবে জনবল বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।