এফএনএস: টানা বৃষ্টি আর ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি অস্বাভাবিক বেড়ে রংপুরের তিন উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের দুর্গম চরাঞ্চলের ৪০টি গ্রাম হাঁটু থেকে কোমড় পানিতে তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, রংপুরের গঙ্গাচড়া ও কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ৫৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পানি বাড়ায় চরাঞ্চলের শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান জানান, অবিরাম বৃষ্টি আর ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি গত চার দিন ধরে বাড়ছে। তবে পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে গত শুক্রবার দুপুর থেকে। তিনি জানান, গতকাল শনিবার দুপুর ১২টায় তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ৪৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির ফলে রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার ৪০টি গ্রাম পৱাবিত হয়ে পড়েছে।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কন্ট্রোল র্বম সূত্রে জানা গেছে, রংপুরের গঙ্গাচড়া ও কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ৫৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যদি বৃষ্টি অব্যাহত থাকে তাহলে আরও নতুন নতুন এলাকা পৱাবিত হতে পারে বলে কন্ট্রোল র্বমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোকলেসুর রহমান জানিয়েছেন। গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাছলিমা বেগম জানিয়েছেন, লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের পূর্ব ইছলিগ্রামে তিস্তা নদীর পানির তোড়ে সেতুর সংযোগ সড়ক ভেঙে গেছে। ফলে চারটি গ্রামের ১৫ হাজার মানুষ সড়ক পথে উপজেলা সদরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেতে পারছেন না।
গ্রামগুলো হচ্ছে পূর্ব ইছলী, পশ্চিম ইছলি, শংকরদাহ এবং বাগেরহাট। তিনি আরও জানান, গত শুক্রবার বেশকিছু এলাকায় পানিবন্দি মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এদিকে কোলকোন্দ ইউপি চেয়ারম্যান সালাম জানান, তিস্তা নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীভাঙন শুর্ব হয়েছে। গত দুই দিনে ১০ একর জমি নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। বিভিন্ন এলাকায় শত শত পরিবার পানিবন্দি অবস’ায় দুর্বিসহ দিন কাটাচ্ছে। তাদের উদ্ধার করার জন্য তিনি প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান। অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী মমতাজ উদ্দিন জানান, গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহলী, কচুয়া, আলমবিদিতর, গঙ্গাচড়া সদর এবং কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর, সদর ও পীরগাছা উপজেলার ছাওলা এবং তাম্বুলপুর এই কয়েকটি ইউনিয়নের তিস্তা নদী তীরবর্তী গ্রামগুলো তলিয়ে গেছে। এতে করে রবি শষ্যসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
এদিকে, লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর পানি ফুলেফেঁপে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গতকাল শনিবার সকালে ব্যারেজ পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ৫০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয় বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। পানির এই প্রবল চাপের কারণে তিস্তা ব্যারেজের বাইপাস ফ্ল্যাট গেইট স্বাভাবিকভাবে খুলে যাওয়ার কথা থাকলেও তা খুলেনি। এ কারণে গত শুক্রবার রাত থেকেই ব্যারেজ এলাকার লোকজনকে বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে বলে জেলা প্রশাসক মো. আবু জাফর জানিয়েছেন। যত সময় যাচ্ছে পানি তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় লালমনিরহাটের নতুন নতুন এলাকা পৱাবিত হচ্ছে।
এরইমধ্যে অর্ধলাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। চরাঞ্চলের রাস্তা ভেঙে পানি প্রবেশ করেছে বিভিন্ন লোকালয়ে। গত শুক্রবার রাতে তিস্তার পানি প্রবাহ ছিল বিপৎসীমার ৪৪ সেন্টিমিটার উপরে। তখন থেকেই জেলা প্রশাসন মাইকিং করা শুর্ব করে। স’ানীয়রা জানায়, গতবারের তুলনায় এবারের পানির পরিমাণ বেশি। আটদিন ধরেই নিম্নাঞ্চল পৱাবিত হয়ে মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। বাড়িঘরে পানি চলে আসায় রান্নাবান্নাও করতে পারছে না তারা। এমন অবস’ায় মানুষ ঘর থেকেও বের হতে পারছে না। রাস্তাঘাটও ভেঙে গেছে।
সবশেষ, তিস্তার পানির তোড়ে হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী ইউনিয়নের একটি কাঁচা রাস্তা ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ে। একই এলাকার অপর একটি পাকা রাস্তার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলার গড্ডিমারী, সিন্দুর্না, ডাউয়াবাড়ি ও পাটিকাপাড়া ইউনিয়নের নদী তীরবতী বিভিন্ন এলাকার বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা আরো বেড়েছে। সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, রাজপুর, কুলাঘাট ও মেগালহাটসহ বেশকিছু এলাকার নিম্নাঞ্চলের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কালীগঞ্জ উপজেলারও তিস্তা তীরবর্তী কয়েকটি এলাকার নিম্নাঞ্চল পৱাবিত হয়ে মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ছে।
বন্যায় অন্তত ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অনেক রাস্তাঘাট পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় স’ানীয়ার দুর্ভোগে পড়েছে। অন্তত ২০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। জেলা প্রশাসন এ পর্যন্ত বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ১১০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ আড়াই লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এদিকে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো খোলা রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।