স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীতে তেলবাহী ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়ে প্রায় ২৮ ঘণ্টা রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় ভয়াবহ সিডিউল বিপর্যয়ে পড়েছে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে। গত বৃহস্পতিবার রাতে ট্রেন চলাচল শুরম্ন হলেও গতকাল শুক্রবার পর্যনত্ম সিডিউল বিপর্যয় কাটেনি।
বিভিন্ন রম্নটের ট্রেনগুলো রাজশাহীতে এসেছে নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে। একইভাবে রাজশাহী থেকেও নির্ধারিত সময়ে বিভিন্ন রম্নটের ট্রেনগুলো ছেড়ে যেতে পারেনি। এতে চরম ভোগানিত্মতে পড়েছেন যাত্রীরা। তবে এ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, দুর্ঘটনার কারণেই ট্রেন যাত্রায় এমন বিড়ম্বনা দেখা দিয়েছে। দ্রম্নতই ট্রেনের সিডিউল ঠিক হয়ে যাবে।
গত বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার হলিদাগাছি দীঘলকান্দি এলাকায় তেলবাহী ট্রেনের আটটি ট্যাংকার ওয়াগন লাইনচ্যুত হয়। পরে রাত ১০টার দিকে ঈশ্বরদী থেকে রিলিফ ট্রেন গেলে উদ্ধার কাজ শুরম্ন হয়। এর ২৫ ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে আটটি বগি লাইনে তোলা সম্ভব হয়।
এরপর রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজশাহী থেকে ‘পদ্মা এঙপ্রেস’ ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরম্ন করে। অথচ এই ট্রেনটির রাজশাহী ছাড়ার কথা ছিল বিকাল ৪টায়। পদ্মা এঙপ্রেস ছাড়ার পর ভোররাত ৪টার দিকে ‘ধূমকেতু এঙপ্রেস’ ঢাকার উদ্দেশে রাজশাহী ছাড়ে। অথচ এই ট্রেনটির যাত্রার সময় রাত ১১টা ২০ মিনিটে। গতকাল বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ধূমকেতু এঙপ্রেস ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছে।
একইভাবে গতকাল ঢাকা থেকে রাজশাহীর উদ্দেশে ছেড়ে আসা ট্রেনও সময় মতো ছাড়তে পারেনি। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন সাজিদুজ্জামান নয়ন নামে এক ব্যক্তি। তিনি লেখেন, ঢাকা-রাজশাহী রাত ১১টার পদ্মা ট্রেন ছাড়লো দিন ১০টার দিকে। পৌঁছাতে আরও প্রায় ৬ ঘণ্টা সময় লাগবে। বাড়ি আর যাব কী? এদিকেই সময় গেল দেড় দিনের মতো। কি আর করার? সবই কপাল।
রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন রম্নটে রাজশাহী থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলোরও গনত্মব্যে পৌঁছতে অনেক দেরি হয়েছে। গোয়ালন্দগামী সকাল ৭টার আনত্মঃনগর মধুমতি এঙপ্রেস, ৬টা ২০ মিনিটের চিলাহাটিগামী আনত্মঃনগর তিতুমীর এঙপ্রেস, ভোর ৬টা ৪০ মিনিটের খুলনাগামী আনত্মঃনগর সাগরদাঁড়ি এঙপ্রেস ট্রেনের প্রতিটি ছেড়ে গেছে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা পর।
রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের আনত্মঃনগর সিল্কসিটি এঙপ্রেস গতকাল বেলা আড়াইটাতেও রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের পস্ন্যাটফরমে ছিল। সিডিউল বিপর্যয়ের মধ্যে রাজশাহী থেকে বেলা ৩টার নীলফামারিগামী বরেন্দ্র এঙপ্রেসও সময় মতো স্টেশন ছাড়তে পারেনি।
এদিকে পশ্চিম রেলের বিভিন্ন রম্নটের মেইল ট্রেনগুলোরও সিডিউল ভেঙে পড়েছে। রাজশাহী থেকে পার্বতীপুরগামী উত্তরা এঙপ্রেস ট্রেন গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় ছাড়ার কথা থাকলেও আড়াইটা পর্যনত্ম ছাড়তে পারেনি। সকাল ১০টার সিরাজগঞ্জগামী রাজশাহী এঙপ্রেস কমিউটার ট্রেন স্টেশন ছেড়েছে দুপুর ২টার পর। ট্রেনের এমন ভয়াবহ সিডিউল বিপর্যয়ে চরম ভোগানিত্মতে পড়েছেন যাত্রীরা। তাই রেলের বিরম্নদ্ধে ড়্গোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে কাউকে কাউকে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে পৌলী রেল সেতুর উত্তর পাশের লাইনের একটি অংশ দেবে গেছে। এতেও ব্যাহত হচ্ছে ঢাকার সাথে রাজশাহীর রেল যোগাযোগ। গতকাল সকাল থেকেই সেতুর ওই দেবে যাওয়া অংশ মেরামতের কাজ শুরম্ন করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। দুর্ঘটনা এড়াতে সেতুটি দিয়ে ধীরগতিতে ট্রেন চলাচল করছে। আগামী ৬০ দিন পৌলী রেল সেতুর ওপর দিয়ে ঘণ্টায় সাত কিলোমিটার বেগে ট্রেন চালানোর সিদ্ধানত্ম নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
রেল বিভাগ জানায়, পৌলী রেল সেতুর ওই অংশটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় দীর্ঘ একমাস ধরে সংস্কার কাজ চালাচ্ছিল কর্তৃপক্ষ। সংস্কার কাজের মাঝেই গত কয়েকদিন ধরে চলা টানা বর্ষণে সেতুর উত্তর পাশের অ্যাপ্রোচ অংশে দেবে যায়। এতে সেতুটি ট্রেন চলাচলের জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এতে ধীরগতিতে ট্রেন চলছে। পশ্চিম রেলের সিডিউল বিপর্যয়ের এটিও একটি কারণ।
গতকাল দুপুরে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে বসে ছিলেন সিল্কসিটি এঙপ্রেস ট্রেনের যাত্রী ছিলেন মৌসুমী রহমান। তিনি বলেন, রেললাইন রড়্গণাবেড়্গণ ও সংস্কারের জন্য সরকার কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। কিন্তু লাইন ঠিক থাকে না। লুটপাটের কারণে নাজুক অবস্থায় থাকে রেললাইনগুলো। ফলে ক’দিন পর পরই ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়। আর ভোগানিত্ম পোহায় আমরা সাধারণ যাত্রীরা। মৌসুমী জানান, ট্রেনের জন্য সকাল ৭টা থেকে তিনি স্টেশনে বসে আছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক খোন্দকার শহীদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ সময় লাইন বন্ধ থাকার কারণে রেলের সিডিউল ভেঙে পড়েছে। এ নিয়ে যাত্রীদের কাছে আমাদের দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া উপায় নেই। আমরা তাই করছি। তবে দ্রম্নত সময়ের মধ্যেই যেন সিডিউল ঠিক হয়ে যায় তার চেষ্টা আমরা করছি।
প্রসঙ্গত, রাজশাহীর চারঘাট এলাকায় ক’দিন ধরেই রেললাইন সংস্কারের কাজ চলছিল। পুরাতন সস্নীপার পরিবর্তন করে নতুন সস্নীপার বসানো হচ্ছিল। নতুনভাবে দেয়া হচ্ছিল পাথরও। সংস্কারের সময় সস্নীপারের সঙ্গে লাইন আটকানো কয়েকটি ডগস্পাইক পিন খুলে রাখা হয়েছিল। সংস্কার কাজে নিয়োজিত রেলওয়ের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুর রশিদ তা খেয়াল করেননি।
ফলে ওই পথ দিয়ে ট্রেন যাওয়ার সময় সেটি লাইনচ্যুত হয়। এতে ২৮ ঘণ্টার জন্য রাজশাহীর সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়ে। দায়িত্ব পালনে গাফিলতির কারণে প্রকৌশলী আবদুর রশিদকে সাময়িক বরখাসত্ম করেছে কর্তৃপড়্গ। একইসঙ্গে গঠন করা হয়েছে একটি তদনত্ম কমিটি।