১০ বছরে পা দিল সান্তালী ব্যান্ড ‘সেঙ্গেল’

স্টাফ রিপোর্টার: নানা চড়াই-উৎরাই পার করে বাংলাদেশের সান্তালদের জনপ্রিয় ব্যান্ড দল ‘সেঙ্গেল’ ১০ বছরে পদার্পণ করল। ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠার পর সমতলের আদিবাসীদের সংষ্কৃতির প্রচারে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সেঙ্গেল।

ব্যান্ডের পরিচালক ও লীডগিটারিস্ট জন হেম্ব্রম বলেন, সেঙ্গেল শব্দের বাংলা পরিশব্দ আগুন। সেঙ্গেল বলতে দীপ্তিময় একটি শিখাকে বোঝানো হয়েছে যা একটি সম্ভাবনার প্রতীক। সেঙ্গেল হতে চায় আলোকবর্তিকা স্বরুপ, স্পন্দিত করতে চায় সান্তাল যুবাদের। ঐতিহ্যবাহি সান্তাল গানের পাশাপাশি নিজেদের লেখা আধুনিক সান্তাল গান এবং বাংলা ঝুমুরগানও উপস্থাপন করে থাকে সেঙ্গেল। তাদের গানের কথায় যেমন রয়েছে প্রেমের বহিঃপ্রকাশ, তেমনি রয়েছে সান্তালদের শোষণ ও নির্যাতনের দ্রোহের আগুন।

দলের কিবোর্ডিস্ট ও ভোকাল মানুয়েল সরেন মনে করেন সান্তাল সমাজের ছেলে-মেয়েরা এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বড় হয়, যেখানে রয়েছে ৪৯টি ভিন্ন ভিন্ন সুরের মুর্ছনা। জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, পরব-পার্বন, ফসল লাগানো, প্রকৃতি বর্ণনা, শিকার সব ক্ষেত্রেই রয়েছে একেক রকমের গান। সান্তালদের রক্তে গান ও আনন্দেরধারা বহমান। যে সমাজে গানের এত কদর সেখানে প্রতিষ্ঠিত গানের দলের অভাবপীড়া দেয় তাকে। আর এই তাগিদেই যোগদান করেন সান্তালী ব্যান্ড সেঙ্গেলের। সেঙ্গেলের পথচলা শুরুতে এমন সাবলীল ছিলনা বরং পদে পদে অনেক বাধা, পেরিয়ে যেতে হয়েছে অনেক বন্ধুর পথ বলে উল্লেখ করেন মানুয়েল।

ব্যান্ডের পরিচালক জন হেম্ব্রম ও লীড ভোকাল রঞ্জিত কিস্কু একেবারে সেঙ্গেলের জন্মলগ্ন থেকেই সম্পৃক্ত। তাদের মুখেই জানা গেল সেঙ্গেলের পথচলার কাহিনী। বললেন, শুরুটা ২০১১ সালে। তৎকালীন সদস্যরা একেক জন একেক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন। রঞ্জিত কিস্কু রাজশাহী কোর্ট মিশনপাড়ায় বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক অংশটা পরিচালনা করতেন। জন হেম্ব্রম স্কুলজীবন থেকেই গীটার বাজাতে শুরু করেন। ২০০৯ সালে রাজশাহীতে কলেজে পড়তে এসে বড় ভাই জেমস হেম্ব্রম তাকে অনুপ্রানিত করে। তার বড় ভাইয়ের সাথে রঞ্জিত ও অঙ্কুর হোড় মিউজিক করত বলে তাদের সাথে পরিচয় হয় জন হেম্ব্রমের।

পরে বাংলা ব্যান্ড প্রকৃতিতে যোগ দিয়ে জন মিউজিকে উন্নতি করতে থাকে। তার মাথায় আসে সান্তাল শিক্ষার্থীদের নিয়ে সান্তালী ব্যান্ড করলে মন্দ হয় না। সন্তোষ সরেন ইতোমধ্যে বেজ গীটার শিখছিল। তাকে প্রস্তাব করতেই সে সম্মতি দেয়। অংকুর বাজাতো ড্রামস আর ভোকাল হিসেবে ছিল রঞ্জিত। মিরপুরইনডোর স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত একটি ধর্মীয় সম্মেলনে প্রথম পারফর্ম করে সেঙ্গেল। সেখানে পরিচয়হয় জোসিয় হেম্ব্রমের সাথে যে কিবোর্ড বাজিয়ে ছিল এবং সান্তালী ব্যান্ড নিয়ে তার সম্মতি ছিল। এভাবেই জন, রঞ্জিত, সন্তোষ, যোশিয় ও অংকুর হোড়দের নিয়ে মোটামুটি দাঁড়িয়ে যায় সান্তাল ব্যান্ড সেঙ্গেল।

তারা বলেন, সেই সময় দিনাজপুর, কাঁকনহাট ও রাজশাহীতে বেশ কয়েকটি স্টেজ পারফর্ম করে সেঙ্গেল। বিভিন্ন স্টেজ পারফর্মে মাঝে মাঝে যুক্ত হতেন জেমস হেম্ব্রম, জামেস মার্ডী ও সুজন বেনেডিক্ট তির্কী। তাদের কাছে সেঙ্গেলের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। বেশ কয়েক বার খারাপ অভিজ্ঞতাও হয়েছিল। সেঙ্গেল এর স্টেজ শো করতে গিটার, প্যাড ও কিবোর্ড দেখে সান্তাল দর্শকদের ঘোর আপত্তি। কেউ কেউ বলছিল এদের নামাও স্টেজ থেকে এরা সান্তাল ঐতিহ্যবাহি গানকে নষ্ট করবে। গান শুরু হলে পর এই দর্শকরাই আনন্দে মাতোয়ারা হয়েছে ব্যান্ড দলের ঐতিহ্যবাহী গানের চমৎকার উপস্থাপনা দেখে। এভাবেই মধুর অভিজ্ঞতার সাথে সাথে বেশভালই চলছিল সবকিছু।

তারা আরও বলেন, ভাল যেখানে মন্দও সেখানেও রয়েছে। ভালোর সাথে সেঙ্গেলের খারাপ সময়টাও দ্রুত এল। হঠাৎ পড়াশোনা শেষ হওয়ার কারণে সন্তোষ ও অঙ্কুর রাজশাহী ছেড়ে চলে যায় এবং রঞ্জিত চাকরির জন্য ঢাকা চলে যাওয়ায় একা হয়ে পড়ে জন। ব্যান্ড ভাঙ্গার উপক্রম হয়েছিল প্রায়। বেশ কয়েকটি বছর স্থবির হয়ে পড়ে সান্তালীব্যান্ড সেঙ্গেল। অত্যন্ত খারাপ সময় পার করেছে ব্যান্ডটি। তিলতিল করে গড়ে তোলা ব্যান্ডের এমন করুণ দশা কিছুতেই মেনে নিতে পারতো না জন। এই দুঃসময়ে রাজশাহী বিভাগীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরকালচারাল একাডেমির সান্তালী গানের প্রশিক্ষক মানুয়েল সরেনের সাথে জনের পরিচয় হয়।

মানুয়েল সরেন সেই সময় বিটিভি ও এটিএন বাংলা টিভির জন্য গানরচনা ও গান পরিবেশন করতেন। জন মানুয়েল সরেনকে সেঙ্গেলে যোগ দেবার প্রস্তাব দিলে তিনি সাগ্রহে গ্রহণ করেন এবং যোগদান করেন। ঠিক এই সময়টাতেই রঞ্জিত ঢাকা থেকে রাজশাহী ফিরে আসলে সেঙ্গেলের পালে হাওয়া লাগতে শুরু করে। এরপর জনের পরিচয় হয় সাকাম সুব্রত মার্ডীর সাথে। সাকাম মাদল বাজাতেন। সাকাকে প্রস্তাব দিলে তিনিও সেঙ্গেলে যুক্ত হন।

এরপর কয়েকটি স্টেজ শোতে অংশগ্রহন করে ড্রামার ইমন মুরমু। সে ঢাকায় একটি দলের সাথে নিয়মিত প্রোগ্রাম করে এবং মিউজিককে সে পেশা হিসেবে নিয়েছে। ইমনের যোগদান সেঙ্গেলকে একটি দৃঢ় অবস্থান এনে দেয়। সর্বশেষ সেঙ্গেলে যোগ দেন রাজশাহী কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক সামসন হাঁসদা। তিনি কয়েক বছর থেকে বাঁশিবাজানো শিখছেন এবং বাংলাদেশ বেতার রাজশাহীর সংগীত পরিচালক ও প্রখ্যাত বংশিবাদক আব্দুস সালামের কাছে বাঁশির তালিম নিচ্ছেন। তাঁর যোগদানে পরিপূর্ণ সেঙ্গেলে শেষ তুলির আচড়ের মত। এভাবেই ধীরে ধীরে সেঙ্গেল ব্যান্ড পরিণত হয় সান্তালদের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যান্ড দল হিসেবে।

আগামী ৩০ জুন ঐতিহাসিক সান্তালহুল দিবস উপলক্ষে সেঙ্গেলের প্রথম অডিও অ্যালবাম মুক্তি পাওয়ার কথা থাকলেও দেশের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে তা এই মুহূর্তে সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান ব্যান্ডের পরিচালক জন হেম্ব্রম। কারণ এই করোনাভাইরাসের জন্য ব্যান্ডে সদস্যরা সবাই নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন।

সেঙ্গেল ব্যান্ডের সদস্যরা হলেন- রঞ্জিত কিস্কু-ভোকাল, মানুয়েলসরেন- ভোকাল ও কিবোর্ড, সাকাম সুব্রত মার্ডী- মাদল ও কাহন, সামসন হাঁসদা-বাঁশি, ইমন মুর্মু-ড্রামস, ফ্রান্সিস মার্ডী-কিবোর্ড ও অক্টোপ্যাড এবং জন হেম্ব্রম-গীটার।

সোনালী/এমই

শর্টলিংকঃ