স্লুইসগেট বন্ধ করে মাছচাষ, জলাবদ্ধতায় দশ হাজার একর জমি

  • 34
    Shares

বাগমারা প্রতিনিধি: বাগমারা থানা সংলগ্ন সোনাবিলের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র পথ স্লুইসগেটের মুখ বন্ধ করে দিয়ে অবৈধভাবে মাছচাষ শুরু করেছেন এলাকার প্রভাবশালী একটি মহল। এতে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় ওই বিলের প্রায় ১০ হাজার একর জমির আউশ-আমন ধান, পানবরজ, পটলসহ বিভিন্ন ফসলচাষ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ওই বিলের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া কুঁচামারা দাঁড়ার লিজ বাতিল করে বিলটি উন্মুক্ত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে এলাকার কৃষক ও মৎস্যজীবীদের পক্ষ থেকে বাগমারা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে আবেদন করা হয়েছে। ওই আবেদনপত্রে বাগমারা গ্রামের কার্ডধারী মৎস্যজীবী মাহাবুর রহমানসহ গণিপুর ও বাসুপাড়া ইউনিয়নের চার শতাধিক কৃষক ও মৎস্যজীবীর স্বাক্ষর রয়েছে।

জানা যায়, উপজেলার গনিপুর ও বাসুপাড়া ইউনিয়নের সেনাবিলের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া মাঝিগ্রাম থেকে বাগমারা থানার অদূরে স্লুইসগেট হয়ে ফকিরণী নদীর সঙ্গে কুঁচামারা দাঁড়াটি সবসময় উন্মুক্ত ছিল। ওই বিলে তথা কুঁচামারা দাঁড়ার উন্মক্ত জলাশয়ে এলাকার দরিদ্র মৎস্যজীবীরা আজীবন স্বাধীনভাবে মাছ ধরে জীবীকানির্বাহ করতেন। তাছাড়া ওই বিলের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া কুঁচামারা দাঁড়ার মুখে থানা সংলগ্ন স্লুইসগেট দিয়ে কৃষকেরা সুবিধা মতো বিলে প্রয়োজনীয় পানি প্রবেশ করিয়ে আবার কখনও অতিরিক্ত পানি বের করে দিয়ে চাষাবাদ করে আসছিলেন।

সম্প্রতি এলাকার প্রভাবশালী একটি মহল দাঁড়াটি লিজ নিয়ে বিল সংলগ্ন এলাকার মৎস্যজীবীদের উচ্ছেদ করে এখন পুরো বিলটিই দখল করে নিয়েছেন। প্রভাবশালী ওই মহল ক্ষমতার দাপটে বিলের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র মাধ্যম স্লুইসগেটের মুখ বন্ধ করে দিয়ে মাছচাষ শুরু করেছেন। এতে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় ওই বিলের প্রায় ১০ হাজার একর জমির আউশ-আমন ধান, পানবরজ, পটলসহ বিভিন্ন ফসল এখন হুমকির মুখে পড়েছে। দুই/এক দিনের মধ্যেই পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা না হলে ওই বিলের চাষকৃত সমস্ত ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাছাড়া জলাবদ্ধতার কারণে মৌসুমি সবজি বিশেষ করে আলু, পটল, বেগুন, করলা, বরবটি, ঢেঁড়শ, পেঁয়াজ, মরিচ, পেঁপে, ঝিঙা ও শসাসহ সবজি জাতীয় অন্যান্য ফসলের চাষও ব্যাহত হবে।

শনিবার সরজমিনে এলাকায় গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুঁচামারা দাঁড়া সংলগ্ন সোনাবিলের চারদিকে বাগমারা, একডালা, মাঝিগ্রাম, পোড়াকয়া, মোহাম্মদপুর, বালানগর, শ্যামপুর ও গোপালপুরসহ প্রায় ১০/১২টি গ্রামে কয়েক হাজার কৃষক পরিবার রয়েছেন। ওইসব কৃষক তাদের জমিতে বর্তমানে আউশ-আমন ধান, পটল ও পানচাষ করেছেন। কিন্তু এ বিলের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র মাধ্যম স্লুইসগেটটি বন্ধ করে দেয়ায় বিলের অতিরিক্ত পানি বের হতে পারছে না। ফলে একটু বৃষ্টিতেই বিলে ব্যাপকভাবে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে খেতের ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে কৃষকেরা অভিযোগ করেন ।

বাগমারা গ্রামের কৃষক আব্দুল মান্নানের এক বিঘা, দুলাল হোসেনের দেড় বিঘা ও সুজনের দুই বিঘা জমির পানবরজ কৃত্রিম জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে বলে তারা জানান। এ অবস্থায় কেউ দূর থেকে মাটি সংগ্রহ করে পানবরজের চারদিকে বাঁধ দিয়ে, আবার কেউ শ্যালোমেশিন দ্বারা পানবরজ থেকে পানি বের করে দিয়ে জলাবদ্ধতার কবল থেকে পানবরজ রক্ষার চেষ্টা করছেন।

এদিকে বাগমারা গ্রামের কার্ডধারী মৎস্যজীবী মাহাবুর রহমান, বালানগর গ্রামের মৎস্যজীবী আক্কাছ আলী ও আশরাফুল ইসলাম বলেন, ছোট থেকেই আমরা ওই বিলের পানিতে স্বাধীনভাবে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে জীবিকানির্বাহ করে আসছিলাম। কিন্তু প্রভাবশালীরা বিলটি দখলে নেয়ার পর থেকেই তারা আর ওই বিলে মাছ ধরতে পারছেন না। করোনার কারণে দূরে কোনো কাজেও যেতে পারছেন না। এই অবস্থায় পরিবার পরিজন নিয়ে চরম মানবেতর দিন কাটছে বলে মনের কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে এক পর্যায়ে তারা কেঁদে ফেলেন। ওইসব গরিব ও অসহায় মৎস্যজীবী পরিবারগুলোর দুর্দশা ও বিলের প্রায় ১০ হাজার একর জমির ফসল উৎপাদনের কথা বিবেচনা করে অতি সত্বর কুঁচামারা দাঁড়াটির লিজ বাতিল করে স্লুইসগেটটি খুলে দেয়া এবং প্রভাশালীদের দখল থেকে বিলটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া প্রয়োজন বলে বিল সংলগ্ন এলাকার কৃষক ও মৎস্যজীবীরা দাবি জানান।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক বলেন, পানি চলাচল বন্ধ করে কেউ মাছচাষ করতে পারবে না। এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে সরকারি নির্দেশনাও রয়েছে। তারপরও কেউ যদি ব্রিজ, কালভাট ও স্লুইসগেটের মুখ বন্ধ করে পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানাসহ দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। উপজেলা জলমহাল ইজারা কমিটির সভাপতি বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শরিফ আহম্মেদ বলেন, এ বিষয়ে এলাকার কৃষক ও মৎস্যজীবীদের পক্ষ থেকে একটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের কথা বিবেচনা করে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে।

সোনালী/এমই

শর্টলিংকঃ