‘..স্যার, আপনার কী খুব তাড়া ছিল?’

  • 14
    Shares

তৌসিফ কাইয়ুম:

পিতার স্নেহের পরশে কেউ আর পিঠে হাত দিয়ে বলবে না- অনেক বড় হতে হবে। ওপারে ভাল থাকবেন, আর দোয়া করবেন আপনার সেই উক্তি যেন মেনে চলতে পারি ‘যে কথা বল তুমি তোমার মাকে বলতে পারবে না সে কাজ কখনোই করবে না’।

ড. মাহবুবুর রহমান রাসেল

সময়টা ২০১৮ সালের প্রথম দিকের কথা। সবেমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। বিভাগের বন্ধু কিংবা বড় ভাইদের সাথে তখনো খুব একটা ভাব হয়ে উঠেনি। বন্ধুদের সাথে বসলে আড্ডার চলে এক একজন বলতো বিভাগের অমুক ভাই আমার এলাকায়, অন্যজন বলতো অমুক ভাই আমার এলাকার।

এসব শুনে নিজেকে খুব একা মনে হতো। বিভাগে আমার এলাকার বন্ধু কিংবা বড় ভাই কেউ নেই ভেবে। এভাবে প্রায় মাস খানেক কেটে গেল। ইতোমধ্যে বিভাগের অনেকের সাথে বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতিতে যাওয়ার কারনে অনেক বড় ভাইয়ের সাথেও ভাল সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

এসব কিছুর মধ্যেও যখন এলাকা নিয়ে কথা উঠতো নিজের মধ্যে কিছুটা অসহায় লাগতো। আগেই বলে রাখি তখনো আমার জেলার সমিতি সম্পর্কে জানা শোনা নেই। এভাবে চলে গেল আর কিছু দিন। ততোদিনে আমি রাবিসাসের সে সময়কার সভাপতি মুস্তাফিজ রনি ভাইয়ের সাথে সমকাল অফিসে যেতাম। সেখানে সমকালের রাজশাহী ব্যুরো প্রধান সৌরভ ভাইয়ের একটা অনলাইনে কাজ শুরু করেছি।

মার্চ কিংবা এপ্রিলের কোনো এক রাতে অপরিচিত এক নাম্বার থেকে ফোন। রিসিভ করতে বিপরীত পাস থেকে শোনা গেল ‘আমি বৃহত্তর নোয়াখালী জেলা সমিতির সাধারণ সম্পাদক বলছি। আগামী পরশু বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন্স কমপ্লেক্সে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর,ফেনী থেকে চলতি শিক্ষাবর্ষে যারা ভর্তি হয়েছে। তাদের নবীনবরণ অনুষ্ঠিত হবে। তুমি আসবে। আমি সম্মতি জানাতে তিনি ফোন রেখে দিলেন।

পরের দিন জেলার সমিতির নবীনবরণে কথা বলে রনি ভাই থেকে একদিনের ছুটি নিলাম। পরের দিন যথা সময়ে ডিন্স কমপ্লেক্সে গিয়ে হাজির। চার দিকে সব নতুন মুখ। এর মধ্যে দুয়েকজনের সঙ্গে আগের পরিচয় আছে। তাদের মাধ্যমে খোঁজ করতে শুরু করলাম জেলা সমিতির কেউ জার্নালিজমে পড়ে কিনা। সবার একই উত্তর না।

অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শুরু না হওয়ায় তাদের সাথে আড্ডা জমিয়ে দিলাম। বলে রাখা ভাল পরিচিত বন্ধুরাও যে এখানে ভর্তি হয়েছে, সেটা এখানে আসার আসে সেটা জানা ছিল না। সবাই কে কোথায় থাকছি, কোন বিভাগে কার পজিশন কেমন ছিল ইত্যাদী নিয়ে কথা হচ্ছে। এমন সময় সাউন্ড বক্সের আওয়াজ আসল ‘আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকমন্ডলীকে সামনে এসে আসন গ্রহণ করার অনুরোধ করছি।

সামনের দিকে তাকাতেই যেন হৃদয়টা অনেক প্রশস্ত হয়েগেছে। এক অজানা উত্তেজনা তৈরি হল। মনে হচ্ছিল তখই ডায়াসে সামনে গিয়ে বলি স্যার আমি আপনার বিভাগের শিক্ষার্থী। কোনো ভাবে উত্তেজনা দমন করে বসে আছি। প্রোগ্রামের আনুষ্ঠানিকতা শেষে একজন স্যার বক্তব্য দিলেন। নামটা মনে নেই।

এরপর বক্তব্য রাখতে আসলেন গণযোযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক মাহবুবুর রহমান রাসেল। স্যার ডায়াসের সামনে এসে মিষ্টি হাসি দিয়ে বললেন, আজ আমার সামনে এখানে যারা আমার সামনে বসে আছে অধিকাংশই নবীন। সত্যি কথা বলতে আমি নিজেও এখানে তোমাদের মতো নবীন। প্রশ্ন উঠতে পারে এতোদিন জেলা সমিতিতে আসিনি কেন?

সত্য কথা বলতে আমি আঞ্চলিকতায় বিশ্বাস করি না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে জেলা সমিতি অনেক, আমার ধারনা এতে আমাদের গন্ডি ছোট হয়ে যাচ্ছে। এই বিশ্বাস থেকে আমি জেলা সমিতিতে আসি নি। আমি আমার বিভাগে নোয়খালির একমাত্র শিক্ষার্থী ছিলাম। ডিপার্টমেন্ট থেকে সর্বোচ্চ মার্ক নিয়ে পাস করেছি।

এখন সেখানে অনেকদিন যাবৎ শিক্ষকতা করছি। কিন্তু কেউ কোনো দিন বলতে পারে নি, তুমি নোয়াখাইল্যা। আমি চাই তোমরাও এমন হবে যাতে তোমাদের আচার ব্যবহার দেখে কেউ বুঝতে না পারে তোমার জেলা কিংবা বিভাগ। এখন প্রশ্ন করতে পারো এতোদিন পর কেন আসলাম, এ বয়সে এসে আমার মধ্যে একটা ধারণা জন্মেছে, স্বল্প এ জীবনে অনেক মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে।

আমরা আর কতদিনই বাঁচবো যদি জেলা সমিতিতে যাই সেখানে আরও কিছু মানুষের সাথে পরিচয় হবে। তাদের কাছ থেকে কিছু শিখতে পারবো। এই ধারণা থেকে আসা। সেই দিন আর স্যারের সঙ্গে কথা বলা হয়ে উঠেনি। তবে সেখান থেকে এসে রাবিসাসে এসে অনেকের কাছে বলেছি রাসেল স্যারের বাড়ি নোয়খালি, আমার জেলার পাশে। তখন এক ভাই বলেছিল এরপর স্যারের দেখা হয়েছে অনেকবার তবে কথা হয় নি।

বিভাগের শিক্ষা সফরে বগুড়া মহাস্থানগড় স্যারের কানে কানে বলেছিলাম স্যার আপনার সাথে নোয়াখালি জেলা সমিতিতে দেখা হয়েছিল। আমার বাড়ি ফেনী। স্যার একটু হেসে পিঠে ওপর হাত দিয়ে বললেন, ভালভাবে পড়াশুনা করে অনেক বড় হতে হবে। এরপর অনেকবার দেখা হয়েছে কিন্তু ওইভাবে কথা বলা হয়ে উঠে নি।

সর্বশেষ ২০১৯ সালে বিভাগের ইনডোর আউট গেম প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠানে আপনি বলেছিলেন, অনেক দিন ধরে ব্যাডমিন্টন খেলছি। এবারই আমর শিক্ষার্থীর কাছে হেরে গিয়েছি। বুঝতে পারছি বয়স হয়েছে। অবসর নিতে হবে। তখন আমরা শিক্ষার্থীরা সমস্বরে বলেছিলাম না স্যার আপনি খেলবেন। উল্লেখ্য, পুরো খেলা স্যার হাসি খুশি থাকতেন, যখনি প্রতিপক্ষ ছাত্রদের পয়েন্ট নিতেন প্রতিবার বলতেন সরি।

স্যার সেসময় না বুঝলেও এখন বুঝতে পারছি কেন আপনি বিভাগের খেলা থেকে বিদায় এবং শেষ সময়ে জেলা সমিতিতে গিয়েছিলেন। আপনার যে খুব তাড়া ছিলো তাই হয়তো সবকিছু ঘুছিয়ে নিতে চেয়েছিলেন।

পিতার স্নেহের পরশে কেউ আর পিঠে হাত দিয়ে বলবে না- অনেক বড় হতে হবে। ওপারে ভাল থাকবেন, আর দোয়া করবেন আপনার সেই উক্তি যেন মেনে চলতে পারি ‘যে কথা বল তুমি তোমার মাকে বলতে পারবে না সে কাজ কখনোই করবে না’।

লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রাবি এবং সংবাদকর্মী

সোনালী সংবাদ/এইচ.এ

শর্টলিংকঃ