সমতলের আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেট বণ্টনে অব্যবস্থাপনা

  • 500
    Shares

।।বিভূতী ভূষণ মাহাতো।।

ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাগডাসে! এই কথাটি প্রায়ই আদিবাসীদের সভা সমাবেশে উচ্চারণ করেন নওগাঁর কমরেড জয়নাল আবেদিন মুকুল। এই কথাটির তাৎপর্য মিলে যাচ্ছে আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ বিতরণের চিত্রের সাথে। আদিবাসীদের জন্য বাজেট বরাদ্দ ভোগ করে অ-আদিবাসীরাও।

প্রতি অর্থবছরে বাংলাদশের আদিবাসীদের জন্য জাতীয় বাজেটে থোক বরাদ্দ হয়। সেটা আদিবাসীদের তুলনাই অনেকে কম৷ তবুও প্রতিবছরই জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম সহ অন্যান্য সংগঠন/সংস্থা বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য দাবি তোলে। আদিবাসীদের উন্নয়নের জন্য সরকারও সামান্য করে বরাদ্দ বাড়ায় কিন্তু এই বরাদ্দকৃত র্অথ কি আদৌ প্রকৃত আদিবাসীদের জন্যই ব্যয় হচ্ছে? এর সুফল কি আদিবাসীরাই পাচ্ছে নাকি অন্যপক্ষ? প্রকতপক্ষে আদিবাসীদের বরাদ্দ চলে যায় অ-আদবিাসীদরে হাতে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং না থাকায় সারাদেশেই এই বরাদ্দ নিয়ে চলছে হ-য-ব-র-ল।

অনেক জায়গায় আদিবাসীদের এই বরাদ্দকৃত অর্থ বিতরণে নয়ছয়ের ঘটনা ঘটছে। আদিবাসী ব্যতীত অ-আদিবাসীেদর মােেঝা বিতরণ করা হচ্ছে। এমনিতেই আদিবাসীদের তুলনায় বরাদ্দ থাকে অনেকগুণ কম। সেখানেও আবার অনিয়ম! এ যেনো- ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাগডাসে!

জুন মাস অর্থবছর শেষের দিকে এসে সমতলের আদিবাসীদের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মাধ্যমে বরাদ্দকৃত অর্থ বিতরণে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনে তোড়জোড় শুরু হয়। সংবাদমাধ্যমে দেখা যায় আদিবাসী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণের সংবাদ। এটা নিশ্চয় আদিবাসী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবে কাজে লাগবে। এজন্য বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।

উচ্চ শিক্ষায় অধ্যয়নরত আদিবাসী (সরকারের ভাষায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী) শিক্ষার্থীদের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রতিবছর সরাসরি এককালীন ২৫ হাজার টাকা করে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়। সেখানেও অনিয়মের কমতি নেই। প্রতিবছর এই বৃত্তি দেওয়া হলেও প্রকাশ করা হয়না কোনো বিজ্ঞপ্তি ও চুড়ান্ত নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের তালিকা। ভুলবশতঃ হয়তো ২০১৭ সালেই শুধু তালিকা প্রকাশ করে। এরপর আর কোনো তালিকা প্রকাশের খবর কোনো আদিবাসী সংগঠন কিংবা আদিবাসী নেতৃবৃন্দ পেয়েছে বলে জানা নেই।

২০১৭ সালের তালিকায় দেখা যায় যে অনেক অ-আদিবাসীর নাম। যারা বাঙালী হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত। তারা কোনো দিনই নিজেদের আদিবাসী হিসেবে গণ্য করেনি। অধিকারী, পাল, হালদার, শর্মা, রায়, পোদ্দার, চূণকর, মন্ডল পদবীদারীদের নাম পাওয়া যায় সেই তালিকায়। এই নিয়ে সেসময় কয়েকজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখিও করেছিলাম। কিন্তু কি হলো তা জানা নেই। তবে পরবর্তীদের আর তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।

এবারও ২০১৯-২০ অর্থবছরের শিক্ষা বৃত্তি বিতরণ করোনা ভাইরাসের কারণে থেমে যায়। তবে অর্থবছর শেষ হয়ে যাচ্ছে তাই যেসকল জেলায় বেশি শিক্ষার্থী নির্বাচিত হয়েছে সেসকল জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এই বৃত্তির চেক বিতরণ করা হচ্ছে। কিন্তু যেসকল জেলায় কম রয়েছে তাদের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চেক নিতে হয়েছে। সেখানে লক্ষ্য করা গেল কয়েকজন শিক্ষার্থী এসেছে তারা নিজেদের আদিবাসী স্বীকার করেনা। পরিচয় দিচ্ছে হিন্দু। পদবী জানতে চাইলে জানা গেল তারা দাস, রায় পদবীধারী। এছাড়াও প্রতিবছর অনেক শিক্ষার্থীর নাম থাকলেও তারা আদৌও জানতেই পারেনা যে তাদেরও নাম ছিল। তাদের চেকগুলো পড়েই থাকে। এমনকি একজনকে দিয়ে দুই জনের স্বাক্ষর করানো হয়ে থাকে। প্রশ্ন হচ্ছে সেইসকল চেকের অর্থগুলো কোথায় যায়?

উপজেলা পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে সমতলের আদিবাসীদের (সরকারি ভাষায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের) আর্থ সামাজিক উন্নয়নের জন্য “বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)” নামক প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিবছর অর্থ বরাদ্দ হয়। এগুলোও কি সঠিকভাবে বন্টন হয়? এখানেও অনিয়মের শেষ নেই। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করে উপজেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট উপজেলায় নিবন্ধিত আদিবাসী (সরকারি ভাষায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী) সমিতির মাধ্যমে। সেখানেও রয়েছে শুভংকরের ফাঁকি। যেসকল উপজেলা আদিবাসীর সংখ্যা কম সেখানে অ-আদিবাসীরা আদিবাসীর নামে সমিতি নিবন্ধন করে আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ হাতিয়ে নেয়।

এক্ষেত্রে প্রকৃত আদিবাসীরা বছরের পর বছর বঞ্চিত হচ্ছে। আদিবাসীদের জন্য সহজশর্তে স্বল্পসুদের ঋণ সহ বিভিন্ন অনুদান সুবিধাবাদীরা নিয়ে যাচ্ছে। অনেক এলকায় দেখা যাচ্ছে শুধুমাত্র আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দে অন্যান্য দলিত, হরিজনদেরও যুক্ত করা হচ্ছে। সরকার দলিত, হরিজন ও বেদে জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা প্রকল্প বাস্তবায়ন থাকলেও আদিবাসীদের বরাদ্দের তালিকায় ঢুকিয়ে দিয়ে প্রকৃত আদিবাসীদের বাদ রাখা হচ্ছে। আদিবাসী শিক্ষার্থীদের বিতরণের তালিকা কোনো উপজেলা প্রশাসনই তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে না। কারণ, প্রকাশ করলেই অনিয়মগুলো ধরা পড়ে যাবে। এ বছর পাবনার একটি উপজেলা প্রশাসন আদিবাসী শিক্ষাবৃত্তির তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে সেখানে দেখা যায় যে, পাল, কুন্ডু, মুখার্জি, মহন্ত, চুর্ণকার, দে, বাসফোর, দাস, মন্ডল, সরকার পদবীধারীরা আদিবাসী শিক্ষাবৃত্তি পেয়েছে। তারা সকলেই হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত। এসকল পদবীধারীরা কেউই কখনই আদিবাসী জাতিসত্তাভুক্ত নয়।

২০১০ সালে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন’ এ মাত্র ২৭টি আদিবাসী জাতিসত্তাকে তালিকাভুক্ত করা হয়। সেসময় গেজেটভুক্ত না হওয়াই বাদপড়া আদিবাসীরা অনেক জায়গায় কোনো সুযোগ-সুবিধাই পায় নাই। অনেক আলোচনার পর গত ২০১৯ সালে আবারও গেজেটে সংশোধনী তালিকা প্রকাশ করা হয়। সেখানে মোট ৫০টি আদিবাসী জাতিসত্তাকে তালিকাভুক্ত করা হয়। কিন্তু এখনো কেনো সেই গেজেট অনুসরণ করা হচ্ছে না? কেন গেজেটের বাইরে বরাদ্দগুলো চলে যাচ্ছে? তাহলে গেজেটের এই প্রহসন নাটকের দরকার কি ছিল? আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ গেজেটভুক্ত আদিবাসীদের মধ্যেই বন্টন করতে হবে।

আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ বন্টনে সরকারের উচিত সঠিক ও স্বচ্চ ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং করা যেন প্রকৃতঅর্থে আদিবাসীদের উন্নয়ন নিশ্চিত হয়। এজন্য সরকারকে আদিবাসী সংগঠনগুলোকে (সমিতি নয়) জাতীয়ভাবে ও অঞ্চলঅনুযায়ী যুক্ত করা প্রয়োজন। অ-আদিবাসী কর্তৃক আদিবাসীর নামে নিবন্ধিত ও পরিচালিত সকল সমিতি বাতিলের দাবিও জানাচ্ছি।

লেখক: কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ