সন্তানহারা মায়ের যে কথাগুলো কাঁদিয়েছিল সবাইকে

অনলাইন ডেস্ক: একমুখী ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী লড়াইয়ে অংশ নেওয়া এক সৈনিকের নাম জুবায়ের চৌধুরী রিমু। নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার লক্ষে ছাত্রমৈত্রীতে যোগদান করেন এবং এই পথকে সমুন্নত রাখতে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে যান শহীদ জুবায়ের চৌধুরী রিমু। ১৯৯৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর শিবিরের সন্ত্রাসীদের পরিকল্পিত হামলায় নিহত হন ছাত্রমৈত্রী নেতা শহীদ রিমু। জুবায়ের চৌধুরী রিমু ছিলেন ছাত্রমৈত্রী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা এবং জামায়াত-শিবির-সাম্প্রদায়িক চক্রের বিরুদ্ধে বজ্রকঠিন কণ্ঠস্বর। গতকাল ১৯ সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায় হিসেবে শহীদ রিমুর ২৭তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেছে ওয়ার্কার্স পার্টি ও ছাত্রমৈত্রী।

১৯৯৩ সালে সাম্প্রদায়িক নরপিশাচদের হাতে নিহত হওয়া শহীদ জুবায়ের চৌধুরী রিমুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ১৯৯৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রাবির কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে শোক সভার আয়োজন করেন তৎকালীন ছাত্রমৈত্রীর নেতৃবৃন্দ। সেটি ছিল রিমুর ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকী। সেই শোক সভায় উপস্থিত হন আদরের সন্তান না থাকার স্মৃতি বয়ে বেড়ানো অশ্রুকাতর রিমুর মা জেলেনা বেগম। সেদিন হারানো প্রিয় সন্তানের বিষয়ে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তার বলা কথাগুলো চোখে জল এনেছিল উপস্থিত সকলের।

বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, প্রিয় সন্তানের শোককে সময় কখনো ভুলিয়ে দিতে পারে না। যেখানে আমার রিমুর রক্ত রয়েছে, সেই স্মৃতি ভুলে যাওয়ার নয়। এই কান্না শুধু রিমুর মায়ের নয়, জামিল ও রুপমসহ সকল শহীদের জন্য। তোমরা যারা মুক্তচিন্তার রাজনীতিতে বিশ্বাস কর, যারা মৌলবাদী রাজনীতি ঘৃণা কর- আমি তাদের সকলের মা হয়ে বেঁচে থাকতে চাই। তোমরা আমাকে বাঁচিয়ে রেখো। রিমুকে যখন হত্যা করা হচ্ছিল তখন সে বলছিল, ‘আপনারা আমাকে মারবেন না, আমার মা বাঁচবে না’। তোমরা আমার রিমুকে বাঁচিয়ে রেখো, আমি তোমাদের কাছে এসে বলেছিলাম, যেন আর কোন রিমুর রক্ত না ঝড়ে। তোমরা আমাকে কথা দিয়েছিলে, কিন্তু আরও অনেক রিমুর রক্ত ঝড়েছে।

যদি ওদের বিচার হতো- তাহলে শয়তানের দল কখনো কোন মায়ের সন্তানের রক্ত ঝড়াতে পারতো না। তোমরা যারা মুক্তচিন্তার রাজনীতিতে বিশ্বাসী, তোমরা যে সংগঠনেরই হও না কেন তোমাদের মাঝে আমি আমার রিমুকে দেখতে চাই। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যারা জড়িত তোমরা ওদের আমার চেয়েও বেশি কাছ থেকে দেখছো। রিমু ও জামিলের রক্তের উপর দিয়ে ওরা হাঁটছে। ওদের রাজনীতি করার অধিকার নেই। ওরা ধর্মকে লেবাস হিসেবে নিয়েছে। রিমুর কাছে শুনেছিলাম, রাজনীতির কারণে ওরা এলাকায় এলাকায় বিবাহ করছে। রাজনীতি শেষ হয়ে গেলে হতভাগীদের ওরা ছুঁড়ে ফেলবে।

আমার খুব কষ্ট হয় যখন দেখি তাদের প্রতীক দাড়িপাল্লা। একটি পবিত্র আমানত সেই আমানতকে তারা কিভাবে ব্যবহার করছে? আমি সেদিন শান্তি পাবো যেদিন আমার ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের প্রতিরোধ করতে পারবে। আমি যদি জানতাম ওরা আমার রিমুকে, রিমুর আদর্শকে হত্যা করতে চাচ্ছে- তাহলে মা হয়ে আমি রিমুর হাতে অস্ত্র তুলে দিতাম। আমি মা হয়ে তোমাদের কাছে দাবি রাখছি, ৭১’র মত যদি ঘড়ে ঘড়ে দূর্গ গড়ে তুলতে পারো তবে আমাকে শহীদ জননী বলে ডেকো। আমি এই চত্বরে রিমুর নিঃশ্বাসের অনুভূতি ফিরে পাচ্ছি। আমার রিমু মৃত্যুর সময় তার জীবনের কথা ভাবেনি। বলেছিল, ‘আমাকে মারবে না আমার মা বাঁচবে না।’

বাবারা, আমি তোমাদের মধ্যে আমার রিমুকে দেখতে পাচ্ছি। তোমরা আমাকে আশ্বাস দাও- রিমুর আদর্শ বাস্তবায়ন করবে। ‘আল্লাহ তোমাদের সহায় হউন’।

তার বক্তব্যের পর সে সময় সমস্ত মিলনায়তনে শোকের ছায়া নেমে আসে। সকলের চোখ ছল ছল করে উঠে। আকাশ থেকে নামছিল অঝোর বৃষ্টি। সমস্ত প্রকৃতি হয়ে উঠেছিল রিমুর শোকে শোকাহত। তখন স্লোগান উঠলো- ‘রিমু আমার বিশ্বাস, রিমু আমার চেতনা’।

লেখায় শহীদ রিমুর মায়ের বক্তব্যটি দেবাশিষ প্রামানিক দেবুর ফেসবুক ওয়াল থেকে সংগৃহীত। 

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ