সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ

  • 4
    Shares

মনোয়ারুল হক

স্বাধীনতার পরে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত ওই ধর্মান্ধ গোষ্ঠী পর্দার অন্তরালে চলে গিয়ে দেশ-বিদেশে আশ্রয় নেয়। বঙ্গবন্ধু সরকার মনে করেছিল এই পরাজিত শক্তিকে আর এই ভূখণ্ডে মাথা তুলে দাঁড়াতে দেওয়া হবে না যে কারণে সংবিধানের মৌলিক নীতির অন্যতম ধারণা করা হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতাকে। যদিও বঙ্গবন্ধু অসাম্প্রদায়িক সমাজের কথা পাকিস্তান জন্মের পর থেকেই বলে এসেছেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিশাল অর্জন ছিল যেমন আমাদের এই দেশটির স্বাধীনতা তেমনি ছিল মুক্ত স্বাধীন দেশটির সংবিধান রচনা করে তা কার্যকর করা। বাংলাদেশের মুক্তির মাত্র ১১ মাসের মধ্যে সংবিধান রচনা করে তার বাস্তবায়ন ছিল এক বিশাল অর্জন বঙ্গবন্ধু সরকারের।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মের আগে যে দুইটি দেশের জন্ম হয়েছিল এই উপমহাদেশে তার একটি পাকিস্তান ও অন্যটি ছিল ভারত। ভারত তার সংবিধান কার্যকর করে ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারি আর পাকিস্তান ১৯৫৬ সালের মার্চে। যদিও ওই দুইটি দেশের সংবিধান রচনার সময়কাল প্রকৃতপক্ষে অনেক লম্বা। আমাদের ক্ষেত্রেও সময়কাল অনেক লম্বা। ১৯৭০-এর নির্বাচনের আগের সময়কাল থেকেই সংবিধান রচনার একটি পরিকল্পনা ছিল বঙ্গবন্ধুর, কারণ তখনকার পাকিস্তানে কোনো সংবিধান ছিল না আর সেই নির্বাচন ছিল পাকিস্তানের জন্য একটি নতুন সংবিধান রচনার দায়িত্ব। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগেই বঙ্গবন্ধু ও তার দল আওয়ামী লীগ, সেই সময়ের পাকিস্তানকে সামনে রেখে সংবিধান রচনা করে, যার কথা সিআইএ ডকুমেন্টে পাওয়া যায়। ১৯৭০-এর সেই খসড়া সংবিধান রচিত হয়েছিল সত্তরের নির্বাচনের আগে, অবশ্যই পাকিস্তান নামক একটি অদ্ভুত দেশকে সামনে রেখেই।

যে পাকিস্তান ছিল ১১০০ মাইল দূরের দুই ভূখন্ড আর ধর্ম ছিল তার বন্ধনের একমাত্র মাধ্যম। কোনো বন্ধন ছিল না ভাষা কিংবা সংস্কৃতির। যে কারণে জন্মের পরেই এই ভূখণ্ডের মানুষের ভাষা পাল্টে দেওয়ার ষড়যন্ত্র রচনা শুরু করেন পাকিস্তানের জনক নামে খ্যাত মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। পরিণামে পাকিস্তান জন্মের পরই পরই বিভাজন দেখা দেয় এই দু ভূখণ্ডের মানুষের মধ্যে। পরিণতি স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ।

মুক্তিযুদ্ধের প্রধান চেতনা একটি অসাম্প্রদায়িক সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা। ১৯৭২ সালের সংবিধান রচনার দিক নির্দেশনায় বঙ্গবন্ধু তাই চেয়েছিলেন, যার ফলে গৃহীত সংবিধানের মুলনীতি হিসাবে গ্রহণ করা হল মূল চার নীতি। গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র। এই ভূখণ্ডের মানুষ কতটা পরিচিত ছিল এই চার মূলনীতির সাথে তা আজও ভেবে দেখার বিষয়। মানুষের প্রতি মমত্ববোধ আর বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার করুণ পরিণতির অভিজ্ঞতা আর ভূখণ্ডের মানুষের চরম দরিদ্রতা বঙ্গবন্ধুকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে মূলনীতি হিসাবে নিতে অনুপ্রাণিত করেছিল যদিও এই ভূখণ্ডের মানুষের এই দুই শব্দের সাথে কোনো পরিচিতি ছিলনা বললেই চলে।

১৯৪৯ সালে যখন আওয়ামী লীগের জন্ম হয় সেই সময় দলের নামের সাথে মুসলিম শব্দটি ধারণ করতে হয়েছিল। যা ১৯৫৫ সালে পরিত্যাগ করা হয়েছিল। সেই সময় থেকে ১৯৭০ সালের নির্বাচন কখনও ভূখণ্ডের মানুষ ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি সরাসরি শোনে নাই। এমনকি ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে কোরান সুন্নাহ পরিপন্থী আইন করা যাবে না উল্লেখ করে মুসলিম ধর্মালম্বী মানুষকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল। সাধারণভাবে সেই সময়ে যত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি হলো সব ক্ষেত্রেই প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং  দাঙ্গার বিরোধিতা করেছে। তারপরেও এ কথা বলা যাবে না ভূখণ্ডের মানুষ ধর্মনিরপেক্ষতার আভিধানিক ব্যাখ্যা বুঝতে পারত।

পশ্চিমা প্রচারণা তখন ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র সমার্থক শব্দে রূপান্তর করে নতুন ব্যাখা দাঁড় করিয়েছিল। ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে ধর্মহীনতার প্রতীক হিসাবে প্রচার করে এই ভূখণ্ডের মানুষের কাছে এক ভীতিকর মানসিক অবস্থা সৃষ্টি করেছিল। আর এই প্রচারণার প্রধান রাজনৈতিক দল ছিল জামায়াতে ইসলাম ও মুসলিম লীগ। তারা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে এই প্রচারণা ১৯৭০ সালের নির্বাচনে হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিল জামায়াত ও মুসলিম লীগ।
ধর্মান্ধতার প্রকাশ দেখেছি আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়। জামায়াতে ইসলামী আর মুসলিম লীগসহ ধর্মান্ধ গোষ্ঠী তথাকথিত ইসলামি প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানের পক্ষে বাঙ্গালী বিরোধী অবস্থান নিয়ে বহু বাঙ্গালীকে হত্যা, তথা ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে।

স্বাধীনতার পরে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত ওই ধর্মান্ধ গোষ্ঠী পর্দার অন্তরালে চলে গিয়ে দেশ-বিদেশে আশ্রয় নেয়। বঙ্গবন্ধু সরকার মনে করেছিল এই পরাজিত শক্তিকে আর এই ভূখণ্ডে মাথা তুলে দাঁড়াতে দেওয়া হবে না যে কারণে সংবিধানের মৌলিক নীতির অন্যতম ধারণা করা হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতাকে। যদিও বঙ্গবন্ধু অসাম্প্রদায়িক সমাজের কথা পাকিস্তান জন্মের পর থেকেই বলে এসেছেন।

সাম্যতা নিয়েও ভাবনার প্রমাণ পাওয়া যায়: সংবিধানের ২০(১) অনুচ্ছেদের অংশে আছে ‘প্রত্যেকের নিকট হইতে যোগ্যতা অনুসারে ও প্রত্যেকে কর্মানুযায়ী’ যা কিনা মার্কসীয় মতবাদ হইতে গৃহীত।

অসাম্প্রদায়িকতা আর ধর্ম নিরপেক্ষক্ষতা দুইটি আলাদা শব্দ। অর্থও আলাদা। ধর্ম নিরপেক্ষতা শব্দটির যে ভিন্ন অর্থ সৃষ্টি করেছিল পশ্চিমা গণমাধ্যম, তা বুঝতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা হিসাবে ব্যাখ্যা করছিল ধর্মীয় মৌলবাদীরা। বঙ্গবন্ধুও এটা উপলব্ধি করেছিলেন বলেই তিনি প্রায়ই বলতেন আমি মুসলমান আমি কমিউনিস্ট নই। যদিও পশ্চিমা সমাজ তাদের সমাজে ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা সেই রেনেসাঁর সময়েই ঠিক করে ছিল: যার অর্থ হয়েছে ধর্মের সাথে রাষ্ট্রের কোন সম্পর্ক নাই। মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনী ছিল ধর্ম নিয়ে সিনেট কোন আইন করতে পারবে না। আবার সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় প্রায় সব দেশ ‘In the name of GOD’ বলে শপথ বাক্য পাঠ করে তাদের খ্রীস্ট ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করে। এ শপথ বাক্য পাঠ করায় সে দেশগুলোর চার্চের প্রতিনিধিরা।

এই ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শপথ নেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের সংবিধান ব্যবহার করেছেন, কোনো ধর্মীয় প্রতিনিধি রাখেন নাই। দেশের সংবিধানে বিসমিল্লাহ কিংবা রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম হওয়া সত্ত্বেও এখনও বঙ্গবন্ধু প্রচলিত শপথ নেওয়ার বিধান চালু আছে। ধর্মনিরপেক্ষ ভারত আদালতে ধর্ম গ্রন্থ নিয়ে শপথ করার বিধান চালু রেখেছে জন্মের পর থেকেই। ভারতীয় সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি সংবিধান রচনা কালে ব্যাবহৃত হয় নাই।

তখনকার সময় কমিউনিস্টদের কোনো ধর্ম বিশ্বাস নাই বলেই প্রচার করা হতো। জামাতের নেতা গোলাম আযম ১৯৭১ সালের পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে সৌদি আরবে অবস্হান নিয়েছিল ‘যে সৌদি আরব বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় নাই। যতদুর মনে পড়ে দেশটি মোস্তাক সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু সরকারের গৃহীত সংবিধানের মূল এই দুই নীতি সম্ভবত ষড়যন্ত্র রচনার প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যে কারণে ১৫ আগস্টের খুনি ফারুক গর্ব সহকারে আজকে সামাজিকভাবে বিধ্বস্ত পাকিস্তানের মত একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র বানাতে চেয়েছিল। আর এর পরই সংবিধানে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম  সংযোজন করেন জিয়াউর রহমান। এর পর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম যোগ করেন, যা আজও বহাল আছে।
সেই ধর্মতত্ত্ব ষড়যন্ত্র আরও গভীর হয়েছে। শাপলা চত্ত্বরের ঘটনা কিংবা রাজপথ রেলপথ অবরোধের নামে প্রায় বহু মাস আগুন সন্ত্রাস করেছিল ১৯৭১ সালে পরাজিত এই জামাত শিবির নেতৃত্বই।

সব ধর্মীয় মৌলবাদ এক। কয়েকদিন আগে ঘটে যাওয়া ফ্রান্সের ঘটনায় তাদের শক্তি দেখাল দেশব্যাপী। এদের নেতারা সরকারের করণীয় বিষয়ে নির্দেশ দিয়ে রাজপথে দাঁড়িয়ে সরকারকে সময় বেধে দেয় কোন শক্তিতে? বিগত বহু বছরে এদের শাখাপ্রশাখা দেশের গভীরে প্রবেশ করেছে মুক্ত চিন্তার মানুষরা সব সময়ই আক্রমণের শিকার হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রচিত ৭২ সালের এ সংবিধানটি আজও আমাদের শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ নয়। কেবলমাত্র আইন বিভাগে স্নাতক সংবিধান হিসেবে পাঠ করা হয়, এছাড়া রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগেও স্নাতক পর্যায়ে কিছুটা পড়ানো হয়। বাংলাদেশের এই সংবিধান মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকসহ সব পর্যায়ের পাঠ্যসূচিতেই অন্তর্ভূক্ত হওয়া উচিত।

আর স্বাধীনতার নেতৃত্ব প্রদানকারী দল আওয়ামী লীগকে ভাবতে হবে যে ধর্ম নিরপেক্ষতার আদর্শের জন্য বঙ্গবন্ধু সারা জীবন সংগ্রাম করলেন তা কিভাবে বাস্তবায়িত হবে? বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকীতে এটাই আজ বড় প্রশ্ন।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ