শিক্ষার্থীদের মন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে পরীক্ষা

  • 4
    Shares

অনলাইন ডেস্ক: বাসায় বসেই শিক্ষার্থীরা পার করলো একটি শিক্ষাবর্ষ। দীর্ঘ এক বছরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই যাতায়াত-পরীক্ষা। খুলে দেয়ার ঘোষণার পরও করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে আবারো বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু শিক্ষাব্যবস্থা নয় হ-য-ব-র-ল হয়েছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থীদের মন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে পরীক্ষা।

নিশান আহমেদ। পরিবারের সঙ্গে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় থাকেন। বয়স ৬ বছর। এই বয়সেও স্কুল-বন্ধু কি তা সে দেখতে পারেনি। নিশানের মা পারভিন সুলতানা বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, এই বয়সে নিশানের স্কুলে যাওয়া-আসা করার কথা থাকলেও ওকে স্কুলে ভর্তি করা সম্ভব হয়নি। কারণ স্কুলই তো বন্ধ। এরপর করোনার প্রকোপ। তিনি মনে করেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সামনের বছর নিশানকে স্কুলে ভর্তি করা হবে।

এদিকে নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার একটি গ্রামে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াশুনা করতো আবদুল্লাহ। ১৩ মাস স্কুল বন্ধ থাকায় এখন স্থানীয় বাজারে সে এখন সবজি বিক্রেতা। আব্দুল্লাহ আশা করে, স্কুল খোলা হলে সে আবার বিদ্যালয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারবে। ক্লাসে নতুন নতুন শিখবে, পরীক্ষা দেবে। কিন্তু আব্দুল্লাহ’র বাবা ছবদুল মোল্লা এখন আর সেটা চায় না। কারণ আব্দুল্লাহ এখন সংসারে অর্থনৈতিক অবদান রাখতে শুরু করেছে।

তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া বন্ধ বিষয়টি এমন নয় বলে মনে করেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক প্রফেসর ড. সৈয়দ গোলাম ফারুক।

তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের উচিত তাদের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া। কারণ তাদের সামনে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। কেবল পাস করার জন্যই লেখাপড়া নয়। তাদের অবশ্যই জ্ঞানার্জন করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের জন্য অধিদপ্তর এ ক্ষতি পোষাতে একাধিক পরিকল্পনার কথাও বলেন তিনি।

যদিও মাউশি মহাপরিচালকের সঙ্গে একমত নন শিক্ষাবিদ যতিন সরকার। বাংলাদেশ জার্নালকে তিনি বলেন, দেখুন সরকার করোনাকালীন সময়ে অনলাইন ক্লাস, টেলিভিশনে শিক্ষা প্রোগ্রাম, অ্যাসাইনমেন্ট’র মত যেসব প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে। তা আদতে কার্যকর হয়নি।

কারণ এদেশের প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের হাতে এখনো স্মার্টফোন আসেনি। এখনো অনেক গ্রামে ইন্টারনেট দূরে থাক নেটওয়ার্কও পাওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতিতে শহুরে শিক্ষার্থীরা এগিয়েছে। আদতে গ্রামের শিক্ষার্থীরা শুধু পিছিয়েই পড়েনি, এর ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক বড় বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে। আসলে শ্রেণি পাঠদান, পরীক্ষার কোন বিকল্প নেই বলেও মনে করেন শিক্ষাবিদ যতিন সরকার।

বাংলাদেশ তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইজ) এর তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয়, কারিগরি, মাদ্রাসা, কলেজিয়েট স্কুল ও ইংরেজি মাধ্যম স্কুল মিলিয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম পর্যন্ত ১ কোটি ২৭ লাখ ৮৫ হাজার ৫৩৬ জন শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। এরমধ্যে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬৮ লাখ ৭৬ হাজার ৮৫১জন। অর্থাৎ মাধ্যমিক পর্যায়ে ৫৩ ভাগের বেশি নারী শিক্ষার্থী। বাংলাদেশ তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রধান পরিসংখ্যান কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, প্রায় ৬০ লাখ শিক্ষার্থী মাধ্যমিকের গণ্ডি না পেরিয়েই ড্রপ আউট হতে পারে।

মফস্বল ও রাজধানীতে মহামারীর সময়ে শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র পাল্টেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অবস্থাশালী ঘরের সন্তানরা অনলাইনে ক্লাস – পরীক্ষা দিচ্ছে। মফস্বলে বাসায় এসে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন।

আবার এদিকে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা কী অবস্থায় হবে- এ বিষয়েও রয়েছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নানা উৎকণ্ঠা।

অভিভাবক আলিমুজ্জামান বলেন, করোনাকালীন সময়ে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকলেও সামনে আমার সন্তানদের এসএসসি পরীক্ষা। দীর্ঘদিনের বিরতিতে বাসায় একজন শিক্ষককে আনতে বাধ্য হচ্ছি। ছেলেগুলো পরীক্ষা তো ভুলেই গেছে, এমনকি লেখাপড়াও ভুলতে শুরু করেছে। এ ছাড়া আমাদের কোন উপায়ও নেই।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী নেহাল করিম বলেন, এটি একটি গ্লোবাল সমস্যা। তবে সরকারকে এগিয়ে আসা উচিত। আমরা দেখেছি শিল্পখাতে সরকারকে ৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দিতে। এই সঙ্কটের সময় শিক্ষাখাতে ব্যয় করতে দেখিনি।

তিনি আরো বলেন, এভাবে কোটি শিক্ষার্থীর জীবন নষ্ট হতে পারে না। সঠিক ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা ছাড়া এ ক্ষতি কখনোই পূরণ করা যাবে না।

সোনালী/জেআর

শর্টলিংকঃ