শিকেয় উঠেছে শিশুদের পড়াশোনা


শিরিন সুলতানা কেয়া: করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে গত ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ । শিক্ষাকার্যক্রম চালিয়ে যেতে সরকার টেলিভিশনে প্রাথমিকের ক্লাস দেখাচ্ছে ৭ এপ্রিল থেকে। কিন্তু এই ক্লাস আকর্ষণ করতে পারছে না শিশুদের। রাজশাহীর অনেক শিশু টেলিভিশনের ক্লাস বাদ দিয়ে কার্টুনের চ্যানেল নিয়েই পড়ে থাকে। আবার অনেক শিশু শিক্ষার্থীর বাসায় নেই টেলিভিশন। তাদের পড়াশোনা পুরোপুরি শিকেয় উঠেছে।

বিষয়টি স্বীকার করেছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুস সালাম। তিনি বলেন, সবার বাড়িতে তো টেলিভিশন নেই। আমাদের হিসাব অনুযায়ী ৩০ ভাগ শিশু টেলিভিশনের ক্লাস থেকে বঞ্চিত। তিনি বলেন, সকালে সংসদ টেলিভিশনে এবং বিকালে রেডিওতে শিশুদের শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বাড়িতে রেডিও-টেলিভিশন থাকলে সন্তানদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অভিভাবকেরই বড় দায়িত্ব।

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নানা কারণে শিশুদের রেডিও-টেলিভিশনের ক্লাসে মন বসছে না। অনেকের বাড়িতে রেডিও-টেলিভিশন, বিদ্যুৎ কিংবা ডিসের লাইন নেই। মোবাইলে রেডিও থাকলেও বাড়িতে নেই হেডফোন। এই হেডফোন ছাড়া রেডিও চালু হয় না মোবাইলে। ফলে অনেক শিশুরই পড়াশোনা হচ্ছে না। বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষকরাও এখন শিশুদের পড়াশোনার ব্যাপারে তেমন খোঁজ নেন না। তাগিদ দেন না রেডিও-টেলিভিশনের ক্লাসে অংশগ্রহণের। তবে গত ২৮ জুন সরকার শিশুদের মোবাইলে পড়াশোনার খোঁজ নেয়ার নির্দেশনা দেয়ার পর শিক্ষকরা যোগাযোগ করতেন। সেটা দিনে দিনে কমে এসেছে।

রাজশাহীর মোল্লাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াশোনা করে মেহেদী হাসান। তার মা আনোয়ারা খাতুন বলেন, বাচ্চা মানুষ তো! স্কুল বন্ধ থাকলে পড়াশোনা করতে চায় না। তারপরও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি নির্ধারিত সময় টিভির সামনে বসাতে। সে সময় পাশে বসে থাকতে হয়। তা না হলেই কার্টুনের চ্যানেল ধরে। শিক্ষকরা যদি একটু ভাল করে তাগিদ দিতেন তাহলে ভাল হতো।

পুঠিয়ার সুরেশ্বরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যারা পড়াশোনা করে তাদের অনেকেরই বাড়িতে টেলিভিশন নেই। কারও কারও বাড়িতে বিদ্যুৎও নেই। স্কুলটির প্রধান শিক্ষক মলিনা রানী পাল বলেন, অনেকের বাবা দিন আনে দিন খায়। তাদের বাড়িতে হয়তো টেলিভিশন নেই। তবে আমরা শিক্ষার্থীদের বলছি, বাড়িতে টেলিভিশন না থাকলে যেন পাশের কোন সহপাঠীর বাড়িতে গিয়ে একসঙ্গে ক্লাস দেখে। এছাড়া তো কোন উপায় নেই। তবে আমরা যে রকম ভয় পেয়েছিলাম পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক ভাল।

তবে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক দেশের ৮ বিভাগের ১৬ জেলায় মে মাসে করা এক জরিপে বলেছে, ৫৬ শতাংশ ছেলেমেয়ে টিভির ক্লাসে আগ্রহ পায় না। জরিপে আরও বলা হয়, করোনাভাইরাসের এই মহামারির কারণে লেখাপড়ায় আরও অনীহা জাগিয়েছে ১৩ শতাংশ শিশুর। যার ফলে ১৪ শতাংশ শিক্ষার্থী এখন কোনরকম পড়াশোনা ছাড়াই ঘরে দিন কাটাচ্ছে। এই ১৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর প্রায় কিছু না করা বা অলস সময় কাটানোর পেছনে কিছু কারণ রয়েছে। এদের মধ্যে ৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ব্র্যাককে জানিয়েছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে তারা কোনরকম নির্দেশনাই পাচ্ছে না। তাদের বেশিরভাগই মাদ্রাসার শিক্ষার্থী এবং গ্রামে বাস করে। আর টেলিভিশনের মাধ্যমে দূরশিক্ষণে কম অংশগ্রহণের তালিকায় রয়েছে ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী (২৫ শতাংশ), মাদ্রাসা শিক্ষার্থী (৩২ শতাংশ), বিশেষভাবে সক্ষম শিশু (৩৯ শতাংশ) এবং গ্রামে বসবাসকারী শিক্ষার্থী (৪০ শতাংশ)।

রাজশাহীর বেলপুকুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মরিয়ম খাতুন বলে, সে রেডিওতে ক্লাস শোনে না। আর টিভিতে ক্লাস দেখতে তার ভাল লাগে না। কারণ, কিছু বুঝে ওঠার আগেই অনেক সময় ক্লাস শেষ হয়ে যায়। তারপরও অনেক সময় সে ক্লাস দেখতে চাইলে পরিবারের অন্য শিশুরা সিনেমা বা কার্টুন দেখার জন্য জিদ করে। তখন সে-ও তাদের সাথে সিনেমা অথবা কার্টুন দেখে। সে স্কুলেই যেতে চায়।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুস সালাম বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কবে খুলবে সেটা সরকার সিদ্ধান্ত দেবে। আমরা শিক্ষকদের স্কুলে যেতে বলছি। স্কুল থেকে শিশুদের অভিভাবকের মোবাইলে কল দিয়ে খোঁজখবর নিতে বলছি। আমাদের হিসাব বলছে, গড়ে ৭০ ভাগ শিশু রেডিও-টেলিভিশনের ক্লাসে অংশ নিচ্ছে।

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ