শহীদ জননীর আন্দোলন: তারুণ্যের প্রতি আহ্বান

  • 227
    Shares

তামিম শিরাজী

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি এই নামটি শুনলেই একজনের ছবি আমাদের সামনে উজ্জ্বল হয়ে উঠে তিনি শহীদ জননী জাহানারা ইমাম যাকে আমরা আম্মা বা মা বলে সম্বোধন করি।দেশ মায়ের জন্য একজন মায়ের নিজ সন্তানকে যুদ্ধে শপে দেওয়ার এমন নজির বোধকরি বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথাও নেই। আর থাকবেই বা কিভাবে বাঙ্গালির মতো এতো প্রাণ দিয়ে এতো রক্ত দিয়ে আর কেইবা স্বাধীনতা অর্জন করেছে।দেশ স্বাধীন হবার পর মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল,নিরীহ মানুষ হত্যা করেছিল,আমাদের মা বোনদের ধর্ষন করেছিল,লুটপাট করেছিল সেইসব রাজাকার যুদ্ধাপরাধীরা নানান অপরাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে যখন আবারো বাংলাদেশের সর্বত্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ঠিক সেই সময় আবারো বাঙালি হবার ঋণ শোধ করতে সামনে আসেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।

জননী সেই সব রাজাকার যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন গড়ে তোলেন,তাঁর সেই আন্দোলনের নাম একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।আজ ১৯ জানুয়ারি ২৯ বছরে পা দিয়েছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। ২৯ বছরে নির্মূল কমিটি তাদের আকাঙ্ক্ষিত সফলতা পেয়েছে যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়েছে যা আজো চলমান।একথা অত্যান্ত সত্য যে শহীদ জননী ও তাঁর হাতে গড়া সংগঠন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলন ছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা সম্ভব ছিল না। ৭৫ পরবর্তী সংকট কাটিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার দীর্ঘদিন পর রাষ্ট্রক্ষমতায় এসছিলেন তাঁরই আন্দোলনের ফলে একথাও অস্বীকার করবার কোন জায়গা নেই। বঙ্গবন্ধু ছাড়া যেমন বাংলাদেশ হতো না ঠিক তেমনি শহীদ জননী ছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এই বাংলায় হতোনা,শহীদ জননী মানেই একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি যা আজ একটি আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।

আজ ২৯ বছর পেরিয়ে যখন যুদ্ধাপরাধীর বিচার প্রক্রিয়া প্রায় শেষের দিকে বা শেষ হয়ে যাবার পর নির্মূল কমিটির আন্দোলন কতখানি প্রাসঙ্গিক এই প্রশ্ন প্রায় উঠে আসে। যার উত্তর আমার বোধের জায়গা থেকে আমার মতো করে দেওয়ার চেষ্টা করবো, ভুল ত্রুটি আপনারা বিবেচনা করবেন।আমি আগেই বলেছি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি একটি আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। এই আন্দোলনটি কি, এই আন্দোলনটি হল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আন্দোলন।

বাংলাদেশ দুইটি ভাগে বিভক্ত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ এবং বিপক্ষ। সাধারণ জনগণ, রাজনৈতিক,সামাজিক কিংবা সাংস্কৃতিক যেদিকেই তাকান না কেন এই দুই ভাগ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।মুক্তিযুদ্ধ যেমন একটি আদর্শ পক্ষান্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাও একটি আদর্শ। যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছিল বা এখনো যারা নানান কৌশলে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করে চলেছে তারা আদর্শিক জায়গা থেকেই এই বিরোধীতা করে। তারা মহান মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত অপশক্তি,পরাজিতরা শেষবার হলেও কামড় দিবেই। সেই চেষ্টাই তারা প্রতিনিয়ত করে চলেছে। যতদিন মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ আছে ততদিন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী ঘাতক দালালেরা থাকবেই,যতদিন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থাকবে ঠিক ততদিনই মুক্তিযুদ্ধের বিরধীতার আদর্শ থাকবেই।

এই বিরোধীতার আদর্শকে আমরা পাকিস্তানবাদ বলতে পারি,কারণ তারা আজো বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানোর দিবা স্বপ্নে বিভোর এবং সে লক্ষ্যেই প্রতিনিয়ত তাদের ষড়যন্ত্র চলমান।আর তাদের ষড়যন্ত্রের প্রধান হাতিয়ার হল ধর্ম অর্থাৎ সাম্প্রদায়িকতা।আমরা যদি গভীর বিশ্লেষণে যায় তাহলে দেখবো মহান মুক্তিযুদ্ধ অনেকাংশে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িকতার লড়াই।ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা মুখ্য হলেও এই সাম্প্রদায়িকতা শুধুমাত্র ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা নয়,এই সাম্প্রদায়িকতার অর্থ ব্যাপক এবং বিস্তৃত।সহজ ভাবে বলতে গেলে অসাম্যের বিরুদ্ধে সাম্যের লড়াই।

প্রচলিত ধারণায় অসাম্প্রদায়িক কথাটির অর্থ ধর্মীয় চরিত্র বিশ্লেষণে ব্যবহৃত হলেও বাঙ্গালি অসাম্প্রদায়িকতার সংজ্ঞা আমি মনে করি ভিন্ন।বাঙ্গালি অসাম্প্রদায়িকতা গণতন্ত্র,সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরেপক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদ এই চারকে একীভূত করেছে বলে আমি মনে করি। যাহোক এনিয়ে অন্যকোন লেখায় বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে। পাকিস্তানবাদের বিরুদ্ধে বাঙ্গালির এই লড়াইয়েই প্রাসঙ্গিক একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। আমি মনে করি একমাত্র একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিই পারে অসাম্প্রদায়িক মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ গড়ার লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যেতে কারণ এর জন্মই হয়েছে এই আন্দোলনের মধ্যদিয়ে। আমার এই উপলব্ধি হয়েছে কদিন আগেই, আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে ভাস্কর্য নিয়ে তথাকথিত ইসলামের হেফাজতকারীদের নাচন কুদন।

শেষ পর্যন্ত তারা জাতির পিতার ভাস্কর্য ভেঙেছে এবং সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো তাৎক্ষণিক ভাবে আওয়ামীলীগ তার কোন প্রতিবাদ করেনি।আওয়ামীলীগের সবচেয়ে আদর্শিক জায়গায় আঘাত লাগবার পরেও এমন নিরাবতা আমাদের শঙ্কিত করে তোলে।খোদ বঙ্গবন্ধু যাদের হাতে নিরাপদ নয় তাদের হাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কতখানি নিরাপদ তা বোধকরি ভেবে দেখবার বিষয় আছে। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি হল প্রথম সংগঠন যারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙ্গার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে।অর্থাৎ স্বাধীনতা,সার্বভৌমত্ব,মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রশ্নে সংকটকালে আজও নির্মূল কমিটি অনিবার্য। এই উপলব্ধি থেকে আমি মনে করি যতদিন মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ আছে ততদিন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলন প্রাসঙ্গিক।

যতই উন্নয়নের কথা বলিনা কেন দেশ আসলে চরম সংকটময় অবস্থার দিকে ক্রমাগত ধাবিত হচ্ছে। সাম্প্রদায়িক মৌলবাদ নতুন ভাবে আবারো মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। ধর্মের নামে মানুষ পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, নিরীহ মানুষের ঘর বাড়ি লুটপাট চলছে, সর্বপরি দেশে পাকিস্তানবাদ কায়েমের দেশি এবং বিদেশি ষড়যন্ত্র চলছে। এই অবস্থা চলতে দেওয়া যায়না,এর বিরুদ্ধে তরুণ সমাজকেই রুখে দাঁড়াতে হবে। কারণ ইতিহাস তাই বলে ৫২র ভাষা আন্দোলন থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তিতে বাঙালির সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দিকে তাকালে আমরা দেখবো তরুণ যুব ছাত্ররাই দেশের সংকটকালে ভূমিকা নিয়েছে।

বাঙ্গালির স্বাধিকার আদায়য়ের ইতিহাস মূলত ছাত্রদের লড়াইয়েরই ইতিহাস। তাই এই তরুণ যুব সমাজকে আগামীর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ২০১৩ সালের কথা মনে আছে নিশ্চয়, শাহবাগ আন্দোলন। সন্তান যখন কোন বিপদে পড়ে,সামান্য আশ্রয়ের জন্য দিকবিদিক খুঁজে কূলকিনারা পায়না তখন সে তার মাকে খোঁজে। বাংলার তারুণ্যও সেদিন ঠিক খুঁজে নিয়েছিল তার মাকে। শাহবাগে লাখো তরুণ্য…কন্ঠে তাদের দ্বীপ্ত স্লোগান “রাজাকারের ফাঁসি চাই”-মঞ্চের কাছে একটি বিশাল ছবি একজন মায়ের ছবি,ছবিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ও তার হাতে গড়া সংগঠন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি আজো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রগতিশীল মুক্তবুদ্ধির প্রতিটি দেশপ্রেমিক তরুণ যুবার আস্থার শেষ আশ্রয়স্থল।
তাই হে তরুণ! হে যুবা! আসুন, মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষিত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মাণের শপথে-শহীদ জননী জাহানারা ইমামের দেখানো পথে-একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলনে আরো একবার ঐক্যবদ্ধ হই। জয় বাংলা,জয় জনতা-জয় শহীদ জননী।

লেখক: ছাত্রনেতা, নির্বাহী সদস্য,
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, রাজশাহী মহানগর।

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ