রুমাইনা আবার উঠে দাঁড়াবেন

সোনালী ডেস্ক: কুড়িগ্রামের উলিপুরের মেয়ে রুমাইনা নাসরিন চার মাসের বেশি সময় হাসপাতালের বিছানায়। গত বছরের ২২ অক্টোবর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে মৌখিক পরীক্ষা দিতে বাড়ি থেকে কুড়িগ্রাম সদরে যাচ্ছিলেন তিনি। সঙ্গে ছিল ছোট ভাই। পথে তাদের বহনকারী সিএনজি অটোরিকশাকে পেছন থেকে একটি বাস ধাক্কা দিলে তিনি ছিটকে পড়েন রাস্তায়, আর তার ওপর পড়ে সিএনজি। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর চিচকিৎসক জানান, তার মেরুদÐ ভেঙে গেছে। ছিড়ে গেছে স্পাইনাল কর্ড। এরপর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
তবে আশার কথা, অনেকে এগিয়ে এসেছেন রুমাইনার চিকিৎসার জন্য। রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশাও সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন। তিনি হাসপাতালে গিয়ে রুমাইনার চিকিৎসার খোঁজ নিয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি রুমাইনাকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ^াস দিয়েছেন। বলেছেন, তিনি আবার উঠে দাঁড়াবেন।
রুমাইনা সদা হাস্যোজ্জ্বল প্রাণবন্ত একটি মেয়ে। ২০০৯-১০ সেশনে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়াশোনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। হলে আর ক্যাম্পাসে সব সময় ছিল তার মুখর পদচারণা। দাপিয়ে বেড়িয়েছেন খেলার মাঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সব সময় তার পদচারণায় মুখরিত থাকত ক্যাম্পাস। ব্যাডমিন্টন, ক্যারাম কিংবা তায়কোয়ানডো- সব খেলাতেই ছিলেন সমান পারদর্শী। তার ঝুলিতে পুরস্কারও আছে ৩০টির অধিক। এর মধ্যে বাংলাদেশ গেমসে ব্রোঞ্জ, হলের খেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন অনেকবার। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেনে বাদশা রাকসুর ভিপি ছিলেন। নিজের ক্যাম্পাসের এমন মেধাবী মেয়ের অসুস্থতার খবর শুনেই তিনি ছুটে যান হাসপাতালে।
এছাড়া রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসকসহ সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ রুমাইনার পাশে দাঁড়িয়েছেন। ঢাকার বিশিষ্ট চর্ম রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অধ্যাপক কবির চৌধুরী, ডা. অধ্যাপক এ বি এম আব্দুল্লাহও সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন। তারা রুমাইনাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন এবং তার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা ফেইস বুকে ‘রুমাইনার জন্য ভালবাসা’ নামে একটা পেইজ খুলেছেন। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, ভাল সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। শিক্ষকরাও এগিয়ে এসেছেন। রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য এবং রাকসুর সাবেক ভিপি ফজলে হোসেন বাদশাও এসেছিলেন রুমাইনাকে দেখতে। তিনি চিকিৎসকের সাথে কথা বলেন এবং যাওয়ার সময় রুমাইনাকে সান্ত¦না দিয়ে বলেন, কোন চিন্তা করো না, আমরা তোমার পাশে আছি।
গতকালই একটা বড় অপরেশন হলো মেরুদÐে। প্রায় ৫ ঘণ্টাব্যাপী জটিল অপারেশন। অপারেশনের ধকল চোখেমুখে, কিন্তু কন্ঠে মনে হলো উঠে দাঁড়ানোর প্রত্যয়। রুমাইনা এখন মনে করেন তিনি ভাল হয়ে যাবেন। চিকিৎসক বলছিলেন, রুমাইনার লোয়ার এবডোমেন (কোমর থেকে নিচের অংশ) থেকে অনবরত রক্ত ঝরছিল, ক্ষতবিক্ষত দেহের বিভিন্ন অংশ, সেখান থেকে আজকের অবস্থা অনেক ভাল। তবে আরও সময় লাগবে।
খুব ছোটবেলায় স্কুলশিক্ষক বাবাকে হারিয়েছেন রুমাইনা। পিতৃহীন মেয়েটির পরিবারে খুব বেশি স্বচ্ছলতা না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই জীবন যুদ্ধে নামতে হয়েছে তাকে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়েই চাকরি নেন ঢাকার একটি বেসরকারি স্কুলে। ইন্টারমিডিয়েট পড়ুয়া ছোট ভাইকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস শুরু করেন। সামান্য বেতনের চাকরিতে নিজেদের খরচ মিটিয়ে নিয়মিতভাবে বাড়িতে টাকা পাঠাতে হতো। আট ভাই বোনের মধ্যে রুমাইনা সপ্তম। জমিজমা বা নির্দিষ্ট আয়ের কোন ব্যবস্থা নেই। তার ভাইয়েরা তেমন কোন পড়াশুনা করেনি। রুমাইনা স্বপ্ন দেখতেন, তিনি পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবেন। জয়ের অনেকটা কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। আত্মবিশ্বাসী রুমাইনা মনে করেন মৌখিক পরীক্ষাটা দিতে পারলে চাকরিটা তার হতো। এরই মধ্যে ঘটে যায় দুর্ঘটনা।

শর্টলিংকঃ