রিমান্ডে নিজের দোষ স্বীকার করেনি সারদ

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের (রাবি) এক ছাত্রীকে পরিকল্পিতভাবে ধর্ষণ ও বন্ধুদের দিয়ে ভিডিও ধারণ করার অভিযোগ স্বীকার করেনি প্রধান অভিযুক্ত মাহফুজুর রহমান সারদ। উল্টো পুলিশের কাছে সে দাবি করেছে, ওই ঘটনায় সে ভুক্তভোগী! মামলায় সে রাজসাক্ষী হতে চায়।
গত মঙ্গলবার রাজশাহী নগরীর মতিহার থানা পুলিশের কাছে রিমান্ডে ছিল সারদ। গতকাল বুধবার তার রিমান্ড শেষ হয়েছে। বিকালে তাকে আদালতের মাধ্যমে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ তার স্বীকারোক্তি আদায় করতে না পারার কারণে আদালতে ১৬৪ ধারায় তার জবানবন্দি রেকর্ড হয়নি।
অভিযুক্ত সারদ রাবির অর্থনীতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তার বাড়ি। গত ২৭ জানুয়ারি সারদসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও পর্ণোগ্রাফি আইনে মামলা করেন রাবিরই এক ছাত্রী। এতে অভিযোগ করা হয়, পরিকল্পিতভাবে ওই ছাত্রীকে সারদ তার মেসে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেছে। শুধু তাই নয়, পুলিশ সেজে যাওয়া সারদের চার বন্ধু তাদের সামনেই ওই ছাত্রীকে শারীরিক সম্পর্ক করতে বাধ্য করেছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, সারদের সঙ্গে ধর্ষণের শিকার মেয়েটির বন্ধুত্ব ছিলো। ২৪ জানুয়ারি ঘুরতে সারদ যাওয়ার কথা বলে মেয়েটিকে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কাজলার সাঁকারা এলাকায় তার বন্ধু প্লাবন সরকারের ছাত্রাবাসে নিয়ে যায়। সেখানে কথাবার্তার এক ফাঁকে সারদ তাকে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। ওই সময় পূর্বপরিকল্পনা মতো রুমে প্রবেশ করে সারদের চার বন্ধু রাফসান আহম্মেদ, জয়, জীবন ও বিশাল তালুকদার। ছাত্রীটি এদের কাউকে আগে দেখেননি। যুবকরা নিজেদের পুলিশের লোক পরিচয় দিয়ে সারদ ও ছাত্রীটিকে থানায় নিয়ে যাওয়ার ভয় দেখায়। একপর্যায়ে অস্ত্রের মুখে ছাত্রীকে সারদের সঙ্গে কয়েকবার শারীরিক সম্পর্ক করতে বাধ্য করে। আর সেইসব দৃশ্য তারা নিজ নিজ মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে।
ভুক্তভোগী ছাত্রীর জবানবন্দি অনুযায়ী, ওই রাতে সারদের সঙ্গে অন্তত তিনবার তাকে সবার সামনেই শারীরিক সম্পর্ক করতে বাধ্য করা হয়। রাত আনুমানিক ২টার দিকে মেয়েটির কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করে তারা। পরে বান্ধবী ও অন্য বন্ধুদের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিজের বিকাশ নম্বরে নিয়ে তা যুবকদের একজনের নম্বরে ট্রান্সফার করে দেন ওই ছাত্রী। পরে ওই রাতেই ছাত্রীটিকে মেস থেকে বের করে দেয়া হয়। পরের দিন ওই ভিডিও দেখিয়ে তার কাছে আবার ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ভিডিওটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ারও হুমকি দেয়া হয়। এ কারণে পরিবারকে বিষয়টি জানিয়ে থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী ছাত্রী।
এ মামলায় বিশাল ছাড়া সবাইকেই গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর জয় ও জীবন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়। তাই তাদের রিমান্ডে নেয়ার প্রয়োজন হয়নি। তবে স্বীকারোক্তি না দেয়ায় প্রধান আসামি সারদসহ অন্য তিনজনের তিন দিন করে রিমান্ডের আবেদন করা হয়। এদের মধ্যে শুধু সারদেরই দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। রিমান্ডে সারদ স্বীকারোক্তি না দিলেও পুলিশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সারদ রাবির আগে জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগেই পড়াশোনা করতো। সেখানে তার ছাত্রত্ব বাতিল হয়েছে। জগন্নাথেও সে এক মেয়েকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে প্রতারণা করেছে। রাবিতেও তার সম্পর্ক ছিলো একাধিক মেয়ের সঙ্গে। এখানে ভর্তির পর সারদ নিজেকে গরীব পরিচয় দিয়ে ধনাঢ্য পরিবারের মেয়েদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে টাকা-পয়সা নিত। কিন্তু সারদ নিজেও ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। তার বাবা দীর্ঘদিন ইউরোপে ছিলেন। এখন দেশে আছেন। বেশিরভাগ কথা বলেন ইংরেজিতে। ছেলেকে বাঁচাতে তিনি পুলিশের কাছে তদবির করছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মতিহার থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবদুর রহমান বলেন, রিমান্ডে সারদ ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সে দাবি করেছে, অস্ত্রের মুখে তাকে শারীরিক সম্পর্ক করতে বাধ্য করা হয়েছে এবং তার ভিডিও ধারণ করা হয়েছে। এতে সে-ও ভুক্তভোগী। সে-ই ঘটনার রাজসাক্ষী হতে চায়। তবে মামলার আসামী জয় ও জীবন তাদের জবানবন্দিতে বলেছে, ঘটনার আগের রাতে এক চায়ের দোকানে বসে এ ঘটনার পূর্বপরিকল্পনা করা হয়। এতে সারদও জড়িত। সবকিছু পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ীই হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, প্রয়োজন হলে সারদকে আবার রিমান্ডে নেওয়া হবে। কারণ, মেয়েটি সারদকেই প্রধান আসামি করেছেন।
এদিকে সারদকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবন বহিষ্কারসহ ছয় দফা দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল বেলা ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে তারা এ দাবি জানান। শিক্ষার্থীদের অন্য দাবিগুলো হচ্ছে- বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়ন সেলের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, অপরাধী যাতে আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসতে না পারে তা নিশ্চিত করা, নারী বান্ধব ক্যাম্পাস, বহিরাগতদের চলাচলে নিয়ন্ত্রণ, ক্যাম্পাসে মোটসাইকেলের সর্বোচ্চ গতি ২০ কিলোমিটার করা।

শর্টলিংকঃ