রাবি শিক্ষক সমাজের দ্বিধাবিভক্তি ও উদ্ভূত পরিস্থিতি

  • 288
    Shares

স্বাধীনতাপূর্বকালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের চারটি পুরাতন পাবলিক বা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয়ে থাকে ১৯৭৩’র অ্যাক্ট বা অধ্যাদেশ অনুযায়ী। অবশিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হয় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের আওতায়। অপর দিকে স্বাধীনতা উত্তরকালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের পরিচালনার জন্য তাদের নিজ নিজ আইন বিদ্যমান এবং সে আইন সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত। ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ও প্রাচীন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রধানতম একটি। কাজেই, এই বিশ্ববিদ্যালয়টি বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত ১৯৭৩ সালের মর্যাদাপূর্ণ অধ্যাদেশ দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে বা হওয়ার কথা (?)।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী করোনাকালীন মহামারীর ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত নেতিবাচক কিছু সংবাদ ও কতিপয় শিক্ষকের পারস্পরিক আক্রমণাত্মক বা বিদ্বেষমূলক প্রচারণার কারণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যন্তরীণ জটিলতাই কেবল নয়, মর্যাদাহানিকর অবস্থাও দৃষ্ট হয়েছে। যার ফলস্বরূপ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ আজ দ্বিধাবিভক্ত ও পরস্পর মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। কিছুকাল যাবত স্থানীয়, জাতীয়, আন্তর্জাতিক ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কিত যে সকল নেতিবাচক বিষয়াদি প্রকাশিত ও আলোচিত হচ্ছে; তা দেশের ঐতিহ্যবাহী ও অন্যতম এই প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদার সাথে যায় না। এই সকল ঘটনা যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ অবস্থা থেকে সৃষ্ট, তেমনই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা সংক্রান্ত আইনি জটিলতা থেকেও কিঞ্চিৎ সৃষ্ট বলা যেতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষকবৃন্দ স্পর্শকাতর এই পরিস্থিতিতে ভীষণ উদ্বিগ্ন। তরুণ শিক্ষকবৃন্দ মনে করেন, উদ্ভূত পরিস্থিতির অবতারণা ঘটিয়েছেন মুখ্যত বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছুসংখ্যক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক। প্রসঙ্গটি যথাস্থানে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হবে। তার পূর্বে ৭৩’র অধ্যাদেশভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন দ্বারা পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে ১৯৭৩’র অধ্যাদেশ অনুসরণ করা হয়, যা স্বাধীনতাপূর্বকালীন অন্য তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ও করে থাকে। ৭৩’র অধ্যাদেশ দ্বারা পরিচালিত সকল সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ স্বাধীনতা উত্তরকালে প্রতিষ্ঠিত সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় মুখ্যত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন দ্বারা। এই নিয়ন্ত্রণ স্বাধীনতা পূববর্তী ৭৩’র অধ্যাদেশ দ্বারা পরিচালিত ও স্বাধীনতা উত্তর সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে কীভাবে প্রয়োগ করা হবে এমন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা সম্পর্কেও শিক্ষকবৃন্দ তেমন জ্ঞাত নন। কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে ৭৩’র অধ্যাদেশভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ ও সরকারি আইনভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশকিছু প্রায়োগিক জটিলতাও রয়েছে। ইউজিসি’র নির্দেশনা মোতাবেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন দ্বারা স্ব স্ব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ পদটি হলো উপাচার্য তথা ভাইস চ্যান্সেলরের পদ। প্রতিথযশা, প্রাজ্ঞ, দূরদর্শী অধ্যাপকবৃন্দই মূলত এই পদের জন্য মনোনীত হয়ে থাকেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনেরর পূর্বে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে আইন দ্বারা পরিচালিত হতো, তা কে বলা হতো ‘কালো আইন’। উক্ত আইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কোনো রকম স্বাধীনতা ছিল না। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পক্ষ থেকে একটি গণতান্ত্রিক কল্যাণমুখী অধ্যাদেশ প্রণয়নের দাবি ওঠে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষকদেরকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতেন এবং শিক্ষকদের দাবি-দাওয়ার প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ছিলেন। যার ফলে বিশ্ব¦বিদ্যালয় অ্যাক্ট/অধ্যাদেশ – ১৯৭৩ মহান জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩’র অধ্যাদেশ অনুযায়ী সিনেটের মাধ্যমে উপাচার্য নির্বাচনের বিধান রয়েছে। বিধান অনুযায়ী প্রতি চার বছর পর পর সিনেটের মাধ্যমে উপাচার্য নির্বাচিত হবার কথা। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহণের পরে মাননীয় চ্যান্সেলর তাঁর নিজ ক্ষমতাবলে প্রফেসর এম আব্দুস সোবহান মহোদয়কে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ দেন। ২০১৩ সালে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার ফলে মাননীয় চ্যান্সেলর তাঁর নিজ ক্ষমতাবলে প্রফেসর মুহাম্মদ মিজান উদ্দিন মহোদয়কে উপাচার্য পদে নিয়োগ দেন। ২০১৭ সালে তার মেয়াদ শেষ হলে মাননীয় চ্যান্সেলর তাঁর নিজ ক্ষমতাবলে প্রফেসর এম আব্দুস সোবহান মহোদয়কে চার বছরের জন্য পুনঃনিয়োগ দেন। উপাচার্য পদে পুনঃনিয়োগের এই ঘটনা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথম, বিরল এবং সম্মানের। মেধাবী, দক্ষ এবং অভিজ্ঞ একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের জন্যে উপাচার্য পদটি যথাযথ মর্যাদার। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকের মনেই এই মর্যাদার আকাক্সক্ষা থাকতে পারে। যা মোটেই দোষের নয়। কিন্তু সে আকাক্সক্ষার প্রকাশ মার্জিত না হলে দেখা দেয় সংকট ও জটিলতা। এই জটিলতার মূলে রয়েছে ৭৩’র অধ্যাদেশের যথাযথ কার্যকারিতা না থাকা। উপাচার্য প্যানেলে নির্বাচন না থাকার ফলে পদপ্রত্যাশী জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের মধ্যে শুরু হয় পারস্পরিক প্রতিযোগিতা, দ্বন্দ্ব; সৃষ্টি হয় উপদল।

এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে শিক্ষক সমাজে যে চাপান-উতার চলে, তার ঢেউ লাগে শিক্ষার্থীদের ওপর। কখনোবা বিপরীত আদর্শের শিক্ষকদের দলে ভিড়িয়ে সংখ্যা বাড়িয়ে কোনো কোনো সমমনা রাজনৈতিক মনষ্ক ক্ষমতালিপ্সু শিক্ষক উপদল বা নেতৃত্ব, ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের সাথে এমন আচরণ বরাবরই করে আসছেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পাঠদানকেও ব্যাহত করে। যখন যে প্রশাসনই দায়িত্বে থাক না কেন, এর ব্যতিক্রম ঘটে না। তরুণ শিক্ষকেরা না পারেন জ্যেষ্ঠদের কিছু বলতে, না পারেন নিজেরা মেনে নিতে। সময় বুঝে কেউবা বিশেষ গোষ্ঠীর সাথে মিশেও যান, কেউবা স্বাধীনভাবে চলতে গিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হন। কার্যত ব্যাহত হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও উচ্চশিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর একদিকে রয়েছে পুঁজির চাপ অন্যদিকে রয়েছে জ্ঞানচর্চার দায়। অন্যান্য যে কোনো পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য যেখানে শিক্ষা দেয়া, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান উৎপাদনেরও দায় রয়েছে। মনে রাখতে হবে যে চ্যান্সেলর মনোনীত অনির্বাচিত একজন উপাচার্য কখনোই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না। তিনি না পারেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে, না পারেন সরকারের সন্তুষ্টি অর্জন করতে। তিনি ইউজিসি’র নির্দেশনা অনুসরণ করতে গিয়েও ৭৩’র অধ্যাদেশ রক্ষা করতে পারেন না, পারেন না স্থানীয় রাজনৈতিক চাপ সামলাতে। তার ওপর যে সকল আমলাতান্ত্রিক নির্দেশনা আসে, তা ৭৩’র অধ্যাদেশ না কি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী সম্পাদিত হবে, ঠিকঠাক বুঝে ওঠাও মুশকিল হয়ে যায় ক্ষেত্রবিশেষে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতা প্রত্যাশী ও প্রতিদ্বন্দ্বী সহকর্মীদের অভ্যন্তরীণ চাপ, স্থানীয় ও জাতীয় রাজনৈতিক চক্র, ছাত্ররাজনীতি প্রভৃতি চাপ মাথায় রেখে কাজ করতে গিয়ে তিনি ও তার প্রশাসন তখন পড়ে যান অধিকতর জটিল পরিস্থিতিতে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনা এই জটিল পরিস্থিতিরই প্রকাশ মাত্র। সরকারের উচিত বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে ৭৩’র অধ্যাদেশ ও সিনেট চালু রাখা এবং তদনুযায়ী উপাচার্যকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ প্রদান করা। নয়তো একজন উপাচার্যের পক্ষে কখনোই কর্তব্যকর্ম সঠিকভাবে পালন করা সম্ভব নয়। স্বচ্ছতার স্বার্থে যে কোনো প্রশাসকের বিরুদ্ধেই অভিযোগ উত্থাপন করার যেমন সুযোগ রয়েছে, তেমনই তাকে অহেতুক ব্যক্তি আক্রমণ এবং জাতীয়ভাবে মর্যাদাহানিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন করতে, উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে বিশেষ স্বার্থ হাসিলের জন্যে অভিযোগ উত্থাপন করা হচ্ছে কি না; তাও বিবেচনা জরুরি। বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে যে সকল অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, তা যাচাই ও তদন্তের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। পাল্টাপাল্টি যে সকল বিবৃতি, কর্মসূচী ও শিষ্টাচার বহির্ভূত বক্তব্য প্রদান করা হচ্ছে, তা প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের জন্য মোটেই স্বস্তিদায়ক নয়। শিক্ষকবৃন্দ প্রত্যাশা করছেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার স্বার্থে নির্বাচনবহির্ভূত নিয়োগকৃত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ববর্তী ও বর্তমান উভয় প্রশাসনের সার্বিক কর্মকাণ্ড বিশেষ তদন্তের মাধ্যমে অনুসন্ধান।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার স্বার্থেই যে গণশুনানীর আয়োজন করেছেন তা সন্দেহাতীত; কিন্তু, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার স্বার্থে এই শুনানীর উদ্যোগ যথাযথ বলে অনেকেই মনে করছেন না। বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত ৭৩’র অধ্যাদেশটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ও আভিজাত্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু গণশুনানীর প্রসঙ্গটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ও ঐতিহ্যের সাথেও বিপরীত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্যও অবমাননার শামিল। উত্থাপিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে কেবল সরেজমিনে তদন্ত সাপেক্ষেই প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা সম্ভব। কাজেই, দেশের বৃহত্তম ও প্রাচীন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি সৃষ্টিতে কতিপয় পরশ্রীকাতর জ্যেষ্ঠ শিক্ষক পরস্পরের বিরুদ্ধে যে নেতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন, তা কাম্য নয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আমলা, রাজনীতিক ও সরকারি চাপমুক্ত রাখতে ৭৩’র অধ্যাদেশ অনুযায়ী পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টিতে সম্ভাব্য গণশুনানী পুন্ররবিবেচনা ও যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন।

লেখক: সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট ও শিক্ষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: [email protected]

শর্টলিংকঃ