রাজশাহী জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ


স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা মনজুর কাদেরের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে শিশু একাডেমির ৭ জন কর্মচারী মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন। তবে মনজুর কাদের অভিযোগ অসত্য দাবি করেছেন।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ৫ অক্টোবর জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা মনজুর কাদের রাজশাহীতে যোগ দেন। এরপর থেকেই শিশু একাডেমি ও শিশু বিকাশ কেন্দ্রে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা করে আসছেন।

তিনি তার মুঠোফোনে গোপনে কর্মচারীদের ভয়েস রেকর্ডিং করেন এবং পরবর্তীকালে তা ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। এমনকি চাকরিচ্যুতির হুমকি দেন। কর্মচারীদের প্রায়ই হেয়প্রতিপন্ন করে থাকেন।

কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শিশু বিষয়ক কর্মকর্তার আচরণে কর্মচারীরা সবসময় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে থাকেন। তারা তাদের দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে প্রতিপালন করতে পারেন না। অভিযোগপত্রে বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানান হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা মনজুর কাদেরের বিরুদ্ধে একাডেমির কম্পিউটার, জেনারেটর ও মোটরসাইকেল আত্মসাত করেছেন। নামমাত্র মূল্যে গাছ বিক্রি করেছেন। এছাড়া শিক্ষা সফরের অর্থ আত্মসাত, একাডেমির মিলনায়তন ও উন্মুক্ত মঞ্চ ভাড়ার অর্থ আত্মসাত, শিশু বিকাশ ও প্রাক-বিদ্যালয় শিক্ষা কেন্দ্রের শিশুদের জুতা ও মোজার অর্থ আত্মসাতসহ অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, একাডেমির কর্মী ও অভিভাবকদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণও করেন তিনি।

মনজুর কাদের জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা পদে রাজশাহীতে যোগদান করার পর থেকে প্রতিষ্ঠানের মিলনায়তন ও উন্মুক্ত মঞ্চ ভাড়া দেয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। এমনকি শিশুদের প্রশিক্ষণ ক্লাস বন্ধ করে মিলনায়তন ভাড়া দেয়ার ঘটনাও আছে। করোনা পূর্ববর্তী সময়ে প্রতিমাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় হয়। কিন্তু এই অর্থ কোন খাতে জমা বা ব্যয় করেছেন তার হিসাব নেই।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, শিশু একাডেমির সীমানার মধ্যে লাগানো প্রায় ৩০ বছরের পুরাতন ৫টি গাছ টেন্ডার বা কোটেশন ছাড়াই নাম মাত্র মূল্যে বিক্রি করা হয়। যদিও দুটি গাছ কাটার অনুমোদন ছিল। ৫টি গাছের মূল্য বাবদ মাত্র ৪ ৬৯৭ টাকা জমা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র মতে, তিনটি ইউক্যালিপটাস, একটি মেহগনি ও একটি ঝাউ গাছ তিনি বিক্রি করেছেন। ওই ৬টি গাছের মূল্য কম করে হলেও লাখ টাকা।

জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তার ব্যবহারের জন্য বরাদ্দকৃত ৭০ সিসি মোটরসাইকেল যার রেজিস্ট্রেশন নম্বর রাজ মেট্টো এ-০২-০০১২ (হোন্ডা কোম্পানি লিমিটেড) সরকারি বিধিবিধান না মেনে গোপনে মাত্র ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয় বলে জানা গেছে। মোটরসাইকেল বিক্রির অর্থের কোনো হদিস নেই।

শিশু বিকাশ ও প্রাক বিদ্যালয়ের সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা লেখাপড়া করে। এই শিশুদের জন্য বরাদ্দকৃত জুতা ও মোজার টাকা করোনাকালে তুলে নেয়া হয়েছে। অথচ ওই শিক্ষার্থীরা জুতা ও মোজা পায়নি। ৩০ জন করে দুই শিফটে ৬০ জন সুবিধাবঞ্চিত শিশু সকাল ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত শিক্ষা নিয়ে থাকে। তবে করোনাকালে প্রাক-বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ আছে।

শিশু একাডেমির শিশুদের কম্পিউটার দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষে ২০১২ একটি কম্পিটার ল্যাব স্থাপন করা হয়। ল্যাবের জন্য ৫টি কম্পিউটার ও টেবিল-চেয়ার কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে প্রদান করা হয়। ২০১৭ সালের পর থেকে ওই ৫টি কম্পিউটারের কোনো খোঁজ নেই। এছাড়া সিসিমপুর প্রকল্পের একটি জেনারেটর ও দুটি ভ্যানেরও কোনো হদিস নেই।

আগস্ট মাস শোকের মাস। জাতি নিবিষ্ঠ শোকাবহ পরিবেশে মাসটি পালন করে থাকে। কিন্তু জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা শিশু একাডেমিতে ধুমধাম করে তার মেয়ের জন্মদিন পালন করেন। ২০১৮ ও ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট মেয়ের জন্মদিন শিশু একাডেমিতে আমন্ত্রিত অতিথিদের নিয়ে পালন করা হয়। এ বছর করোনা সংক্রমণের কারণে একাডেমিতে অনুষ্ঠান হয়নি।

মঞ্জুর কাদেরের মেয়ে মরিয়ম মনজুরে নিশি শিশু একাডেমির চিত্রাঙ্কন প্রশিক্ষক। মেয়ের চিত্রকর্ম একাডেমির করিডোর ও ঘরে প্রদর্শন করছেন। অথচ সেখানে আর কারো চিত্রকর্ম স্থান পায়নি। লাইব্রেরি কক্ষে বঙ্গবন্ধুসহ অপর দুই জগতখ্যাত মণীষীর শিশুদের নিয়ে উদ্ধৃতি প্রদর্শিত হতো-বর্তমানে সেই উদ্ধৃতিগুলো লাইব্রেরি থেকে অপসারিত হয়েছে।

সরকারের নির্দেশে করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে। এমনকি এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। সেই মুহূর্তে রাজশাহী শিশু একাডেমিতে বিভিন্ন বিষয়ের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। কোমলমতি শিশুদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলা দেয়া হয়েছে। অথচ রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রীয় শিশু একাডেমির প্রশিক্ষণ ক্লাস এখনো বন্ধ আছে।

কর্মকর্তার নিজের বাথরুম টাইলসে টিপটপ হলেও শিশু ও অভিভাবকদের জন্য নির্দিষ্ট বাথরুমে যাওয়ার উপায় নেইÑ নোংরা দুর্গন্ধময়। মাসে একবারও পরিষ্কার করা হয় না। বাথরুম নিয়ে অভিভাবকদের অভিযোগ করলেও তিনি তা আমলে নেন না।

জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা মনজুর কাদেরের স্বেচ্ছাচারিতার আরও নজির আছে। নিরাপত্তার নামে শিশু একাডেমিতে কুকুর লালন-পালন করেন। কিন্তু কুকুরগুলো ভীষণ আক্রমণাত্মক। শিশু ও অভিভাবকদের তেড়ে আসে। অভিভাবকদের সাথে এ নিয়ে বাক-বিতণ্ডাও হয়। ইতোমধ্যেই একাডেমির লাইব্রেরিয়ান কাম মিউজিয়াম কিপারসহ কয়েকজন কুকুর কর্তৃক আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা মনজুর কাদের বলেন- জেলা প্রশাসক স্থানীয় অভিভাবক। তার দিক নির্দেশনা ছাড়া আমি কিছু করতে পারব না। তবে আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ গুলো করেছে তা সঠিক নয়। তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তদন্ত হলে অভিযোগের কোন সত্যতা মিলবে না।

সোনালী/এমই

শর্টলিংকঃ