রাজশাহীর সিনেমা হল এখন শুধুই স্মৃতি

ফাইল ফটো

মাহী ইলাহি: ‘আসিতেছে আসিতেছে’ ও ‘চলিতেছে চলিতেছে’ বলে মাইকে প্রচার হতো বিভিন্ন সিনেমার নাম। সিনেমার প্রচার হতো জমকালোভাবে, রিকশার চারদিকে ছবির পোস্টার, কত রঙে-রঙিন করে সাজিয়ে সিনেমা হলে যাওয়ার জন্য আকৃষ্ট করা হতো দর্শকদের। ছিলো না প্রচারে কমতি। মালিক ও দর্শকদেরও ছিলো প্রবল আকুতি। রাজশাহীতে সিনেমা হল কথাটি যেন আজ শুধুই স্মৃতি! হারিয়ে গেছে সেই দিন, হারিয়ে গেছে ছবি, হারিয়ে গেছে সেই পরিচালক, নির্মাতা এবং কলাকুশলীর কলরব।

রাজশাহীর চলচ্চিত্রচর্চার ইতিহাস অনেক প্রাচীন। এক সময় স্ত্রী, প্রেমিকা ও ছেলে মেয়েরা বায়না ধরতেন সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখার। এখন আর সিনেমা হলে যাওয়ার বায়না নেই এ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের। কর্মব্যস্ত মানুষের ক্লান্তি দূর করতে প্রয়োজন হয় বিনোদনের। আর এই বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম চলচ্চিত্র। বিনোদনের মাধ্যম হলেও এই চলচ্চিত্র শিল্প অর্থনীতিতে রাখে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। মা-বাবা, ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজন মিলে সিনেমা হলে চলচ্চিত্র দেখতে যাওয়ার ঘটনা এককালে খুবই সাধারণ ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই অবস্থা আর নেই।

বিভিন্ন কারণে রাজশাহীর সিনেমা হলগুলো বন্ধ। ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর শাকিব খান, নুসরাত ফারিয়া, সায়ন্তিকা অভিনীত ‘নাকাব’ সিনেমাটি শেষদিনের মতো চলেছিল রাজশাহীর উপহার সিনেমা হলে। এরপর ১২ অক্টোবর রাজশাহীবাসীকে ‘উপহার’ দেয়া শেষ সিনেমা হলটিও বন্ধ হয়ে যায়।

রাজশাহীর জনপ্রিয় সিনেমা ১৯৯১ সালের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, রাজশাহী জেলায় প্রেক্ষাগৃহ ছিল ৫৫টি। তবে সরেজমিন জেলায় ওই সময় ২৫টি প্রেক্ষাগৃহের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এর মধ্যে বর্তমানে চালু আছে মাত্র পাঁচটি সিনেমা হল। এক সময় বাংলাদেশে সপ্তাহে দুটি চলচ্চিত্র মুক্তি পেত। কিন্তু এখন অনেক সময় সপ্তাহে একটি চলচ্চিত্রও মুক্তি পায়নি। ফলে মানসম্মত চলচ্চিত্রের অভাবে ধুঁকেছে রাজশাহীর সিনেমা হলগুলোও। অর্থাভাব, প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়া, ভালো কাহিনি, নতুন শিল্পী তৈরি না হওয়া, নকল গল্প ও গান, একঘেয়েমি কাহিনি, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের অভাব ইত্যাদি নানা কারণে ধস নামে সিনেমা ব্যবসায়।

হলগুলোর মধ্যে একে একে সব বন্ধ হয়ে গেছে। নগরীতে প্রেক্ষাগৃহ ছিল ছয়টি। এগুলো হলো অলকা পরবর্তী নাম স্মৃতি, কল্পনা পরবর্তী নাম উৎসব, স্নিগ্ধা পরবর্তী নাম উপহার, বর্ণালী, লিলি এবং কাটাখালীর রাজতিলক। এগুলোর মধ্যে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রেক্ষাগৃহটি ছিল রাজশাহীর বর্ণালী সিনেমা হল। এর আসন ছিল এক হাজার ৩৭৩টি। ২০০৭ সালে শহরের সবচেয়ে পুরনো প্রেক্ষাগৃহ স্মৃতি সিনেমা হল ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে রাজশাহীর ভিক্টোরিয়া ড্রামাটিক ক্লাবের উদ্যোগে নাট্য আন্দোলন এগিয়ে নিতে নির্মিত হয়েছিল ‘রাজা প্রমথনাথ টাউন হল’। প্রতিষ্ঠা থেকে সেখানে নিয়মিত বাংলা সাহিত্য ও নাট্যচর্চা হতো। ১৯১৯ সালের ২ এপ্রিল ভিক্টোরিয়া ক্লাবের কাছ থেকে হলটি কিনে নেয় রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন। পরে রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশনের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে অলকা সিনেমা হল যাত্রা শুরু করে। নব্বইয়ের দশকে স্মৃতি সিনেমা হল নামে হলটির নামকরণ হয়। পরে ওই হল ভেঙে রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন বহুতল ভবন নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছে।

নগরীর আলুপট্টির উৎসব (পূর্ব নাম ‘কল্পনা’) সিনেমা হলে ২০১০ সালের জুলাইয়েও চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়েছে। পরে তা ভেঙে ‘স্বচ্ছ টাওয়ার’ নামে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়। নগরীর কাদিরগঞ্জ ও আমবাগানের মধ্যবর্তী এলাকায় ছিল ‘বর্ণালী’ সিনেমা হল। বর্তমানে হলটি না থাকলেও শহরের ওই এলাকার নামকরণ আছে বর্ণালীর মোড় নামেই। মোল্লাপাড়ার লিলি সিনেমা হলটিও আর নেই। দুর্গাপুরে নার্গিস, নওহাটায় বাবুল, তানোরে আনন্দ, কেশরহাটে দিনান্ত, বাগমারার ভবানীগঞ্জে শাপলা, তাহেরপুরে ক্ষণিকা, পুঠিয়ার রুবি ও মুক্তা সিনেমা হলে ঈদ বা পূজা উপলক্ষে মাঝেমধ্যে সিনেমা চালানো হয়। তবে বছরের অধিকাংশ সময়ই তা বন্ধ থাকে।

সিনেমার ব্যবসা নেই কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের সভাপতি ড. সাজ্জাদ বকুল বলেন, হলগুলোতে সিনেমা বসে দেখার মতো কোনো পরিবেশ নেই। ভালোমানের চলচ্চিত্র তৈরি না হওয়ায় দর্শক হলবিমুখ হয়ে পড়েছেন। কোন মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষরা এখন আর সিনেমা হলে যায় না। একটা সময় সিনেমায় অশ্লীলতায় ভরা ছিল সেই পরিবেশ থেকে বের হতে পারলেও এখন ভালো মানের সিনেমা তৈরি করতে পারছেন না পরিচালকরা। বিভাগীয় শহরে সিনেমা হলও নেই, এটা সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে মেনে নিতে কষ্ট হয়। রাজশাহীতে আধুনিকভাবে একটি সিনেমা হল গড়ে তোলার জন্য কর্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে। সেখানে পরিবারসহ সিনেমা দেখা যাবে এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। তাহলে বিভাগীয় শহরে আবারও বিনোদন কেন্দ্র গড়ে উঠবে।

ঋত্বিক ঘটক ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি ডা. এফ এম এ জাহিদ বলেন, রাজশাহীর মতো একটি বিভাগীয় শহরে একটি প্রেক্ষাগৃহও নেই। প্রেক্ষাগৃহ ভেঙে নির্মাণ করা হয়েছে বহুতল ভবন। এই বহুতল ভবন কোন বিনোদনের ব্যবস্থা হতে পারে না। আমরা আন্দোলন করেছিলাম সিনেমা হলগুলো রক্ষা করার জন্য। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। শিক্ষানগরীতে একটি সিনেমা হল নেই এর চেয়ে দুঃখ, কষ্ট, ক্ষোভ, লজ্জা কাজ করে। তিনি বলেন, সরকারি হোক বা ব্যক্তিগত হোক রাজশাহী শহরে সিনেমা হল খুব প্রয়োজন। ভালো মানের ছবি দিয়ে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব। ঋত্বিক ঘটকের যে পৈতৃকবাড়ি রয়েছে সেখানে আধুনিক মানের সিনেমা হল তৈরি করা যেতে পারে। এতে ঋত্বিক ঘটকের স্মৃতিও বেঁচে থাকবে, নতুন প্রজন্মও জানবে তার সম্পর্কে।

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ