দুর্ভোগে রাজশাহী নগরবাসী

  • 18
    Shares

তৈয়বুর রহমান: নগরীর বিভিন্ন ওয়াডের্র পাড়া-মহল্লায় রাস্তা ও ড্রেনের অভাব রয়েছে। বড় সড়ক-মহাসড়কের প্যাকেজিং এর কাজ হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু পাড়া-মহল্লায় পাকা রাস্তা ও ড্রেনের অভাবে নগরবাসীর দুর্ভোগ চরমে উঠেছে।

এদিকে, নগরীর অধিকাংশ জনগুরত্বপূর্ণ সড়কগুলো আবার ভাঙতে শুরু করেছে। টিকাপাড়া গোরস্থানের সম্মুখে সড়ক, বর্ণালী হতে টিটিসিগামী সড়কসহ নগরীর অধিকাংশ সড়কে এখন বড় বড় গর্ত। এসব রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলতে গিয়ে অনেক সময় গাড়ির যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বর্ষায় সড়কে পানি জমে থাকায় এ গর্তের সৃষ্টি হয়েছে বলে এলাকাবাসী জানান। তার ওপর রয়েছে গ্যাসলাইন নিতে গিয়ে কাটা ও ভাঙা সড়ক যা এখনও পুরোপুরি সংস্কার হয়নি।

ভুক্তভোগীরা জানান, আরডিএর নজরদারি না থাকায় পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠছে অপরিকল্পিত বাড়ি-ঘর। ফলে সেখানে পরিকল্পিত রাস্তা ও ড্রেন হচ্ছে না। রাস্তা ও ড্রেনের অভাবে চলাচল করা কঠিন হচ্ছে এলাকাবাসীর। কর্তৃপক্ষের নজর নেই সেদিকে। আরডিএর নিয়মের তোয়াক্কা না করেই অনেকেই বাড়ি-ঘর তৈরি করছেন।

তেরখাদিয়া মধ্যপাড়ার সাগর আলী জানান, রাস্তা ও ড্রেনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেই বেশ কয়েক বছর আগে রাসিকের পক্ষ থেকে বিভিন্ন এলাকা মাপজোক করা হয়। মাপজোক শেষে অনেক রাস্তার টেন্ডারও হয় বলেও তিনি জানান। কিন্তু ওই পর্যন্তই শেষ ।

এ সম্পর্কে সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তা জয়নাল আবেদীন বলেন, নগরীতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে থ্রি লেন-ফোর লেন সড়কের উদ্বোধন হচ্ছে। আবার ফ্লাইওভার কাজের উদ্বোধনও হচ্ছে। কিন্তু হাজার হাজার মানুষ যে পাড়া-মহল্লায় বাস করেন, সেখানে কোন কাজ হচ্ছে না। ড্রেন ও রাস্তার কাজ না হওয়ায় মানুষ দুর্ভোগের মধ্যে বাস করছেন। বৃষ্টি হলে বাড়ি থেকে বেরুলেই কাদা না হলে পানিতে পা পড়ে। আশপাশের বাড়ির ল্যাট্রিনের দুর্গন্ধযুক্ত পানি মাড়িয়ে অনেক মুসল্লিকে মসজিদে নামাজ আদায় করতে যেতে হয়।

মধ্য নওদাপাড়ার মোস্তাক হোসেন বলেন, নগরীর ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের অধিকাংশ এলাকায় নতুন নতুন বাড়ি-ঘর তৈরি হলেও পাঁচ বছরের মধ্যে কোন রাস্তা ও ড্রেনের কাজ হয়নি।

নওদাপাড়া এলাকার ইসমাইল হোসেন বলেন, নওদাপাড়া টেক্সটাইল মিল ও হামিদপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশেই অবস্থিত রোডপাড়া-মহল্লা। তার পাশেই রয়েছে মধ্য নওদাপাড়া মহল্লা। আর নওদাপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পূর্বেই বাগানপাড়া ও ভাঁড়ারীপাড়া। এসব পাড়া-মহল্লায় হাজার হাজার মানুষ বসবাস করে। ঘনবসতি এলাকা হওয়া সত্ত্বেও সেখানে না আছে ড্রেন, না আছে কোন ভাল রাস্তা। সেখানে ড্রেন ও রাস্তার অভাবে এক বাড়ির ময়লা পানি আরেক বাড়ির ওপর দিয়ে যাবার কারণে ঝগড়া-বিবাদ লেগেই থাকে।

মহল্লার অটোচালক সাইদুর রহমান বলেন, এ এলাকাটি একটি অবহেলিত এলাকা। গত ১০-১২ বছরের মধ্যে এ এলাকায় কোন ড্রেন ও রাস্তার কাজ হয়নি।

এ সম্পর্কে রাজশাহী বেতারের বিশিষ্ট গীতিকার ও সঙ্গীত শিক্ষক আব্দুল মতিন বলেন, আমি এ এলাকায় প্রায় ২৫ বছর বসবাস করি। আমার এ এলাকায় সে ধরনের কোন উন্নয়ন কাজ হয়নি। এলাকায় নতুন ভবন হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু কোন রাস্তা ও ড্রেন হচ্ছে না।

তিনি বলেন, এ ব্যাপারে ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে বলে কোন কাজ হচ্ছে না। তবে আমার বাড়ির পাশ দিয়ে ছোট একটি কাঁচা রাস্তা গেছে। এর ওপর দিয়েই এলাকাবাসীকে চলাচল করতে হয়। একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তার ওপর পানি জমে। এর ওপর দিয়ে চলাচল করলে সাপের দেখা মেলে, জোঁকে কামড়ে ধরে।

২৬ নং ওয়ার্ডের অনেক এলাকাই এখনও পানিতে ডুবে আছে। মহল্লার ভেতরে ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধতা স্থায়ী হয়ে আছে। এলাকাবাসীকে এই পানি মাড়িয়েই চলাচল করতে হচ্ছে। স্থানীয় কাউন্সিলরকে এ বিষয়ে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার হয়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

একই অবস্থা নগরীর ১৯নং ওয়ার্ডের। ছোট বনগ্রামের বাবু বলেন, নগরীতে বড় বড় রাস্তার উদ্বোধনের খবর আমরা শুনছি। কিন্তু এলাকার পাড়া-মহল্লায় এ ধরনের কাজের খবর খুব কমই শোনা যাচ্ছে। বার রাস্তার মোড় হতে ছোট বনগ্রাম স্কুল পর্যন্ত রাস্তাটি এলাকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ এ রাস্তাটি দীর্ঘদিন সংস্কার করা হয়নি। ফলে ভাঙাচুরা সড়ক দিয়েই আমাদের চলতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এলাকার আশপাশের মহল্লায় রাস্তা ও ড্রেনের অবস্থা একই।

তেরখাদিয়ার সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা শামছুল আলম দেওয়ান বলেন, এ এলাকাটি একেবারেই ঘিঞ্জি হয়ে গেছে। বেরুবার কোন প্রশস্ত রাস্তা নেই। এলাকাটিতে ৬ থেকে ৭ হাজার লোক বাস করে। অথচ সেখানে কোন প্রশস্ত রাস্তা নেই। কেউ মরলে মরদেহ হয় মাথায় করে, নয় বগলদাবা করে জানাজা বা দাফন করার জন্য কবরস্থানে নিয়ে যেতে হয়।

তিনি বলেন, প্রায় ২০-২৫ বছর থেকে শুনে আসছি রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট হতে তেরখাদিয়ার মধ্যপাড়া দিয়ে সোজা পশ্চিমে ৩০ ফুটের একটি রাস্তা আরডিএর প্ল্যানে আছে। কিন্তু শুনেই গেলাম। এর মধ্যে রাস্তা ঘেঁষে গড়ে উঠছে বহুতল বাড়ি। এলাকাবাসীর দাবি অবিলম্বে রাস্তাটি তৈরি করার।

এদিকে নগরভবনের পাশেই দড়িখড়বোনা। এলাকার মধ্য দিয়ে কয়েকটি অপ্রশস্ত রাস্তা রয়েছে। রাস্তাগুলো এত অপ্রশস্ত যে কোন রিকশাও চলাচল করতে পারে না। রাস্তার মধ্য দিয়ে ড্রেন আছে। ড্রেনের অনেক স্থানে স্লাব না থাকায় মানুষের হাঁটাই দায়।

এলাকার আব্দুল হান্নান বলেন, এলাকার কোন রাস্তা ও ড্রেন সংস্কার না করায় মানুষ হাঁটতে পারে না। অ্যাড. শরিফুল ইসলাম বাবু বলেন, কয়েকবারই রাসিকে ক্ষমতার হাত বদল হয়েছে। কখনও অর্থ সঙ্কট, কখনও করোনার থাবা, আবার কখনও সরকার থেকে ছাড় করতে না পারার কথা বললেও কাজ আর হয়নি।

নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের রামচন্দ্রপুর এলাকার গাজী সালাহ উদ্দিন সড়কের পাশে বাড়ি রয়েছে ২২টি। এর মধ্যে ১৯টি বাড়িই রাস্তার দুই ধার দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে ওই রাস্তা দিয়ে কোন ট্রাক বা গাড়ি ভিতরে প্রবেশ করতে পারে না। সেখানে কোন ড্রেন না থাকায় সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তার ওপর এক হাঁটু পানি জমে যায়। রাস্তার দক্ষিণ পাশে পর্যাপ্ত সরকারি জায়গা থাকা সত্ত্বেও ড্রেন নির্মাণের কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন। এলাকাবাসী ড্রেন নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।

নগরীর বিসিক শিল্প এলাকার পাশেই ১৬ নম্বর ওয়ার্ড। এ ওয়ার্ডের বিলপাড়া ছাড়া পাড়া-মহল্লায় রাস্তা-ঘাটের কোন কাজ হয়নি। স্বয়ং ওয়ার্ড কাউন্সিলরের বাড়ির পাশের রাস্তাটিই সংস্কার হয়নি।

মালদা কলোনী মহল্লার আব্দুল মান্নান এ সম্পর্কে বলেন, এ এলাকার সুজানগর, উত্তরপাড়া মথুরডাঙা ও কয়েরদাঁড়া এলাকায় ড্রেন ও রাস্তার টেন্ডার হয়েছে ৪ বছর। সে কাজে হাত দেয়া হচ্ছে না।

নগরীর একেবারে মধ্যেখানে মিয়াপাড়া। এলাকাটি ঐতিহাসিক এলাকা। এলাকার মধ্য দিয়ে চলে গেছে সাহেববাজার, ঘোড়ামারা ও রাণীবাজার সড়ক। সেখানকার ধর্মসভার সামনের এবং সরকারি পিএন স্কুলের পেছনের সড়কটি ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে দীর্র্ঘদিন ধরে। এ সম্পর্কে এলাকার জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, এ এলাকা দিয়ে শতশত মানুষ এবং অটো-রিকশা চলাচল করে। মধ্য শহরের রাস্তাটি এমন ভাঙা অবস্থায় রয়েছে যে গ্রামের ডহরকেও হার মানায়। এছাড়াও নগরীর ১৮, ৩, ২, ২৮, ২৯ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডসহ অধিকাংশ এলাকার নতুন রাস্তা নির্মাণ ও পুরাতন রাস্তা সংস্কারের কাজ একবারে বন্ধ রয়েছে। এর ফলে এলাকাবাসীকে দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।

এদিকে আগামী জানুয়ারি থেকে ওয়ার্ড পর্যায়ে পাড়া-মহল্লার রাস্তা ও ড্রেনের কাজ শুরুর কথা জানিয়েছেন রাসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী নূর ইসলাম। তিনি বলেন, কাজ শুরুর পূর্বের কিছু প্রক্রিয়াগত কাজ চলছে। অচিরেই তা শেষ করে ওয়ার্ডের কাজে হাত দেয়া হবে।

সোনালী/এমই

শর্টলিংকঃ