রাজশাহীতে দুই দিনে মরে গেছে ৬১৬ মেট্রিক টন মাছ


স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীতে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে প্রায় ৬১৬ মেট্রিক টন মাছ মরে গেছে। গত মঙ্গলবার ও বুধবার পুকুরে এসব মাছ মরে পানিতে ভেসে ওঠে। প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলার ৪ হাজার ৯৩০ জন মাছচাষির প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার ও বুধবার রাজশাহীতে বৃষ্টি হয়েছে। আকাশ ছিল মেঘলা। এ কারণে পানিতে অক্সিজেন স্বল্পতা দেখা দেয়। এতে পুকুরের মাছ মরে ভেসে উঠতে থাকে। রাজশাহীর আশপাশের জেলাগুলোতেও একইভাবে পুকুরের মাছ মরে গেছে। এতে চাষিরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের (রাবি) ফিশারিজ বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. এম মনজুরুল আলম বলেন, সূর্য না ওঠার কারণে পুকুরের উদ্ভিদকণা সালোকসংশ্লেষণ করতে পারেনি। উদ্ভিদকণা কার্বনডাই অক্সাইড গ্রহণ করে অক্সিজেন ছাড়তে পারেনি। এ কারণে পুকুরে অক্সিজেনের স্বল্পতা দেখা দেয়। আর করোনাকালে চাষিরা মাছ বিক্রি করতে পারেননি। পুকুরে অতিরিক্ত মাছ ছিল। তাই অক্সিজেন স্বল্পতায় মাছ মরতে শুরু করে। চাষিদের আসলে কিছু করার ছিল না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছেন রাজশাহীর পবা উপজেলার চাষিরা। এ উপজেলায় সবচেয়ে বেশি মাছ চাষ হয়। এছাড়া জেলার দুর্গাপুর, মোহনপুর, বাগমারা ও গোদাগাড়ীসহ সব উপজেলাতেই মাছের ক্ষতি হয়েছে। যেসব পুকুরে বড় আকারের মাছ ছিল সে পুকুরেই বেশি মাছ মরেছে। বড় বড় মাছ নামমাত্র মূল্যে বিক্রির চেষ্টা করেছেন চাষিরা।

মোহনপুর উপজেলার কেশরহাটে বুধবার ভোরে অন্যান্য দিনের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মাছ নিয়ে চাষিরা হাজির হন। অতিরিক্ত মাছ আমদানির কারণে আড়ৎদাররা মাছ বেচাকেনা বন্ধ করে দেন। এদিন কেশরহাট বাজারে ৪ থেকে ৫ কেজি ওজনের মাছ ৫০ টাকা থেকে ৮০ টাকা দরে বিক্রি হয়। প্রতি কেজি সিলভার কার্প বিক্রি হয় ১০ টাকা থকে ২০ টাকা কেজি দরে। অনেক মাছ পচে নষ্ট হওয়ার কারণে অনেক ব্যবসায়ী মাছ ফেলে দেন। অতিরিক্ত মাছ আমদানির কারণে রাজশাহী-নওগাঁ মহসড়কের কেশরহাটের বড়ব্রীজ এলাকায় এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে যানজট তৈরি হয়।

দুর্গাপুর উপজেলার মাছ চাষি নুরুল ইসলাম নুরু জানান, বৃষ্টির পরই তিনি পুকুরে গিয়ে মাছ মরে ভেসে উঠতে দেখেন। তার চোখের সামনেই লাখ টাকার মাছ মরে গেছে। এক দিনেই তার বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।

কেশরহাট মাছের আড়ৎ মালিক সমিতির সভাপতি রিয়াজ উদ্দিন বলেন, বুধবার বাজারে হঠাৎ অতিরিক্ত মাছের আমদানি হয়। প্রায় মাছ পচে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ঢাকায় পাঠানোর উপযোগী ছিল না। যার কারণে ব্যবসায়ীরা ঠিকা দরে মাছ বিক্রি করেন। এছাড়া এদিন মোহনপুর ছাড়াও পুঠিয়া, দুর্গাপুর, পবা, বাগমারা থেকেও মাছ নিয়ে আসেন ব্যবসায়ীরা।

বাগমারা উপজেলার মাদারীগঞ্জ, ভবানীগঞ্জ, হাটগাঙ্গোপাড়াসহ বিভিন্ন মাছের আড়ৎগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় ছিল। বাগমারার বাজারগুলোতেও ৩ থেকে ৪ কেজি ওজনের রুই, কাতলা ও সিলভার মাছ ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।

বাগমারা উপজেলার বালানগর গ্রামের মৎসচাষী আব্দুল মতিন জানান, বুধবার সকালে জানতে পারেন তার পুকুরের মরা মাছ ভাসছে। বিষয়টি জেনে পুকুরে গেলে ততক্ষণে অনেক মাছ মরে ভেসে উঠে। পরে মাছগুলো কিছু অংশ তুলে বাজারে নেন। বাকি মাছ পুকুরে পচে গেছে।

একইভাবে উপজেলার নন্দনপুর গ্রামের বাবুল হোসেন জানান, তার পুকুরের অর্ধেকের বেশি মাছ মরে গেছে। বাকি কিছু মাছ পকুরে রয়েছে। এতে করে তার প্রায় তিন লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে।

বাগমারা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শাহাদৎ হোসেন জানান, দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে পুকুরগুলোতে অক্সিজেনের সল্পতা দেখা দেয়। পুকুরে অতিরিক্ত মাছ থাকলে মাছ মরার সম্ভাবনা বেশি। তবে যাদের পুকুরে পরিমিত মাছ আছে, তাদের ক্ষতি কম হবে। তাই এখন পুকুরের মাছ কমিয়ে ফেলতে হবে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা অলক কুমার সাহা জানান, মঙ্গলবার ও বুধবার আবহাওয়া খারাপ ছিল। রাজশাহীর অধিকাংশ ব্যবসায়ীরা পুকুরে অতিরিক্ত খাবার দিয়ে মাছ চাষ করেন। যার কারণে পুকুরগুলোতে অক্সিজেনের স্বল্পতা দেখা দেয়। আর এতেই মাছ মারা গেছে। এছাড়া অনেকেই পুকুরে অতিরিক্ত মাছ চাষ করেন। বর্ষার আগেই পুকুরের মাছ কমিয়ে ফেলা উচিত।

তিনি জানান, বৃহস্পতিবার তারা ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছেন। এতে বলা হয়েছে, দুই দিনে রাজশাহীর প্রায় ৬১৬ মেট্রিক টন মাছ মারা গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত চাষির সংখ্যা ৪ হাজার ৯৩০ জন। তাদের ১৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এটা কম-বেশি হতে পারে। ক্ষয়ক্ষতির এই হিসাব মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য অধিদপ্তরে পাঠানো হবে।

গত কয়েকবছরে রাজশাহীতে মাছ চাষে বিপ্লব ঘটেছে। জেলায় প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে পুকুর রয়েছে। বছরে মাছের উৎপাদন হয় প্রায় ৮৪ হাজার মেট্রিক টন। জেলার চাহিদা মিটিয়ে এখানকার মাছ ঢাকায় পাঠানো হয়। তবে মাঝেমাঝেই দুর্যোগের মুখে পড়েন চাষিরা।

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ