ম্যারাডোনার কিংবদন্তি হয়ে উঠার গল্প

অনলাইন ডেস্ক: ফুটবলের জাদুকর ম্যারাডোনার জন্ম ৩০ অক্টোবর ১৯৬০ সালে। বাবা দিয়েগো ম্যারাডোনা সিনিয়র ও মা দালমা নেরেয়া ফ্রাস্কোর চতুর্থ সন্তান ছিলেন দিয়েগো মারাডোনা। তার জন্ম হয়েছিলো বুয়েনোস আইরেস প্রদেশের লানুস শহরে। তবে তার বেড়ে ওঠা ভিয়া ফিওতিতোতে। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে প্রথম পুত্র সন্তান ছিলেন তিনি। তার অন্য দুই ভাই ছিলেন পেশাদার ফুটবল খেলোয়াড়। তবে দারিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করেই শৈশব কাটিয়েছেন ম্যারাডোনা।

দারিদ্র অবশ্য সাফল্যের প্রতিবন্ধক ছিল না। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের সাথেই বেড়ে ওঠা ম্যারাডোনার। চাচাতো ভাই বেতো জারাতে তার তৃতীয় জন্মদিনে তাকে প্রথম ফুটবল উপহার করেছিলেন। ইয়াং ম্যারাডোনা চুরির ভয়ে প্রায় চার মাস বল জামার ভেতর রেখেই ঘুয়মাতেন।

মাত্র ১০ বছর বয়সে এস্ত্রেয়া রোজার হয়ে খেলার সময় ফ্রান্সেসকো কোরনেহো নামের এক ফুটবল স্কাউটের চোখে পড়েন ম্যারাডোনা। সেখান থেকেই তিনি প্রথম যোগদান করেন বুয়েন্স আয়ার্সের জুনিয়র টিম ‘লস সেবোলিটিয়াসে’। এই দলের হয়ে টানা ১৩৬ ম্যাচে খেলেন তিনি। নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে তিনি মাত্র ১২ বছর বয়সে ‘বল-বয়’ খেতাব পান।

১৯৭৬ সালের ২০ অক্টোবর, নিজের ষোলতম জন্মদিনের দশ দিন আগে আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের হয়ে ম্যারাডোনার অভিষেক হয়। সেখানে তিনি ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ছিলেন এবং ১৬৭ খেলায় ১১৫টি গোল করেন।

এর ঠিক এক বছর যেতে না যেতেই আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের হয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচে খেলার সুযোগ পায় ম্যারাডোনা। ১৯৭৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি মাত্র ১৬ বছর বয়সে হাঙ্গেরির বিপক্ষে অভিষেক হয় তার।

এদিকে জাতীয় দলে অভিষেক হওয়ার পরের বছর ১৯৭৮ সালে ঘরের মাঠে ফিফা বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। তবে ফর্ম তুঙ্গে থাকা ম্যারাডোনার সেবারের বিশ্বকাপে জায়গা হয়নি। তবে দলে দলে ম্যারাডোনার না থাকা নিয়ে সেই সময়ের আর্জেন্টাইন কোচ সুইজার লুই মেনট্টি চরমভাবে সমালোচিত হন।

তবে জাতীয় দলে স্থান না পেলেও ১৯৭৯ সালে ১৮ বছর বয়সে তিনি আর্জেন্টিনার হয়ে ফিফা বিশ্ব যুব চ্যাম্পিয়নসিপে অংশগ্রহণ করেন। প্রতিযোগিতার ফাইনালে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ৩–১ গোলে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। ১৯৭৯ সালের ২ জুন, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে সিনিয়র দলের হয়ে প্রথম গোল করেন ম্যারাডোনা। তিনিই একমাত্র খেলোয়াড় যিনি ফিফা অনুর্ধ-২০ বিশ্বকাপ (১৯৭৯) ও ফিফা বিশ্বকাপ (১৯৮৬) উভয় প্রতিযোগিতায় গোল্ডেন বল জিতেছেন।

ফিফা অনুর্ধ-২০ বিশ্বকাপ শেষে ম্যারাডোনা ক্লাব পরিবর্তন করেন। তিনি ১ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে বোকা জুনিয়ের্সে পাড়ি জমান। ১৯৮১ মৌসুমের মাঝামাঝি সময় বোকায় যোগ দিয়ে ১৯৮২ সালে তিনি প্রথম লীগ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেন।

এরপর ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে প্রথম অভিষেক হয় ম্যারাডোনার। সেবার ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের শুরুতেই খারাপ খলতে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় পর্বে ব্রাজিলের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা।

বিশ্বকাপ শেষে আরও একবার ক্লাব পরিবর্তন করেন ম্যারাডোনা। ৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে বার্সেলোনায় যোগ দেন মারাদোনা। ১৯৮৩ সালে কোচ সিজার লুইসের অধীনে বার্সেলোনা রিয়াল মাদ্রিদকে এবং অ্যাতলেটিকো বিলবাওকে হারিয়ে স্প্যেনিশ সুপার কাপ জিতে। যার মূলে ছিলেন ম্যারাডোনা। তবে বার্সায় ম্যারাডোনা কিছুটা খারাপ সময় কাটিয়েছেন। প্রথমে তাকে হেপাটাইটিসের সাথে লড়তে হয় এরপর তাকে পড়তে হয় গোড়ালির ইনজুরিতে। অবশ্য চিকিত্সাত শেষে দ্রুতই মাঠে ফিরে আসেন ম্যারাডোনা।

বার্সেলোনায় ম্যারাডোনা ৫৮ খেলায় ৩৮টি গোল করেন। বার্সেলোনায় থাকাকালে মারাদোনা ক্লাব পরিচালকদের সাথে ঘনঘন বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। বিশেষ করে ক্লাব প্রেসিডেন্ট ইয়োসেপ লুইস নুনেজের সাথে। ১৯৮৪ সালে আরেকটি রেকর্ড স্থানান্তর ফি-তে (৬.৯ মিলিয়ন ইউরো) ইতালিয়ান ক্লাব নাপোলিতে যোগ দেন তিনি।

নাপোলিতে ম্যারাডোনা তার পেশাদার ক্যারিয়ারের শিখরে পৌছান। ১০ নম্বর জার্সিতে তিনি খুব দ্রুত ক্লাবের সমর্থকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। সেই সময়টিই ছিল নাপোলির ইতিহাসের সফলতম যুগ। ম্যারাডোনার অধীনে নাপোলি ১৯৮৬–৮৭ ও ১৯৮৯–৯০ মৌসুমে সিরি’আ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়লাভ করে। এরপর নাপোলি ১৯৮৯–৮৮ ও ১৯৮৮–৮৯ মৌসুমে রানার-আপ হয়। এছাড়া ম্যারাডোনার সময়ে নাপোলি একবার কোপা ইতালির শিরোপা ঘরে তোলে (১৯৮৭) এবং একবার রানার-আপ (১৯৮৯) হয়। ম্যারাডোনার সুবাদে ১৯৯০ সালে ইতালীয় সুপার কাপেরও শিরোপার দেখা পায় নেপোলি। ১৯৮৭–৮৮ মৌসুমের সিরি এ-তে মারাদোনা সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন।

১৯৮৬ বিশ্বকাপের কিছু পুর্বে ম্যারাডোনা ইংলিশ ক্লাব টটেনহামের হোয়েও খেলেছিলেন একটি ম্যাচ। ইন্টারনাজিওল্যানের বিপক্ষের সেই ম্যাচে টটেনহাম ২-১ গোলে জয় লাভ করেছিলো।

১৯৮৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ম্যারাডোনা। প্রতিযোগিতার ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা।

প্রতিযোগিতার পুরোটা জুড়েই ছিল ম্যারাডোনার আধিপত্য। তিনি আর্জেন্টিনার প্রত্যেকটি খেলায় পুরোটা সময়ই মাঠে ছিলেন। পুরো প্রতিযোগিতায় তিনি পাঁচটি গোল করেন এবং সতীর্থদের দিয়ে করান আরও পাঁচটি। প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম গোল করেন ইতালির বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় খেলায়। কোয়ার্টার-ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে নিজেকে কিংবদন্তি হিসেবে প্রমাণ করেন তিনি।

আর্জেন্টিনা এবং যুক্তরাজ্যের মধ্যকার ফকল্যান্ড যুদ্ধের কারণে খেলায় উত্তেজনার কমতি ছিলনা। প্রথমার্ধ শেষ হয় গোলশূন্যভাবে। দ্বিতীয়ার্ধে খেলার ৫১তম মিনিটে ম্যারাডোনা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় একটি গোল করেন। রিপ্লেতে দেখা যায় গোলটি করার সময় তিনি হাত দিয়ে বলে আঘাত করেছেন। পরবর্তীতে এই গোলের নাম দেওয়া হয় “দ্য হ্যান্ড অফ গড”। ২০০৫ সালের ২২ আগস্ট একটি টেলিভিশন শোয়ে ম্যারাডোনা স্বীকার কিকার, তিনি গোলটি ইচ্ছাকৃতভাবেই হাত দিয়ে করেছিলেন। তার মাথা বল স্পর্শ করেনি এবং সে মুহূর্তে তিনি জানতেন গোলটি অবৈধ। ইংরেজ খেলোয়াড়রা প্রতিবাদ করলেও রেফারি গোলের বাঁশি বাজিয়েছিলেন।

এর ঠিক চার মিনিট পরেই ম্যারাডোনা চমৎকার এক উপহার দেন দলকে। মাঝ মাঠ থেকে বল পেয়ে পাঁচ ইংলিশ ডিফেন্ডার ও গোল কিপারকে কাটিয়ে গোলটি করেছিলেন তিনি। পরে ২০০২ সালে ফিফা অনলাইনে ভোটের আয়োজন করলে এই গোলটি ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ হিসেবে নির্বাচিত হয়। তার প্রতি সম্মান জানিয়ে স্তাদিও অ্যাজতেকা স্টেডিয়ামের সামনে ম্যারাডোনার গোল অফ দা সেঞ্চুরীর একটি প্রতিমূর্তি নির্মাণ করা হয়েছে।

এরপর টানা দুই বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা ভালো খেললেও শিরোপা জেতেনি আর্জেন্টিনা। তবে এরপরই হুট করে ছন্দপতন হতে থাকে ম্যারাডোনার। কোকেইনের প্রতি তীব্রভাবে আসক্ত হয়ে পড়েন তিনি। শৃঙ্খল ভঙ্গ ও অনুশীলনে অনুপস্থিত থাকার কারণে ক্লাবের পক্ষ থেকে তাকে ৭০০০০ ডোলার জরিমানা করা হয়। তবে এরপর ড্রাগ টেস্টে ধরা পড়ে ১৫ মাসের নিষেধাজ্ঞা থেকে ফিরে ১৯৯২ সালে ম্যারাডোনা নেলোলি ছেড়ে দেন।

নেলোলি ছাড়ার পর স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদে যাওয়ার কথা থাকলেও ম্যারাডোনা সেভিয়াতে যোগ দেন। সেখানে এক বছর কাটিয়ে ১৯৯৩ সালে তিনি লিওয়েলস ওল্ড বায়েজের হয়ে খেলেন।

এরমধ্যে ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে ড্রাগ টেস্টে পজেটিভ আসায় মাত্র দুই ম্যাচ পরেই ছিটকে যান তিনি বিশ্বকাপ থেকে। একই বছর বিশ্বকাপের পর ১৭ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়েরের ইতি টানেন তিনি।

১৯৯৫ সালে আবারও বোকা জুনিয়ার্সে ফিরে আসেন ম্যারাডোনা এবং সেখান থেকেই ১৯৯৭ সালে নিজের জন্মদিনের দিন সকল প্রকার ফুটবল থেকে অবসর নেন তিনি। ২০০৮ সালের ২৯ অক্টোবর এএফএ চেয়ারম্যান হুলিও গ্রান্দোলা নিশ্চিত করেন যে, ২০০৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ম্যারাডোনা জাতীয় দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব পালন করবেন। ২০০৮ সালের ১৯ নভেম্বর স্কটক্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার খেলায় ম্যারাডোনা প্রথমবারের মত দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। খেলায় আর্জেন্টিনা ১–০ গোলের ব্যবধানে জয় লাভ করে।

জাতীয় দলের কোচ হিসেবে প্রথম তিনটি খেলায় জয় লাভের পর বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের বলিভিয়ার বিপক্ষে খেলায় আর্জেন্টিনা ৬–১ গোলের ব্যবধানে পরাজিত হয়। এটি ছিল দলের ইতিহাসে সবচেয়ে বাজে পরাজয়। ২০১০ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের আর দুইটি খেলা অবশিষ্ট ছিল। সে সময় আর্জেন্টিনার অবস্থান ছিল পঞ্চম। ফলে, বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার অংশগ্রহণ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। কিন্তু শেষ দুই খেলায় জয়ের ফলে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।

২০১০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা জয় দিয়ে শুরু করে। গ্রুপ পর্বের প্রথম খেলায় তারা নাইজেরিয়াকে ১–০ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে। এরপর তারা দক্ষিণ কোরিয়াকে ৪–১ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে। গ্রুপ পর্বের শেষ খেলায় আর্জেন্টিনা গ্রীসের বিপক্ষে ২–০ গোলের ব্যবধানে জয় লাভ করে এবং দ্বিতীয় পর্বে উত্তির্ণ হয়ে মেক্সিকোকে প্রতিপক্ষ হিসেবে পায়। মেক্সিকোকে ৩–১ গোলের ব্যবধানে হারানোর পর কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির মুখোমুখি হয় তারা। কিন্তু খেলায় ৪–০ গোলের ব্যবধানে পরাজিত হয়ে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ে ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা। প্রতিযোগিতায় আর্জেন্টিনা পঞ্চম স্থান অর্জন করে।

এরপর কোচ হিসেবে ম্যারাডোনার ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপ পর্যন্ত থাকার কথা থাকলেও বোর্ডের সাথে সমাঝোতা না হাওয়ায় তিনি পদত্যাগ করেন।

ব্যক্তি জীবনে ম্যারাডোনা ১৯৮৭৪ সালের ৭ নভেম্বর বুয়েনোস আইরেসে ফিয়ান্সি ক্লাদিয়া ভিয়াফানিয়ের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দুইটি কন্যা সন্তান রয়েছে। তবে এই দম্পতির বিবাহ বিচ্ছেদ হয় ২০০৪ সালে।

সোনালী/এমই

শর্টলিংকঃ