মে দিবসের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হোন

  • 3
    Shares

আজ পহেলা মে। মহান মে দিবস। আজ থেকে ১৩৫ বছর আগে ১৮৮৬ সালের এই দিনে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর মালিক ও রাষ্ট্রপক্ষের মিলিত হামলায় হতাহত হন অনেক শ্রমিক। বুকের তাজা রক্তে ৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম ও ৮ ঘণ্টা বিনোদনের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে, পরবর্তিতে বিশ্বজুড়েই। শ্রমিকের রক্তের বিনিময়ে আন্দোলন অবশেষে সফল হয়। জন্ম হয় মহান মে দিবস।

সে সময় অধিকার বঞ্চিত শ্রমিকদের দৈনিক ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত একটানা কাজ করতে বাধ্য করা হতো। নারী ও শিশু শ্রমিকদেরও রেহাই ছিল না। হে মার্কেটের ঘটনায় শ্রমিক হত্যার পাশাপাশি হামলাকারী পুলিশের মৃত্যুর অভিযোগও তোলা হয়। এজন্য বিচারের প্রহসনে শ্রমিক আন্দোলনের বীর নায়কদের ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো হয়। বেপরোয়া নির্যাতন, জেল-জুলমেও থামানো যায়নি শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন। দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন দেশে। অবশেষে শ্রমিকের দাবি স্বীকৃতি লাভ করে।

দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে বিশ্বজুড়েই। শ্রমিকের আত্মদান ও দাবি আদায়ের এই দিনটি প্রতিবছরই সারাবিশ্বে শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষ মহান মে দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও শ্রমজীবী মানুষের ঐক্য ও সংহতি প্রকাশের দিন পহেলা মে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস।

বাংলাদেশেও ধুমধামের সাথে মে দিবস পালিত হয়ে থাকে। শ্রমিক-কর্মচারীদের সাথে মালিকপক্ষ ও সরকারও দিবসটি পালন করে। দিনটি সরকারি ছুটির দিন। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠিত শ্রমিক-কর্মচারীরা সভা-সমাবেশ, বর্ণাঢ্য র‌্যালিতে লাল পতাকা উড়িয়ে দিনটি অতিবাহিত করেন। তবে করোনাকালে গত বছরের মত এবারের মে দিবসে এসব আনুষ্ঠানিকতা বন্ধ রয়েছে। করোনায় শ্রমিক-শ্রমজীবীদের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সামনে তাদের বেশির ভাগের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। করোনায় মে দিবসও আক্রান্ত। শুধু এদেশেই নয়, বিশ্বজুড়েই।

মে দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ৮ ঘণ্টা কাজের বিনিময়ে মানুষের মত বাঁচার অধিকার। অথচ এদেশের বেশিরভাগ শ্রমজীবী সে অধিকার থেকে দারুণভাবে বঞ্চিত। মে দিবসেও তাদের কাজ করতে হয়। কারণ শ্রমিক হিসেবে তারা অপ্রাতিষ্ঠানিক, স্বনিয়োজিত তাই অসংগঠিত। ৮ ঘণ্টা কাজ দূরে থাক নিয়োগপত্রসহ ন্যূনতম নিশ্চয়তাও নেই বেশির ভাগের। এই বাস্তবতা মে দিবস পালনের ভিন্ন অর্থ তুলে ধরে।

স্বাধীনতার পর পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হলেও বেশির ভাগ শ্রমিক ও শ্রমজীবীর জীবন এখনও অনিশ্চিত। দুঃখ-দরিদ্র্য, নির্যাতন-বঞ্চনায় ভরা। শ্রমিক স্বার্থে প্রণীত আইন-কানুনের যথাযথ বাস্তবায়ন দেখা যায় না। এক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের আগ্রহ ও আন্তরিকতার পাশাপাশি মালিকসহ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া শ্রমিক স্বার্থ রক্ষা যে সম্ভব নয় সেটা বলাই বাহুল্য।

তাই, মে দিবসে একদিনের জন্য শ্রমিক দরদী হয়ে কথামালায় মেতে উঠলে চলবে না। বাস্তবজীবনে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। এজন্য সারা বছরই লাগাতার প্রয়াস ও সংগ্রামের বিকল্প নেই। মূল্য সৃষ্টিকারী শ্রমিকের ন্যায্য অধিকারের সাথে একাত্ম হতে হবে গোটা সমাজকেই। বুঝতে হবে মাথার ঘাম পায়ে ফেলা শ্রম ছাড়া মূল্য ও সম্পদ সৃষ্টি হয় না।

এই মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হলেই শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা নিশ্চিত হতে পারে। একমাত্র তাহলেই মে দিবস পালন সার্থক হবে। মে দিবসের এই চেতনায় ঐক্যবদ্ধ ও বাস্তবায়নে সচেষ্ট হওয়াই সকলের কাম্য।

 

সোনালী/এমই

শর্টলিংকঃ