- সোনালী সংবাদ - https://sonalisangbad.com -

মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব

  • 153
    Shares
ছবি: সোনালী সংবাদ

।।ড. মো. হাসিবুল আলম প্রধান।।

১৫ আগস্ট আমাদের শোকের দিন, অশ্র বিসর্জনের দিন এবং সেইসাথে শোককে শক্তিতে পরিণত করার দিন। এ দিন বাঙালি হারিয়েছে তাঁদের জাতির পিতা শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

শুধু শেখ মুজিবকে এদিন বাঙালি হারায়নি, হারিয়েছে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা, বঙ্গবন্ধুর তিনপুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, বঙ্গবন্ধুর দুই পুত্রবধু সুলতানা কামাল খুকু, পারভীন জামাল রোজী, বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ আবু নাসের, বঙ্গবন্ধুর সেজ বোনের স্বামী আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, সেরনিয়াবাত এর কন্যা বেবী সেরনিয়াবাত ও পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, সেরনিয়াবাতের নাতি সুকান্ত বাবু, সেরনিয়াবাতের ছোট ভাই শহীদ সেরনিয়াবাত, বঙ্গবন্ধুর মেজ বোনের ছেলে শেখ ফজলুল হক মনি, মনির অন্তঃসত্বা স্ত্রী আরজু মনি, বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা অফিসার কর্ণেল জামিল ও আমীর হোসেন আমুর খালাত ভাই রিন্টুকে।

মীরজাফর খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে আমাদের সেনাবাহিনীর কতিপয় স্বাধীনতা বিরোধী, পাকিস্তানপন্থি ক্ষমতালোভী অফিসার খুনী লে. কর্ণেল ফারুক, লে. কর্ণেল রশিদ, মেজর শাহরিয়ার, মেজর বজলুল হুদা, ক্যাপ্টেন নূর প্রমূখ যে নজীরবিহীন বর্বরোচিত নৃশংস হত্যাকান্ড সংঘঠিত করেছিল তা বাঙালির গৌরবকে ম্লান করেছে এবং বাঙালিকে চিরদিনের জন্য ভাসিয়েছে অশ্র সাগরে।

ঘাতকদের বুলেটে ক্ষতবিক্ষত জাতির পিতা

ঘাতকরা এতটাই পাষাণ ছিল যে অন্তঃসত্বা নারী ও শিশু কেউ রক্ষা পায়নি ঘাতকদের হাত থেকে।

বঙ্গবন্ধুর নয়নের মনি ১০ বছরের শিশু রাসেল চোখের জলে বুক ভাসিয়ে বার বার প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছিল, কিন্তু ঘাতকদের পাষাণ হৃদয় একবারও কেঁপে ওঠেনি বন্দুকের ট্রিগার টিপতে।

সেরনিয়াবাত এর নাতি সাড়ে ৪ বছর বয়সি সুকান্ত বাবু যে পৃথিবীকেই ঠিকমত চিনতে শিখেনি, রাষ্ট্র ক্ষমতা পরিবর্তনের নামে জল্লাদরা ফুলের মতো অবোধ শিশুর হৃদপিন্ড বুলেটে ক্ষত-বিক্ষত করে।

খুনী চক্র চেয়েছিল বঙ্গবন্ধুর বংশের নাম নিশানা চিরদিনের জন্য মুছে ফেলতে। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সেদিন দেশের বাইরে অবস্থান না করলে তাদের জীবনেও নেমে আসতো একই নির্মম পরিণতি।

কিন্তু কেন এই ১৫ আগষ্ট ট্রাজেডি? ক্ষমতা দখলের জন্য কেন এই বর্বরোচিত হত্যাকান্ড?

শুধু রাষ্ট্র ক্ষমতার জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারকে হত্যা করা হয়েছে এমনটি ভাববার বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।হত্যাকারীদের ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত সূদূর প্রসারী ও পরিকল্পিত।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পিছনে প্রধান যে কারণটিকে চিহ্নিত করা হয় তা হচ্ছে তিনি পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের আলোকে একটি আলোকিত বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন।

আর তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার অন্যতম কারণ ছিল ভবিষ্যতে যেন তাঁর কোনো উত্তরাধিকারী বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে ঘাতকদের ক্ষমতা ও বাংলাদেশকে পাকিস্তানপন্থি করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনা একদিনেই করা হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদী শক্তি ও বাংলাদেশবিরোধী আন্তর্জাতিক শক্তি স্বাধীনতার পর থেকেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার জন্য নানা রকম ষড়যন্ত্রের জাল বুনে।

মৌলবাদী শক্তি স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময় থেকেই এই সত্যটি উপলদ্ধি করেছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও বঙ্গবন্ধুকে বাঁচতে দেওয়া হবে না। কারণ স্বাধীন বাংলাদেশকে পাকিস্তানপন্থি চেতনায় পরিচালিত করতে হলে, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে হত্যা করতে হলে, বাংলাদেশের সংবিধান থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র মুছে ফেলতে হলে বাংলার মাটিতে বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।

স্বাধীনতার পরে বাণিজ্যমন্ত্রী থাকাবস্থায় ক্ষমতালোভী খন্দকার মোশতাকের সাথে স্বাধীনতা বিরোধী মৌলবাদী শক্তির ঘনিষ্ট সখ্যতা গড়ে উঠে এবং পরে তিনি এই শক্তির সাথে গোপনে বৈঠকে মিলিত হতেন কিভাবে বঙ্গবন্ধু সরকারের পতন ঘটানো যায়।

ধীরে ধীরে মোশতাকের আত্মীয় লে. কর্ণেল আব্দুর রশীদ ও লে. কর্ণেল ফারুকের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে চাকুরিচ্যুত কিছু সামরিক অফিসার. সেনাবাহিনীর কয়েকজন অফিসার ও কিছু সিপাহীর সাথে মোশতাকের ও স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির যোগাযোগ ঘটে এবং তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্রমূলক বৈঠক করতে থাকেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যার মোটিভ ও অমীমাংসিত রহস্য – সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক
সেদিন শহীদ হয়েছিলেন যাঁরা

এই খুনি চক্রের সাথে বঙ্গবন্ধু বিরোধী দেশীয় অন্যান্য শক্তি ও আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তির যোগাযোগ স্থাপিত হলে খুিনরা বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার জন্য বেছে নেয় ১৫ আগস্টের কাল রাত্রিকে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পিছনে দেশীয় চক্রের সাথে আন্তর্জাতিক চক্রেরও যোগাযোগ ছিল। কারণ যে আদর্শের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছিল তা দেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এটি বুঝতে পেরেছিল যে, স্বাধীন হলে এদেশটির উপর কোনোভাবেই খবরদারী করা যাবে না।

তাই বঙ্গবন্ধুর প্রতি রুষ্ট হয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশটি সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষালম্বন করেছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পাকিস্তানের সমর্থনে সপ্তম নৌবহরও পাঠিয়েছিল, যদিও এই নৌবহর পরে ফিরে যায়। শুধু তাই নয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নানাভাবে মুক্তি সংগ্রামকে বিভ্রান্ত করতে শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিল।

আমরা জানি যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা ও তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার খন্দকার মোশতাক আহমেদের সাথে যোগাযোগ করে পাকিস্তানের সহায়তায় বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের মধ্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করেছিল।

অবশ্য মোশতাকের এই গোপন যোগাযোগের বিষয়টি ১৯৭১ এর অক্টোবরের মধ্যেই ফাঁস হয়ে যায় এবং তাকে কলকাতায় কার্যত গৃহবন্দি করে রাখা হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি সিআইএ-র কর্মকর্তারা আগে থেকেই জানতেন।

‘বাংলাদেশ : আনফিনিসড রেভিউলিশন’ গ্রস্থের লেখক মার্কিন সাংবাদিক লিফ সুলজ তাঁর একটি লেখা ‘একটি অভ্যুত্থানের ব্যবচ্ছেদ’-এ তিনি বলেন ‘তৎকালীন ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের সিআইএ স্টেশন চীফ ফিলিপ চেরি আমাকে বলেন মুজিব সমস্যায় আছে সেটা তারা জানতেন এবং এও জানতেন যে সেখানে কী ঘটবে বা মুজিবকে কে উৎখাত করবে’।

জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করার পর এদেশে খন্দকার মোশতাক এর নেতৃত্বে সামরিক জান্তাদের জংলী শাসন শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের হত্যার বিচার না করে বরং খুনিদেরকে আইন করে রক্ষা করা হয় এবং নানাভাবে পুরস্কৃত করা হতে থাকে। ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর খন্দকার মোশতাক বঙ্গবন্ধুর খুনিদের রক্ষা করার জন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেন।

বঙ্গবন্ধুর ৬ খুনিকে ফেরত আনায় অগ্রগতি নেই
বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকারী ঘৃণ্য খুনিদের অন্যতম ছয়জন

সংবিধানের মৌলিক চেতনাবিরোধী এই অধ্যাদেশটি ১৯৭৮ সালে সামরিক জান্তা ক্ষমতালোভী জিয়াউর রহমান সংবিধানের চতুর্থ তফসিলে এক অনুচ্ছেদ সংযোজনের মাধ্যমে আইন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। পৃথিবীর কোন সভ্য গণতান্ত্রিক দেশে আইন করে খুনিদের রক্ষা করার এরকম দ্বিতীয় কোন নজীর নেই। এই খুনি চক্রকে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকাকালীন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠিয়ে দিয়ে পুরস্কৃত করেন।

পরবর্তীতে সামরিকজান্তা এরশাদ সরকার এই খুনিদের দিয়ে ফ্রিডম পার্টি গঠন করার সুযোগ দেন। এমনকি ১৯৮৮ সালে ভোটার বিহীন সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিলে এই খুনিদের কয়েকজন সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হন।

ইনডেমনিটির মাধ্যমে খুনিদের বিচার না হওয়ায় খুনিরা বুক ফুলিয়ে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারকে হত্যা করবার কথা বলে বেড়াত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়। ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর ইনডেমনিটি আইন বাতিল হওয়ার আগে খুনিরা দম্ভোক্তির সাথেই বঙ্গবন্ধু হত্যার কথা প্রকাশ্যে বলে বেড়াত।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার মধ্য দিয়ে এদেশে যে অমূল্য ক্ষতিটি হয়েছে তা হলো মুক্তিযুদ্ধের অলোকিত বাংলাদেশ বিকিরণ ছড়ানোর মাঝপথে এক গহীন অন্ধকারে ডুবে যায়, অন্ধকারে মিলিয়ে যায় বঙ্গবন্ধুর শোষণমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্টার স্বপ্ন।

৭১ এর যুদ্ধ বিধ্বস্ত শিশু বাংলাদেশকে অপার স্নেহ মমতায় গড়ে তোলবার সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু যখন বিভোর তখনই ঘাতকের নির্মম বুলেটে ক্ষতবিক্ষত বঙ্গবন্ধুর নিথর শরীর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির অস্তিত্ব পড়ে এক চরম সংকটের মুখে।

১৫ আগষ্ট ট্রাজেডি রচনা করার পর বাংলাদেশের ও বাঙািলর মূল্যবোধকে একে একে ধ্বংস করে দেশটিকে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্র রচনা করা হয়েছিল। ’৭৫ পরবর্তী একটা দীর্ঘ সময় বাংলাদেশ পরিচালিত হয়েছে স্বাধীনতা বিরোধীদের সহায়তায় সেনাবাহিনীর ফরমান ও অগণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা এবং কখনও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবন্থা দ্বারা।

বঙ্গবন্ধু ও চার নেতার প্রতি প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা

১৫ আগস্ট ট্রাজেডির পর তারা সংবিধানকে ক্ষত বিক্ষত করেছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভ‚লুণ্ঠিত করেছেন, জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করেছেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করেছেন এবং বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশন থেকে বঙ্গবন্ধু নামটিকে নির্বাসিত করেছেন। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই শাসকরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রজ্জলিত বাংলাদেশকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়ে বাংলাদেশকে পাকিস্তানপন্থি করার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর মুক্তিযুদ্ধের অর্জন, সংবিধানের মূলস্তম্ভ, বাঙালির মূল্যবোধ, সংস্কৃতি এসবের উপর কালিমা লেপন করা হয়েছে। ধর্ম ব্যবসায়ীরা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মৌলবাদী রাজনীতির শিকড়কে এতই শক্তিশালী করেছিল যে ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকারের আমলে ৭১’র কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদীকে মন্ত্রী করে তাদের গাড়িতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা পতপত করে উড়াবার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল।

১৫ আগস্ট ট্রাজেডির পর ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে দীর্ঘ ২১ বছর পর বালাদেশ আবারও ফিরে এসেছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকিত ধারায়। এসময় আবার মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস প্রচার মাধ্যমে ফুটে উঠেছিল। আর সবচেয়ে বড় যে কাজটি হয়েছে তা হলো বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার হয়েছে।  বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচার না হওয়ায় সারা বিশ্বে লজ্জায় বাঙালি জাতির মাথা নিচু হয়ে গিয়েছিল।

২০০১ সালের ১ অক্টোবরের বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসলে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের বাঁচাবার পাঁয়তারা শুরু হয়, সেজন্য উচ্চ আদালতে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা বছরের পর বছর ফেলে রাখা হয় এবং বিচার কাজ বন্ধ থাকে।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল ভোটে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট জয়লাভ করলে এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে মামলাটি শুনানি করার উদ্যোগ নেয়া হয়। শুনানি শেষে ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর আপীল বিভাগের একটি বেঞ্চ হাইকোর্টের দেওয়া রায় ১২ আসামীর মুত্যুদণ্ড বহাল রেখে উক্ত মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।

এরপর ২০১০ সালের ২৮ শে জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় আটককৃত খুনী লে. কর্ণেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্ণেল (অব.) সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, মেজর (অব.) বজলুল হুদা, মুহিউদ্দিন আহমদ (আর্টিলারি) ও এ কে এম মহিউদ্দিন আহমদ (ল্যান্সার) এর ফাঁসি কার্যকর করায় কিছুটা হলেও জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়।

পলাতক ৭ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের মধ্যে অন্যতম ক্যাপ্টেন (বরখাস্তকৃত) আব্দুল মাজেদকে গত ১২ এপ্রিল ২০২০ দিবাগত রাতে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে এখনও বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বেশ কয়েকজন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী বিদেশে পলাতক থাকার কারণে তাদের ফাঁসি কার্যকর না হওয়ায় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়েছে তা বলতে পারি না।

বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারকে নৃশংসভাবে হত্যা করে ঘাতক চক্র এদেশের মাটি থেকে তাঁর নাম মুছে ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু ঘাতকদের এ স্বপ্ন কি বাস্তবায়িত হয়েছে? বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে তাঁর অমর কীর্তি ও তাঁর সংগ্রামী আন্দোলনের ইতিহাসকে কি মুছে ফেলা যায়? বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ দিয়েছেন, গণতন্ত্র দিয়েছেন, একটি সংবিধান দিয়েছেন আর বাঙালির মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের মন্ত্রসুধা।

বঙ্গবন্ধু বেঁচে নেই এ কথা সত্যি, কিন্তু তিনি তো বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি, বাঙালির মূল্যবোধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে নিবিড়ভাবে একাকার হয়ে আছেন। তাইতো বাঙালির সংকটে এবং গৌরবে আমরা বার বার ফিরে যাই রাজনীতির কবি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কাছেই।

বঙ্গবন্ধু স্বমহিমায় সমুজ্জল প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে, তাঁর অমর কীর্তি চির অম্লান হয়ে থাকবে প্রতিটি বাঙালির চেতনায়। তাইতো কবি অন্নদাশঙ্কর রায়ের কবিতার ভাষায় বলতে হয়- ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান/ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’

লেখক পরিচিতি:

  • অধ্যাপক, আইন বিভাগ ও পরিচালক
  • শহীদ সুখরঞ্জন সমাদ্দার ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র  (টিএসসিসি)
  • রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
  • যোগাযোগ: ই-মেইল- Email: [email protected]