মুঞ্জিল চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন এলাকাবাসী

  • 330
    Shares

স্টাফ রিপোর্টার: এতদিন কেউ কোন কথা বলার সাহস পায়নি। কিন্তু হত্যা মামলার পর গা-ঢাকা দেয়ায় রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন এলাকাবাসী। চেয়ারম্যান বজলে রেজবী আল হাসান মুঞ্জিল গত তিন দিন ধরে পলাতক।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, যখন যে দল তখন সে দলেরই নেতা হয়ে যান মুঞ্জিল। নানা কায়দায় সরকারি দলের এলাকার বড় বড় নেতাদের সঙ্গে গড়ে তোলেন সুসম্পর্ক। এরপরই শুরু হয় তার দাপট। অনৈতিক সুবিধা নিয়ে বিচার-সালিশে তিনি সব সময়ই একটি পক্ষের দিকে অবস্থান নিতেন। হেনস্থা করতেন অন্যপক্ষকে। এতে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতা হয়ে ওঠায় তার বিরুদ্ধে কোন কথা বলার সুযোগ ছিচল না।

গত রোববার হরিপুর ইউপি ভবনের একটি কক্ষে গলায় ফাঁস দেয়া অবস্থায় মোফাজ্জল হোসেন (২৬) নামে এক যুবকের লাশ পাওয়া যায়। তিনি ১২ দিন আগে হরিপুর ইউনিয়নের নলপুকুর গ্রামে বিয়ে করেন। মোফাজ্জলের বাড়ি জেলার তানোর উপজেলায়। বিয়ের পর শ^শুরবাড়ি গেলেও মোফাজ্জলের স্ত্রী বাবার বাড়ি চলে আসেন। তিনি আর যেতে চাচ্ছিলেন না। কিন্তু মোফাজ্জল তাকে নিতে শ্বশুরবাড়ি আসেন। বিষয়টির সমাধানে গত শনিবার ইউপি কার্যালয়ে দুইপক্ষের লোকজন চেয়ারম্যানের সঙ্গে বসেছিলেন। তখন চেয়ারম্যান বলেছিলেন, মেয়েটি সংসার করবে না। তাই মোফাজ্জলকে দেনমোহরের টাকা দিয়ে ফিরে যেতে হবে। যতক্ষণ দেনমোহরের টাকা পরিশোধ না হচ্ছে ততক্ষণ সে ইউপি কার্যালয়েই থাকবে। চেয়ারম্যান বলেছিলেন, টাকা না দিলে তাকে মাদক দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হবে। ওই রাতে মোফাজ্জলকে ইউপি কার্যালয়ের একটি কক্ষে আটকে রাখেন চেয়ারম্যান। ভোরে তার ঝুলন্ত লাশ পাওয়া যায়। স্বজনদের অভিযোগ, মোফাজ্জলকে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।

এ নিয়ে নিহতের ভাই উজ্জল বাদী হয়ে দামকুড়া থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় নিহত মোফাজ্জলের শ্বশুরকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। মামলার দুই নম্বর আসামি ইউপি চেয়ারম্যান বজলে রেজবী আল হাসান মুঞ্জিল। এছাড়া মামলায় মোফাজ্জলের স্ত্রী এবং শাশুড়িসহ অজ্ঞাত আরও ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

এলাকাবাসী জানিয়েছেন, রাজশাহী মহানগরীর লক্ষ্মীপুর এলাকায় নূর বানু নামে এক গৃহকর্মীকে হত্যা করে লাশ গুমের অভিযোগ উঠেছিল মুঞ্জিলের বিরুদ্ধে। কিন্তু তখন তিনি ঘটনাটি ধামাচাপা দেন। সালিশের নামে তিনি প্রায়ই মানুষকে ইউপি ভবনে আটকে রাখতেন। মদ্যপ অবস্থায় এলাকায় ঘুরে বেড়ানো, নারী কেলেংকারীসহ নানা কথা এখন হরিপুরের মানুষের মুখে মুখে। আদিবাসীদের জমি দখল, ইউনিয়ন পরিষদের জমি বিক্রি করে দেয়াসহ আরও নানা অভিযোগের কথা জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তারা জানান, কয়েকবছর আগে অনেকটা প্রকাশ্যেই মাদক ব্যবসা পরিচালনা করতেন মুঞ্জিল। ছিল অবৈধ হুণ্ডির কারবারও। কিন্তু থানায় তার বিরুদ্ধে আগে কোন মামলা হয়নি। তার বিরুদ্ধে থানায় কোন অভিযোগও নেই।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি সরকারের আমলে মুঞ্জিল ছিলেন সেই দলের লোক। বিএনপির সমর্থনেই তিনি পর পর দুবার ইউপি চেয়ারম্যান হন। তারপর একবার ফেল করেন। এরই মধ্যে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। তিনি আবার হয়ে যান আওয়ামী লীগের নেতা। এবার আওয়ামী লীগের সমর্থনেই তিনি ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তবে কোনদলেই মুঞ্জিলের দলীয় কোন পদ ছিল না। বিএনপির আমলে রাজশাহীর প্রভাবশালী একজন নেতার সঙ্গে তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এখন পবার সকল স্তরের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর সঙ্গে তার সুসম্পর্ক। উঠাবসা করেন মহানগর আওয়ামী লীগের এক নেতার সাথে। নগরীর মহিষবাথানে মুঞ্জিলের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে যাতায়াত ছিল আওয়ামী লীগ নেতাদের। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে বসত মদ্যপান আর অসামাজিক কার্যকলাপের আসর।

তিন দিনেও তাকে গ্রেপ্তার করতে না পারার বিষয়ে জানতে চাইলে দামকুড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম বলেন, মুঞ্জিল চেয়ারম্যানসহ হত্যা মামলার এজাহারনামীয় সকল আসামিকেই গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। কিন্তু তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মুঞ্জিল চেয়ারম্যানের নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে ওসি বলেন, তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হওয়ার আগে থানায় অন্য কোন মামলা ছিল না। কোনদিন কেউ কোন অভিযোগও করেননি।

সোনালী/আরআর

শর্টলিংকঃ